ঢাকা, শুক্রবার 7 May 2021, ২৪ বৈশাখ ১৪২৮, ২৪ রমযান ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

ভারতে নারীর নিরাপত্তা : পালিয়েও বাঁচলেন না তরুণী

নিশুত রাতে ঝোপঝাড় ভেঙে দৌড়চ্ছিলেন তরুণী। ফাঁকা রাস্তায় ছুটে বাঁচা যাবে না বুঝতে পেরেই হয়তো ঢুকে পড়েছিলেন পোড়ো বাড়িটায়। চুলের গার্ডারটা খসে পড়েছিল অন্ধকার উঠোনে।
সেই বাড়ি থেকেও হয়তো পালাতে চেয়েছিলেন তিনি। পারেননি। কেতুগ্রামের কাঁটাড়ি গ্রামের ওই বাড়ির বাইরের দেওয়ালের পাশেই বৃহস্পতিবার ভোরে সাহিনা খাতুনের মৃতদেহটা পাওয়া যায়। পিঠে, মাথায় গুলির গর্ত। বছর কুড়ির সাহিনাকে কে খুন করল, কেন করল, অত রাতে তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিলেনই বা কেন, সারা দিনেও তা পুলিশের কাছে পরিষ্কার নয়।
রোজ বিকেলে ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াতেন সাহিনা। গ্রামেরই আট বছরের একটা ছেলে তাঁর দেহটা প্রথম পড়ে থাকতে দেখে। সে-ই ছুটে গিয়ে বাড়িতে খবর দেয়। পরিত্যক্ত বাড়িটির বাইরের দেওয়ালে হাতের ছাপ, কিছুটা ভাঙা জায়গা, সাহিনার পায়ে লেগে থাকা মাটি, উঠোনে পড়ে থাকা গার্ডার, কুড়িয়ে পাওয়া তিনটে কার্তুজের খোল— এই সব টুকরো-টাকরা সাজিয়ে তদন্তকারীরা শুধু আঁচ করতে পেরেছেন, সাহিনাকে বাইরে থেকে তাড়া করে এসেছিল খুনি। খুব সম্ভব দেশি ছ’ঘরা পিস্তল ছিল তার হাতে। প্রথম তিনটি গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। চতুর্থ গুলি লাগে সাহিনার পিঠে। তিনি পড়ে গেলে খুব কাছ থেকে তাঁর মাথার পিছনে আরও দু’টি গুলি করা হয়।
পুলিশের সন্দেহ, বুধবার রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে গোটা ঘটনাটি ঘটে। তবে সাহিনাকে ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানি করা হয়নি বলেই প্রাথমিক ভাবে তদন্তকারীরা মনে করছেন। বৃহস্পতিবার বোলপুর মহকুমা হাসপাতালে সাহিনার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হয়। বিকেলে গ্রামেই শেষকৃত্য হয় তাঁর।
এমনিতে বর্ধমান জেলায় হলেও কাঁটাড়ি গ্রাম থেকে দু’পা গেলেই বীরভূমের নানুর। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরেও গোটা গ্রাম কার্যত চুপ। অত রাতে ছ’খানা গুলি চলল। কিন্তু কেউ নাকি গুলির আওয়াজ শোনেননি! সাহিনার বাড়ির লোকজন পুলিশে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। কিন্তু তাতে কারও নাম দেওয়া হয়নি। নিকটজনেদের বয়ানেও অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বলে পুলিশ-সূত্রে খবর।
হাসপাতালে সাহিনার দেহের কাছে দাঁড়িয়ে তার জামাইবাবু, একই গ্রামের বাসিন্দা আতিকুর রহমান দাবি করেন, ‘‘সাহিনার কিডনির সমস্যা ছিল। তাই বারবার বাথরুমে যেত। রাতে বাথরুম যাওয়ার সময়েই কেউ ওকে তুলে নিয়ে যায়।’’ সাহিনার বাবা চৌধুরী ইব্রাহিম বেশির ভাগ সময়ে বীরভূমের রামপুরহাটে থাকেন, বাসের ব্যবসা করেন। তিন-চার মাস অন্তর গ্রামে আসেন। তাঁর দাবি, ‘‘হিংসার বশবর্তী হয়ে মুখে কাপড় দিয়ে কেউ আমার মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।’’
কিন্তু এই সব দাবি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছে না কেতুগ্রাম থানার পুলিশ। তদন্তকারীদের বক্তব্য, রাতে সাহিনা ছাড়া বাড়িতে ছিলেন তাঁর অশক্ত মা সেবিলা বিবি, বোনপো পারভেজ রহমান এবং দুই বান্ধবী। তাঁদের বাড়ি উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সামনের গলি এত সরু যে এক জনের বেশি যাওয়া সম্ভব নয়। এ অবস্থায় মুখে কাপড় বেঁধে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব। তা ছাড়া ধস্তাধস্তি বা চিৎকারের কোনও শব্দ শুনতে পাননি বলে রাতে ওই বাড়িতে থাকা চার জন পুলিশকে জানিয়েছেন।
সে রাতে সাহিনাদের মাটির দোতলা বাড়ির একতলায় ছিলেন তার মা। সাহিনার দাদা সদ্য আসানসোল ডিভিশনে মালগাড়ির গার্ডের চাকরি পেয়েছেন। মঙ্গলবার তিনি কাজে যোগ দিতে চলে যাওয়ায় দুই বান্ধবী মা-মেয়ের সঙ্গে থাকতে এসেছিলেন। একই কারণে এসেছিল সাহিনার দিদির ছেলে, নবম শ্রেণিতে পড়া পারভেজ। দোতলার বারান্দায় বান্ধবীদের শোওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল, ভিতরে সাহিনা আর পারভেজের।
সাহিনার মা সেবিলা বিবির কথায়, ‘‘ওরা রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত গল্প করছিল। তার পর ওদের ঘুমোতে বলে আমি ঘুমিয়ে পড়ি।’’ দুই বান্ধবীর কথায়, ‘‘সাহিনা প্রায় জোর করেই আমাদের থাকতে ডেকেছিল। সাড়ে ১১টা নাগাদ এক বার আমরা নীচে নামি। একটু পরেই উপরে উঠে ঘুমিয়ে পড়ি। সাহিনা আর পারভেজও ঘুমোতে চলে যায়।’’
বান্ধবীদের দাবি, ‘‘এর পরে কী হয়েছে, বলতে পারব না।’’ পারভেজ কিন্তু মাসিকে ঘর থেকে বেরোতে দেখেছে। তার কথায়, ‘‘রাতে মাসির মোবাইলে একটা ফোন আসে। মাসি কথা বলতে-বলতে নীচে বাথরুমে যায়। আমায় নামতে বারণ করে। তার পর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না।’’
পুলিশের অনুমান, পরিচিত কারও ডাকে বাড়ির কাছেই কোথাও দেখা করতে গিয়েছিলেন সাহিনা। কোথায় কতক্ষণ তাঁদের কথা হয়েছিল, কে তাঁকে তাড়া করল, কেন ওই তরুণী প্রয়াত হাজি সালেক মহম্মদের পরিত্যক্ত বাড়িতে গিয়ে ঢুকেছিলেন, সে রহস্যের কিনারা হয়নি। বর্ধমানের পুলিশ সুপার কুণাল অগ্রবাল বলেন, ‘‘নিহতের মা খুনের অভিযোগ করেছেন। তবে কী কারণে খুন, তা স্পষ্ট নয়। তদন্ত চলছে।’’
অনেকে অবশ্য বলছেন, গ্রামের কেউ কেন ‘কিছু দেখেননি, কিছু শোনেননি’ তার কারণ দুর্বোধ্য নয়। নানুরের সুচপুর ঘেঁষা ওই এলাকায় এমনিতেই দুষ্কৃতীরাজ চলে। ফলে চাপা আতঙ্ক আছেই। পুলিশের অনুমান, সম্ভবত এমন কোনও চেনা দুষ্কৃতীর হাতে ছ’ঘরাটা ছিল, যার নাম মুখে আনা দূরস্থান, ভাবতে গেলেই লোকে সিঁটিয়ে যাচ্ছে। সাহিনার পরিবারেই কারও-কারও মুখে শোনা গিয়েছে, ‘‘আমাদের কাছে ঘটনাটা স্পষ্ট। কিন্তু ভয়ে কিছু বলতে পারছি না।’’
সেই ‘ঘটনা’র হদিস পেতেই এখন হন্যে পুলিশ।- আনন্দবাজার ডট কম

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ