শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

রাজধানীর ফুটপাত প্রসঙ্গে

রাজধানী ঢাকাকে বসবাস উপযোগী সুবিন্যস্ত মহানগরী হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস বিভিন্ন সময়ে কম শোনানো হয়নি। এ প্রসঙ্গেই প্রতিটি উপলক্ষে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ফুটপাত। নগর পরিকল্পনাবিদদের উদ্ধৃতি দিয়ে গত রোববার দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ৩৬০ বর্গকিলেমিটার আয়তনের রাজধানীতে যেখানে অন্তত ৯০ বর্গকিলেমিটার সড়ক থাকা দরকার সেখানে সড়ক রয়েছে মাত্র ৬০ বর্গকিলেমিটার। এরও আবার ১৫ বর্গকিলেমিটার চলে গেছে অবৈধ দখলে। দখল করে নিয়েছে নানা পরিচয়ের প্রভাবশালীরা, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যাদের দহরম-মহরম রয়েছে। রাজধানীর ফুটপাতগুলোর বেশিরভাগই বছরের পর বছর ধরে তারাই ভোগ-দখল করছে। ক্ষমতাসীনদের ‘খাস লোক’ হিসেবে পরিচিতি থাকায় সবসময় তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকেছে, এখনো রয়েছে। তারা সাধারণত নিজেরা পণ্যের দোকান সাজিয়ে বসে না, বরং ভাড়া দেয়। ভাড়ার পরিমাণও চমকে ওঠার মতো। যেমন ওই রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এলাকাভেদে এক বর্গহাত জায়গার পজিশন বিক্রি হচ্ছে এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। এসবের জন্য ভাড়া দিতে হচ্ছে আট থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। দখলদারদের প্রত্যেকে ভাড়াও দিয়েছে যত বেশিজনকে সম্ভব ততজনকে। এসব ভাড়াটের কাছ থেকে ভাড়ার টাকার পাশাপাশি বিরাট অংকের চাঁদাও ওঠাচ্ছে তারা। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, এই চাঁদার পরিমাণ মাসে পঞ্চাশ থেকে তিনশ কোটি টাকা পর্যন্ত। প্রভাবশালী এসব দখলদারের পাশাপাশি চাঁদা ওঠাচ্ছে পাড়া-মহল্লার গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা। পুলিশকেও দৈনিক চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদা দেয়া থেকে রেহাই পাচ্ছে না ভ্যান গাড়িতে যারা সবজি, মাছ বা পণ্য বিক্রি করে তারাও।
এভাবে দখল হয়ে গেছে রাজধানীর ১৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ফুটপাতের প্রায় ১১৯ কিলোমিটারই। মতিঝিল, দিলকুশা, দৈনিক বাংলা, গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম থেকে শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট ও মিরপুর রোড হয়ে মিরপুর-১০, ১১ ও পল্লবী এবং উত্তরে উত্তরা ও আজমপুর পর্যন্ত এমন এলাকার কথা বলা যাবে না, যেখানে কোনো একটি ফুটপাত দিয়েই মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে। প্রতিটি ফুটপাতেই বসে গেছে নানা বাহারী পণ্যের দোকান। পুরি-পরোটা আর চায়ের দোকানও মানুষের চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করছে। রয়েছে ভ্যানের ওপর সাজানো ফাস্টফুডের দোকান। যারা দখল করেছে তারা কিন্তু বুক ফুলিয়েই নিজেদের কীর্তি সম্পর্কে জাহির করে বেড়াচ্ছে। দখলদারদের দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য প্রকাশিত হচ্ছে সংবাদপত্রের রিপোর্টে। রিপোর্টে উঠে আসছে অসহায় ভাড়াটেদের কথাও। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজধানীর ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার খবর শুধু গভীর উদ্বেগের নয়, আপত্তির বিষয়ও। কারণ, ফুটপাত নির্মাণ করা হয় সাধারণ মানুষের জন্য, যাতে নারী ও শিশুসহ সব বয়সের মানুষ দুর্ঘটনা এড়িয়ে নিরাপদে চলাচল করতে পারে। অন্যদিকে ঢাকায় চলছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক ভয়ংকর অবস্থা। প্রতিটি দোকানই ফুটপাতের অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে বসছে। পাশাপাশি রয়েছে ক্রেতাদের ভিড়। এর ফলে পুরো ফুটপাতই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মানুষ বাধ্য হয়ে প্রধান সড়কে নেমে যাচ্ছে। দুর্ঘটনাও ঘটছে সে কারণে। অর্থাৎ ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে না পারায় বিপন্ন হচ্ছে মানুষের জীবন। এখানে অন্য একটি তথ্যও যোগ করতে হয়। সেটা মোটরসাইকেল সম্পর্কিত। সারা দেশের মতো রাজধানীতেও মোটরসাইকেলের সংখ্যা দিন দিন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। আপত্তির কারণ হলো, মোটরসাইকেল চালকরা আইনের কোনো তোয়াক্কাই করে না। মূল সড়কে যানজট সৃষ্টি হলেই তারা পাশের ফুটপাতে উঠে যায়। অনেক সময় উল্টো দিক থেকেও আসে তারা। এর ফলে ফুটপাত দিয়ে কোনোভাবে চলাচলকারী মানুষের বিপদ বেড়ে যায় বহুগুণ। এটা শুধু বিপদজনক নয়, আইনত নিষিদ্ধও বটে।
স্মরণ করা দরকার, বছর চার-পাঁচেক আগে একজন আলোচিত মাননীয় বিচারপতি স্বপ্রণোদিত হয়ে ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো নিষিদ্ধ করেছিলেন। যারা লংঘন করবে তাদের জন্য জেল-জরিমানারও উল্লেখ ছিল তার ওই রায়ে। কিন্তু রায়টি এখনো কাগজেই রয়ে গেছে, আজও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করার কিংবা শাস্তি দেয়ার খবর জানা যায়নি। সম্প্রতি অবসরে যাওয়া মাননীয় ওই বিচারপতি নিজেও কখনো কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে জানা যায়নি। ফলে ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল শুধু চলছেই না, বেপরোয়া চালকরাও কাউকে পাত্তা দিচ্ছে না। উল্লেখ্য, ২০০১ থেকে ২০১০ ও ২০১২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়েও সর্বোচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতিরা পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নির্বিঘœ করার আদেশসহ রায় ঘোষণা করেছেন। পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি ব্যবস্থা নেয়ার আদেশও দিয়েছেন তারা। কিন্তু পরিস্থিতির অবনতিই শুধু ঘটেনি, মাঝখান দিয়ে পথচারীদের বিপদ বেড়েছে বহুগুণ। ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত হওয়ার পরিবর্তে ভাড়াটে দোকানীদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি দোকানের আকারও অনেক বেড়ে গেছে। একযোগে ফুটপাত ভেঙে তৈরি হয়েছে পার্শ্ববর্তী ভবনে প্রবেশের জন্য উঁচু পথ। ফলে এখন আর মানুষের পক্ষে নিরাপদে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করা সম্ভব হয় না।  এভাবে সব মিলিয়েই রাজধানীর ফুটপাত সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদজনক হয়ে উঠেছে।
আমরা মনে করি, বড় বড় সড়কগুলোর পাশাপাশি বিশেষ করে ফুটপাতের অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া এবং রাজধানীর সকল ফুটপাতকে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নিরাপদ করা দরকার। শোরগোল তুলে ঘটনাক্রমিক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বাহবা কুড়ানোর হাস্যকর পন্থা নেয়ার পরিবর্তে এ উদ্দেশ্যে দরকার সুচিন্তিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। একথা বুঝতে হবে যে, অবৈধ ভাড়াটেদের উচ্ছেদ করলেই চলবে না, উচ্ছেদ করতে হবে আসলে দখলদারদের। এমন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে যাতে কারো পক্ষেই মেয়র ও কাউন্সিলর এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নাম ভাঙানো সম্ভব না হয়। তেমন ক্ষেত্রে যাদের নাম ভাঙানো হবে তাদের বিরুদ্ধেও আইনত ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে পরিস্থিতির কেবল অবনতিই ঘটতে থাকবে এবং অদূর ভবিষ্যতে এমন সময় আসবে যখন পুরো রাজধানীই স্থবির এবং বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে।  মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তির কোনো সীমা তো থাকবেই না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ