বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ফলাফলে মেয়েরা এগিয়ে

রহিমা আক্তার : গত ১৩ আগস্ট রোজ বুধবার প্রকাশিত হয়েছে ২০১৪ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমামানের পরীক্ষার ফলাফল। এবার গড় পাসের হার ৭৮.৩৩ শতাংশ। সারাদেশে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭০ হাজার ৬০২ জন, পাসের হার, জিপিএ-৫ পাওয়া শতভাগ পাসের হার এবং ফলাফল শূন্য এসব দিক দিয়ে অনেকটা এগিয়ে এসেছে এবার। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৪.৩০ শতাংশ, যা তার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কম ছিল। এবার ফলাফল উন্নতির দিকে। এই বছর পাসের হার ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে আছে ছাত্রীরা। মোট ৭৮.৩৩ শতাংশ পাসের মধ্যে ৭৭.৮৬ শতাংশ ছাত্র আর ৭৮.৮৬ শতাংশ ছাত্রী। ছাত্রীদের ফলাফল ভালো হওয়ার পেছনে যে কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হয় কয়েকজন ছাত্রী ও অভিভাবকের সাথে।
জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রী রৌদ্র মালিহা এ বছর শহীদ আনোয়ার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়েছে। ফলাফল আশানুরূপ। পদার্থ বিজ্ঞান ছাড়া বাকিগুলোয় ওর ৫.০০ থাকে। কেন পদার্থে ছিল না এমন কথা জিজ্ঞাসা করায় ও বলে ‘পদার্থে আমাদের ৩৫ নাম্বারের অবজেকটিভ প্রশ্ন থাকে। এ বছর প্রথমপত্রের ৩৫টির মধ্যে প্রায় ২১-২২টি থাকে অঙ্ক। যেগুলো করতে ক্যালকুলেটরের সাহায্য নিতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ে তা করে সঠিক উত্তরে টিক দেয়া সম্ভব হয়নি। তাই ওই বিষয়ে এ+ ছিল না। তবে ফলাফলে আমি আনন্দিত। মেয়েরা ভালো ফলাফল করছে এর কারণ জানতে চাইলে রৌদ্র মালিহা বলেন এই বছর পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন হাতে পেয়েছে আগেই। মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বেশি প্রশ্ন সংগ্রহ করতে পেরেছে। এতে ওরা নিজেদের প্রতি একটু বেশি আত্মবিশ্বাস রেখে পরীক্ষা দিতে গিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়ে এ কারণে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের ফলাফল খারাপ হয়েছে।
সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করেছে আইভি আক্তার। ওর স্বপ্ন ডাক্তার হবে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে ডাক্তারি পড়ার আর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার নিজের ভালো ফলাফল সম্পর্কে আইভি বলে প্রথম থেকে প্রস্তুতি ছিল ভালো। সময়মতো সময়ের কাজ করেছি। তাই আশানুরূপ ফল এসেছে।
মেয়েদের ফলাফল ভালো হওয়ার কথা জানতে চাইলে আইভির আম্মু বিউটি আক্তার বলেন ‘অনেক ছেলেকে দেখেছি এদিক-ওদিক প্রশ্ন খোঁজ করে বেড়াতে। প্রথম থেকে নিজেরা এ বিষয়ে সতর্ক ছিলাম। প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে কী হচ্ছে না সেদিকে কান দিইনি। পুরো বইয়ের সিলেবাসের ওপর প্রস্তুতি নিতে বলেছি তাই ফলাফল ভালো হয়েছে মেয়ের।
জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রী সাদিয়া জামান এবার ঢাকা বোর্ড থেকে পাস করেছে। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ফলাফল ভালো হয়েছে। এর পেছনে কারণ কী জানতে চাইলে সে বলে এখন প্রতিযোগিতার সময়, একটা সময় ছিল নারীরা শুধু ঘরেই বেশি সময় দিত। ঘর-সংসার-সন্তান লালন-পালন ছাড়া ওদের কোনো জগৎ ছিল না। এখন নারীরা যেমন ঘর সামলাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে অফিস-আদালতের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে সমান তালে। অনেক সময় কাজের দিক দিয়ে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরাই এগিয়ে যায়। এবারের ফলাফলে তার প্রমাণ মিলে গেল।
তেজগাঁও সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নাজনীন বলেন, একটা সময় ছিল মেয়েদের ঘর থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বাধা ছিল। পরিবারের ছেলেরা অফিস করছে, মা তার সন্তানকে নিয়ে ঘরে বসেই পড়াতো তখন ছেলেরা বাইরে যেত পড়তে, মেয়েদের ততটা সহজ ছিল না। এখন ছেলেমেয়ে বলতে কোনো বাধা নেই পরিবারগুলো সচেতন হয়েছে, সন্তান ছেলে না মেয়ে তা না ভেবে সন্তানকে সন্তান মনে করে তার ভবিষ্যতের জন্য এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে। এতে মেয়েরা তাদের মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছে। সুযোগ পেলে যে মেয়েরা তাদের মেধা বিকাশ করে ফলাফল আশানুরূপ করতে পারে সেই প্রমাণ এবার ওরা দিয়ে দিয়েছে।
দিলারা ইয়াসমিন এবার এইচএসসি পাস করেছে জিপিএ-৫ পেয়ে। নিজের ভালো ফলাফল সম্পর্কে বলেন এখন আমরা জানি কীভাবে যোগ্যতা প্রকাশ করতে হয়। ঘরে-বাইরে প্রায়ই দেখি মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের ভালো বলা হয়। কিন্তু লেখাপড়া করলে সবাই সমান। বাধা না এলে আমরাও ভালো ফলাফল করতে পারি তা আমি নিজেই দেখিয়ে দিয়েছি। গত ৪ বছর আগে আমার ভাই পরীক্ষা দেয়। ওর পেছনে যেভাবে সময় দিয়েছে পরিবার আমার জন্যও তাই দিয়েছে। তাই আমিও দেখিয়ে দিয়েছি আমরাও পারি। আগের তুলনায় দেশে বাল্যবিবাহের সংখ্যা কমে আসছে। মেয়েরা এখন ঘর-সংসারের কথা ভাবার আগে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবে। নিজেকে একটা যোগ্য আসনে নিতে চায়। ছেলেদের চলতে পথে কোনো অসুবিধা হয় না। মেয়েদের হয়। সেসব সমস্যাগুলো এড়াতে পারলে আমরাও ভালো করব তার ফল এই।
২০১৪ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সবচেয়ে ভালো করেছে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। তার মধ্যে আরো ভালো করেছে মাদ্রাসা বোর্ডের মেয়েরা। মেয়েদের এমন ফলাফলের কারণ হিসেবে অনেকেই অনেক ধরনের মতামত দিয়েছেন।
ছেলে মেয়ের মাঝে যোগ্যতার কোন পার্থক্য নেই এটা বোঝার সময় হয়েছে। আগের তুলনায় ঝরে পড়া ছাত্রীর সংখ্যা কমে আসছে। পরিবারে মেয়েদের স¦াবলম্বি করে তোলার জন্য যেটুকু প্রয়োজন তা তারা ঠিকভাবে পেলে তাদের মেধার প্রকাশ ভঙ্গি ঘটাতে পারবে। একটা সময় ছিল মেয়েদের শিক্ষিত হতে পারলেও তারা ঘরে বসে থাকত।
কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। অফিস আদালত কর্পোরেট হাউজ থেকে শুরু করে মেয়েদের কাজের অবস্থানের যেমন উন্নতি হচ্ছে সেই সাথে মেয়েরাও নিজের যোগ্যতা আছে তার প্রমাণ দিতে পারছে।
এখনো আমাদের দেশে অনেক এলাকা আছে যেখানে মেয়েদের চলাফেরা মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন হয়ে উঠতে পারেনি। আমরা আশা করব সেই এলাকাগুলো চিহ্নিত করে মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে আরো সচেতন হবে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। যে হারে মেয়েরা পাস করছে যে হারে ভর্তির জন্য ভালো ব্যবস্থা এখনো হয়নি। মেয়েদের এ শিক্ষার হার ধরে রাখতে হলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও তাদের প্রাপ্য স্থান দিতে হবে, যাতায়াত ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় থাকার সুব্যবস্থা করলে সামনের দিকেও এ ফলাফল বজায় থাকবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ