ঢাকা, বুধবার 12 August 2020, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭, ২১ জিলহজ্ব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

দেশে স্নাতক পাস করা ৪৭শতাংশ যুবকই বেকার

এইচ এম আকতার: গত অর্ধযুগ ধরে দেশের শ্রমবাজার খুব বেশি সম্প্রসারণ হচ্ছে না। প্রবাসে কর্মসংস্থানের সুযোগও  সীমিত হয়ে আসছে। উচ্চ শিক্ষা শেষেও বেকার থেকে যাচ্ছে তরুণদের একটি অংশ। এমনকি কারিগরি শিক্ষা নিয়েও কর্মসংস্থান হচ্ছে না। সব মিলিয়ে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার বাড়ছে। বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে ১২তম স্থানে রেখেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)। দেশে স্নাতক পাস করা ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেকার।

বর্তমান সরকার ঘরে ঘরে চাকুরি দেয়ার ঘোষনা দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও ২০১০-১৩ সালের মধ্যে তরুণ নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই বেকারত্ব বেড়েছে। তবে পুরুষের তুলনায় নারীদের বেকারত্বের হার বেশি।
কর্মহীনতার এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে বাধ্য হয়েই অনেকে অবৈধভাবে সাগরপথে অভিবাসী হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন না হওয়া, শিক্ষিতদের শহরমুখী প্রবণতা, উচ্চ বেতনে চাকরির আকাঙ্ক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থানে আগ্রহ না থাকার কারণে তরুণদের কর্মসংস্থান সেভাবে হচ্ছে না। দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির হয়ে পড়াও বেকারত্বের অন্যতম কারণ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১০ সালে দেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১১ সালেও অপরিবর্তিত ছিল এ হার। তবে ২০১২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৯ ও ২০১৩ সালে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। যদিও এ সময় মোট বেকারত্বের হার ছিল অর্ধেক। বিশ^ব্যাংকের সমীক্ষা বলছে, চার বছরে এ হার বেড়েছে ১ শতাংশ।

২০১০ ও ২০১১ সালে নারী ও পুরুষ বেকারত্বের হারও স্থির ছিল। যদিও পরের দুই বছর উভয় ক্ষেত্রেই এ হার বেড়ে যায়। ২০১০ ও ২০১১ সালে নারীদের বেকারত্বের হার ছিল ৮ দশমিক ৮ ও পুরুষ ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১২ সালে নারীদের ক্ষেত্রে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩ ও ২০১৩ সালে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এ দুই বছর পুরুষদের মধ্যে বেকারত্বের হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬ ও ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১০-এর তথ্যমতে, দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ শ্রমশক্তির পরিমাণ ১ কোটি ৩২ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজারজন বেকার। পুরুষ শ্রমশক্তির ৮২ লাখের মধ্যে ৬ লাখ ৮১ হাজার ও ৫০ লাখ নারীর মধ্যে ৪ লাখ ৫৯ হাজার বেকার। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে বিবেচনায় নিলে বর্তমানে তরুণ শ্রমশক্তির পরিমাণ হবে দেড় কোটি বা তার কিছু বেশি। সে হিসাবে দেশে বর্তমানে ১৫ লাখের মতো তরুণ বেকার রয়েছেন।

তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে কাঠামোগত কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, সাধারণত শহুরে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। আবার উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও এ হার বেশি। এর মূল কারণ শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রতি বছর শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও সে অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। আবার নিজস্ব ব্যবসা বা আত্মকর্মসংস্থানেও তারা আত্মবিশ্বাসী নন।

দেশের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয় নেই উল্লেখ করে ড. জাহিদ বলেন, কোন ধরনের শ্রমশক্তির চাহিদা রয়েছে, তা না বুঝে তরুণরা বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছেন। কম বেতনের চাকরিতে যোগদানেও আগ্রহী হন না তারা। ইচ্ছুক নন শহর ত্যাগেও। এছাড়া শিক্ষার মানও সন্তোষজনক নয়। ফলে ব্যবসার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার ভিত্তিতে ব্যাংকঋণ সংগ্রহ করতে সক্ষম নন তারা। এমনকি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেও অনেকে বাংলায় সঠিকভাবে একটি চিঠি লিখতে পারেন না। এসব কারণে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার কমছে না।

তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার আগামীতে আরো বাড়বে বলে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক সমীক্ষায়। বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে ১২তম স্থানে রেখেছে আইএলও।

দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দিন দিন বেকারত্ব বাড়ছে বলে জানাচ্ছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিও (ইউএনডিপি)। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০-৯৫ সালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী বেকার জনগোষ্ঠী ছিল ২৯ লাখ। ২০০৫-১০ সালের মধ্যে তা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩২ লাখে।
বেকারত্বের কারণ অনুসন্ধানে শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহগত ত্রুটির বিষয়টি উঠে আসে গত বছর বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘সাউথ এশিয়া হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট সেক্টর এন্ড এসেসমেন্ট অব স্কিলস ইন দ্য ফরমাল সেক্টর লেবার মার্কেট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়, চাকরির বাজারে চাহিদা না থাকলেও বাংলাদেশে কলা ও মানবিক, প্রকৌশল ও কারিগরি, সমাজবিজ্ঞান এবং কৃষিশিক্ষার প্রতি ঝুঁকছেন শিক্ষার্থীরা। আবার চাহিদা থাকলেও বিজ্ঞান, সাধারণ শিক্ষা, ব্যবসায় প্রশাসন, চিকিৎসা, কিংবা লোকপ্রশাসন বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। ফলে খাপছাড়া এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা বাড়াচ্ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা।
অন্যদিকে দি ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে স্নাতক পাস করা ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেকার। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একই ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৮, নেপালে ২০ ওশ্রীলংকায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এজন্য দায়ী করা হয়েছে মূলত শ্রমবাজারের সঙ্গে সঙ্গতিহীন শিক্ষা ব্যবস্থাকে। আর অসামঞ্জস্যপূর্ণ এ শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানও সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না।

কারিগরি শিক্ষার পরও বেকারত্বের উচ্চহারের চিত্র উঠে এসেছে চলতি মাসে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইনোভেটিভ স্ট্র্যাটেজিস ইন টেকনিক্যাল এন্ড ভোকেশনাল এডুকেশন এন্ড ট্রেনিং ফর এসিলারেটেড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইন সাউথ এশিয়া বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনটি প্রণয়নে বেসিক ট্রেড, এসএসসি ও এইচএসসি ভোকেশনাল, এইচএসসি ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা এবং ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্নকারীদের ওপর সরাসরি সমীক্ষা চালানো হয়। এদের মধ্যে চাকরিরত রয়েছেন ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। আর আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন ১ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাগ্রহণকারীদের মধ্যে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ কাজে নিয়োজিত। কর্মসংস্থান না হওয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ কারিগরি শিক্ষার্থী। ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেকার রয়ে গেছেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য সৌদি আরবের শ্রমবাজার প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ। ২০১২ সাল থেকে বন্ধ সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজারও। দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় তিন বছরে মাত্র সাত হাজার শ্রমিক পাঠানো গেছে। শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসার এ সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে মানব পাচারকারীরা। তাদের প্রলোভনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় চেপে সাগর পাড়ি দিচ্ছেন বিদেশ গমনেচ্ছুরা। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত গত দেড় বছরে বঙ্গোপসাগর রুট ব্যবহার করে মানব পাচার হয়েছে অন্তত ৯৪ হাজার। এর মধ্যে ১ হাজর ১০০ জনের বেশি সমুদ্র মৃত্যুবরণ করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ