বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব

শামীমা শিরীন শিউলি : আমি আমার জীবনের একজন স্মরণীয় ব্যক্তিকে নিয়ে দু’কথা বলবো। তার আগে আমি মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের দরবারে শুকরিয়া জানাচ্ছি- যিনি এই নভোমণ্ডল ও বিশ্ব জগৎকে নিপুণভাবে সাজিয়েছেন এবং মানুষকে এই বিশাল নভোম-লে আশরাফুল মাখলুকাত করে পাঠিয়েছেন।
আমি এমন একজন ব্যক্তিকে গভীরভাবে স্মরণ করছি, যিনি আমার আম্মার  শ্রদ্ধেয় দাদা । যাকে স্মরণ আমার চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে। আসলে এ পৃথিবীতে মানুষ শুধু তার কর্ম দিয়ে বেঁচে থাকে। কোন মানুষ যদি ভাল কর্ম না করতো তা হলে ইতিহাসে কারও নাম থাকতো না। সংসারে যারা বিত্তবান বলে পরিচিত তাদের জীবন শেষ হয়ে যায় মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে। মৃত্যুই তাদের জীবনের ইতি টেনে দেয়। যারা ভাল কর্ম দিয়ে মানুষকে সঞ্জীবিত করেন, তারা বেঁচে থাকেন মৃত্যুর পরে যুগ যুগ ধরে।
তেমনি আমার বড় দাদা একজন মনে রাখার মতো মানুষ। নাম মো. মিছির আলী খান। তিনি ১১০ বছর বেঁচে ছিলেন। তার চেহারায় উন্নত ব্যক্তিত্বের পরিচয় ফুটে উঠতো। কাজ-কর্মে, জ্ঞানে-গুণে তিনি ছিলেন অসাধারণ। তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তার অনাবিল সংসার। তিনি ছিলেন আল্লাহ্ ভীরু, একজন ধৈর্যশীল ব্যক্তি। আল্লাহ্ তাকে বেহেস্ত নসিব করুন। আমীন।
আমরা যখন নানাবাড়ীতে বেড়াতে যেতাম তখন দেখতাম তিনি বারান্দায় বসে আছেন। আমরা তার কাছে ছুটে যেতাম। তিনি আমাদের আদর করতেন। তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। সবাই তাকে ভালবাসতো। আমরা গেলে তিনি খুব খুশি হতেন। তার দাঁত ছিল দুই-তিনটি, তবুও হাসলে তাকে ভীষণ ভাল লাগতো। আমরা অনেক দুষ্টুমি করতাম, তিনি রাগ করতেন না। তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিতেন। তিনি কোনদিন নামায ক্বাযা করেননি। কখনও মিথ্যা কথা বলেননি। কখনও ধৈর্য্য হারাননি। কখনও রাগ করেননি। তিনি পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনিদের ভীষণ ভালবাসতেন।
তিনি কারো সাথে কটূ কথা বলেননি, কাউকে কষ্ট দেননি। আসলে এরকম আদর্শের মূর্ত প্রতীক খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। সমগ্র উপজেলার মানুষ তাকে এক নামে চিনতো। সবাই সম্মান করতো।
তার স্ত্রী ছিলেন কাজী বংশের মেয়ে। তিনি দেখতে আমার আম্মুর মতো। সবাই বলে ফাতেমা ওর দাদীর মতো দেখতে। তিনি ছিলেন খুবই উদার মনের মানুষ। তিনিও খুব ধার্মিক ছিলেন। কোন বেমামাযির হাতে কিছু খেতেন না। তিনি মানুষকে খুব আপ্যায়ন করতেন। যাকে খাওয়াতেন একটা মুরগি পুরোটা তাকে খাওয়াতেন। তার হাতে যে খেয়েছ সে কোনদিনও ভুলতে পারেনি।
আমি যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি তখন সব আত্মীয়-স্বজন মিলে বড় দাদার শ্বশুরবাড়ী যাই। পথে একটা সাঁকো পার হতে হয়। মামা আমাকে পার করলেন। কিন্তু বড়দাদাকে কিভাবে পার করবেন এই চিন্তায় সবাই পেরেশান। কিন্তু তিনি অবিচল, একাই পার হবেন। শেষ পর্যন্ত তাই হলো।
তিনি ছিলেন সত্যি একজন মজার মানুষ। তাকে পছন্দ করে না এমন কাউকে আমি দেখিনি। তিনি আমাদের সাথে দুষ্টুমি করতেন। সহজভাবে কথা না বলে নেগেটিভ ভাষায় কথা বলতেন। আমরা শক্ত ধরনের খাবার খেততে বললে তিনি বলতেন, “না দিলে কে খায়।” তিনি বাজে কথা বলতেন না। সব সময় আল্লাহ্র নাম জপতেন। সবাই তার কাছ থেকে ফয়সালা নিতেন, তিনি ভাল বুদ্ধি দিতেন। আমাদের বাসায় বেড়াতে যেতে বললে বলতেন, “না নিলে কিভাবে যাব।” তবে তার খুব ইচ্ছা ছিল আমাদের বাড়িটা দেখার।
মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও পুকুরে নেমে গোসল করতেন। ছোট মামা ইব্রাহীম তাকে একবার বললেন, ব্যাপার কি দাদা, ধলু খাঁ মরে, কেদু খাঁ মরে, মেয়া খাঁর হল কি? তখন তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “একটু ধৈর্য্য ধর, আল্লাহ্র হুকুম হলে চলে যাব।”
বড় দাদা খুব খেতে পারতেন। খাবারে তার না ছিল না। শক্ত জিনিস তিনি পান ছেঁচনি দিয়ে ছেঁচে খেতেন। তার মৃত্যুর তিন-চার মাস আগে আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। তখনও তিনি সুস্থ। আমরা তাকে বিভিন্ন দোয়া তওবা জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি খুব সুন্দরভাবে পড়লেন।
আস্তে আস্তে সবাইকে তিনি ভুলতে লাগলেন। এই নিয়ে অনেকে দুষ্টুমি করতেন। তিনি রাগ করতেন না। ছোট বেলা তার সাথে গোসল করতাম। তিনি যতœসহকারে গোসল করিয়ে দিতেন। সর্বশেষবার গ্রাম থেকে আসতে আমি নিজ হাতে তাকে ভাত এবং পায়েশ খাইয়ে দিয়েছি। তার কাছে দোয়া চেয়েছি। তিনি আমার জন্য দোয়া করেছেন যেন ভাল বর পাই।
আজ আমার ভাবতে অবাক লাগে এই বৃদ্ধ আর এখন পৃথিবীতে নেই। তিনি চলে গেছেন অনেক দূরে। আমি এবার গ্রামে এসে তার কবর দেখেছি। কবর দেখলে আমার ভয় লাগে কিন্তু তার কবর দেখে আমার মোটেও ভয় লাগেনি। কবরকে মনে হচ্ছিল আলোকিত। তার ভাল আমল আর ভাল আচরণ আমাদের মাঝে তাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার স্মৃতির মণিকোঠায় তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল। মহান আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা, আল্লাহ্ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমীন।
লেখক : ইসলামী সমাজকর্মী ও লেখিকা

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ