বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পর্দার কল্যাণে...

রেহানা বিনতে আলী

আদর্শ ছায়াতলে স্থান
গ্রামের সাদাসিধে মেয়ে হঠাৎ শহরের পরিবেশে পড়াশুনা করতে আসে। নিজেকে খাপ খাওয়াতে অনেক কষ্ট হলেও Science Department হওয়ায় সবাই খুব স্বাভাবিকভাবেই একে-অন্যের সাথে সবকিছু শেয়ারিং করতো।
তবে সবার থেকে একটু ব্যতিক্রম ছিল সেই পর্দা করে আসা মেয়েটি। তার নাম রুনু। সে খুব সংকোচ বোধ করতো, যদিও তা কারও দৃষ্টিতে সেকেলে বা গাঁইয়া। আবার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও আছে। একদিন একজন সহপাঠী (ছেলে) তাকে প্রশ্ন করলো, আচ্ছা তুমি এমন কেন? তুমি কি খুব বেশি ধার্মিক? তুমি কি কোন ইসলামী ছাত্র সংগঠন করো? ইত্যাদি ইত্যাদি। মেয়েটি জবাবে বলল না তো! তবে মনে মনে অনেক দিন থেকে ঐরকম একটি সংগঠন খুঁজি, যেখানে গেলে নিজেকে জানবো-বুঝবো, নিরাপত্তা পাবো, সঠিক দিসা বা পথ পাবো। তবে পাচ্ছি না, পেলে অবশ্যই কৃতার্থই হতাম। আসলে বর্তমানের এই স্বাধীনচেতা ভাব মোটেই ভালো লাগে না। ইসলামী ভাবাপন্ন মেয়ে নেই বললেই চলে, এর মধ্যে টিকে থাকা অনেক কঠিন। ছেলেটি হুট করে বললো, এ রকমই একটি ছাত্রী সংগঠনের কাজ আমাদের কলেজে আছে, যারা নিজেরা ইসলামী অনুশাসনগুলো মানে এবং অন্যদেরকে মানতে উদ্বুদ্ধ করে। কুরআন-হাদীসের দাওয়াত দিয়ে থাকে। মেয়েটি তো আনন্দে আত্মহারা। মনে হয় যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।
যাইহোক, এভাবেই ঐ সহপাঠীর কথার সূত্র ধরে গেলো মূল ভবনে। সেখানে গিয়ে মনে হলো বৃষ্টি না চাইতেই ফসল। সত্যিই আল্লাহ্ যে এতবড় সাহায্যকারী সেদিন আবার তা প্রমাণ পেলো সে। আর মনে হলো কুরআনের সেই বাণী যে, ‘বান্দাহ্ যেভাবে চলতে চায়, আমি তাকে সেইভাবেই চালাই’ অর্থাৎ ঐ সহপাঠী যার কথা বলল, সে তাকেই পেয়ে গেল এবং তখনই তাদের সাপ্তাহিক বৈঠক অর্থাৎ কুরআনের আলোচনা হচ্ছে। ধ্যানমগ্ন হয়ে শুনলো আর মনে মনে আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করতে লাগলো। আলোচনার পর পরিচয়ের পালা শুরু হলো এবং ব্যক্তিগত খোঁজ-খবর নেয়া শুরু করলো। এভাবে প্রথমদিনেই তার সাথে ঐ বোনটির অনেক আন্তরিকতার সম্পর্ক তৈরি হলো। আর এটা আল্লাহ্র রহমত, কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে বোনটিকে তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য আহ্বান করল এবং বোনটিও খুব সহজেই রাজি হয়ে গেল এবং নির্দিষ্ট দিন তার বাড়িতে গিয়ে হাজির। আর মেয়েটি তার ঐ পরমপ্রিয় বোনটিকে দেখে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে, এটা কি সত্যিই না কল্পনা। যাইহোক, এভাবেই এই দুই বোনের অল্পদিনেই অনেক ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি হয় এবং এই সিঁড়ি ধরেই মেয়েটি খুব দ্রুত আদর্শের সেই ছায়াতলে এগিয়ে যেতে থাকে। আর খুঁজতে থাকে মঞ্জিলের ঠিকানা।

আল্লাহ্ দিলে ঠেকায় কে?
শীতের সকাল, কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতি, বলা যায় কুয়াশার ভেতর হাতরে হাতরে দূর পথ পাড়ি দেয়া, ২৫ কিলোমিটার প্রায় দু’ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে পরীক্ষা দিতে যাওয়া। তার উপর পরিবারের বিশাল পিছুটান। দু’দুটো বাচ্চা অন্যের উপর দিয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়া। সবকিছু মিলিয়ে প্রতিদিন একটি ঝড়-তুফান অতিক্রম করে পরীক্ষা দিতে যাওয়া। ভালোয় ভালোয় দু’দিন পরীক্ষা দিলেও তৃতীয় দিন তার তাকদির তাকে আরও বড় পরীক্ষা উপহার দিল। যথারীতি তৃতীয় দিনও পরীক্ষা দেয়া শুরু করলো। হঠাৎ এক্সামিনার এসে খাতা সাইন করতে শুরু করে। একপর্যায়ে তিনি বলেন, এই মেয়ে তোমার মুখের নেকাব খুলে ফেলো, আমি কিভাবে বুঝবো ছবির মেয়ে আর তুমি এক। পরীক্ষার্থী কৌশল করে অন্য পরীক্ষার্থীদের আড়াল করে নেকাবটা সামান্য নামিয়ে এক্সামিনার ম্যাডামকে দেখিয়ে আবার দ্রুত উঠিয়ে নিল। কিন্তু ম্যাডামের মনে যে কোন কুচিন্তা আছে এটা পরীক্ষার্থী বুঝে উঠে নাই। এরই মধ্যে তিনি রেগে মেগে তর্জন-গর্জন করে খাতা নিয়ে গেল আর পরিবেশ অনেক ঘোলাটে করে ফেলল। হল ভর্তি প্রায় শতাধিক ছাত্রছাত্রী তাও আবার কেউ যুবক, কেউ মাঝবয়সী আর কেউ আছে অনেকটা বৃদ্ধও বটে। অর্থাৎ পরীক্ষাটা ছিল শিক্ষকতা পেশার জন্য বাধ্যতামূলক বি.এড পরীক্ষা। তাই একেকজন একেক বয়সের এবং একেকজন জেলার একেক প্রান্তের। অনেকটা অচেনা-অজানা, যাইহোক, পরীক্ষার্থী চিন্তা করলো, ম্যাডাম বোরকা পরা একজন শিক্ষিকা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে এখান সে পর্দার কথা চিন্তা করেই সবার সামনে অবাদে নেকাব খুলে রাখতে চাচ্ছে না। কিন্তু না! তিনি তাই পুঁজি করে বিষয়টা আরো ঘোলাটে করতে লাগলো। পরীক্ষার্থীও অটল। ম্যাডাম খুব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, দিবেই না কাগজ। একপর্যায়ে আশপাশের সবার চাপে পরীক্ষার্থী দাঁড়িয়ে ম্যাডামকে অনুরোধ করলো কাগজ দেয়ার জন্য। ম্যাডাম কাগজ তো দিলই না বরং আরও অনেক অশালীন আচরণ শুরু করলো। এবার পরীক্ষার্থী অনেক ব্যথিত হলো। কারণ একটা মুসলিম দেশে একজন বোরকা পরা ম্যাডাম আরেকজন বোরকা পরা মেয়েকে শুধুমাত্র পর্দা করে পরীক্ষা দেয়ার জন্য এ রকম হেস্তনেস্ত করতে পারে? বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। এবার পরীক্ষার্থী বেচারী অতি দুঃখে শুধু অঝোর ধারায় কাঁদছে আর আল্লাহ্র কাছে ফরিয়াদ করছে। কারণ এরই মধ্যে ৪৫ মি. অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এখন তার পাশ-ফেল নির্ভর করছে ওই কাগজ দেয়ার উপর। যাইহোক, অবশেষে আল্লাহ্র রহমতে অন্য শিক্ষকদের অনুরোধে কাগজ দিলো। পরীক্ষার্থী কিন্তু তার সিদ্ধান্তে অটল ছিল। অল্প সময়ের জন্য কাগজ পেলেও লেখা শুরু করলো খুব দ্রুত তবে ভালো ফলাফল করা সন্দেহ হয়ে দাঁড়াল।
যথারীতি ঐদিনের পরীক্ষা শেষ, এক্সামিনাররা কাগজ নিয়ে চলে গেল। সব পরীক্ষার্থী আস্তে আস্তে হল থেকে বের হলো, আল্লাহ্র রহমত সবাই তাকেই সাপোর্ট করলো। কেন তুমি চ্যালেঞ্জ করোনি? কেন তুমি অফিসে গিয়ে কমপ্লেন করোনি? কেন তুমি দাঁড়িয়েছিলে? ইত্যাদি ইত্যাদি। যাইহোক, পরবর্তীতে অভিভাবকসহ যখন প্রিন্সিপালকে জানানো হলো, স্থানীয় সাংবাদিককে জানানো হলো, একপর্যায়ে ম্যাডাম ভুল স্বীকার করলো এবং কর্তৃপক্ষ বলল, ঐ ম্যাডামকে আর এই হলে ডিউটি দেয়া হবে না। এটাই তার শাস্তি এবং দেয়ওনি। যদিও ঐ ভুল স্বীকারের মাধ্যমে তার পরীক্ষা আবার নেয়া হবে না। যাইহোক, এবার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে বাকি পরীক্ষাগুলো দিলো। কারণ এখন বিশেষ চিন্তা একটাই যে, বছরটা অন্তত যেন লস না হয়। তো এবার অপেক্ষার পালা ফলাফলের  জন্য। যদিও তার চাকরির কারণে সে অনেকটা ভুলেই গিয়েছিল। দীর্ঘ ৭/৮ মাস পর রেজাল্ট ঘোষণা হলো, অনাকাক্সিক্ষতভাবে মেয়েটি ফার্স্টক্লাস পেয়ে গেল। যা সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না। অবশেষে বুঝে নিল যে, এটা আল্লাহ্র দেয়া উত্তম প্রতিদান। তাই নতশিরে শুধু তারই শুকরিয়া আদায় করতে লাগলো। আর এভাবেই প্রমাণিত হলো যে, মানুষের ত্যাগের তুলনায় স্রষ্টার পুরষ্কার অনেক অনেক গুণ বেশি হয়ে থাকে সর্বদা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ