সোমবার ১৩ জুলাই ২০২০
Online Edition

মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ ডিফেন্স পক্ষের জেরা আজ

স্টাফ রিপোর্টার : ১৯৭১ সালে সংঘটিত কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের তৃতীয় সাক্ষী নাসির উদ্দিন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষীর জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়েছে। জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় আজ সোমবার পুনরায় জেরার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-২। অন্যদিকে অপর এক মামলায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী কায়সারের বিরুদ্ধে ১৬ অভিযোগে চার্জ গঠন করেছে ট্রাইব্যুনাল। আগামী ৪ মার্চ কায়সারের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

গতকাল দেয়া জবানবন্দীতে সাক্ষী নাসির উদ্দিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে মীর কাসেম আলীর নির্দেশে আল-বদর সদস্যরা আমাকে নির্যাতনের এক পর্যায়ে মীর কাসেম আমাকে জিজ্ঞেস করে তোমাদের সহযোদ্ধাদের নাম কি? তাদের শেল্টার কোথায়?

’৭১ এ সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের তৃতীয় সাক্ষী নাসিরুদ্দিন চৌধুরী (৬০) তার জবানবন্দী পেশ করার সময় আরো বলেন,  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে মীর কাসেম আলীর নির্দেশে আল-বদর সদস্যরা তাকে নির্যাতন করে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল।

ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী পেশকালে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষীর জবানবন্দী শেষে তাকে জেরা শুরু করেন মিজানুল ইসলাম। জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় মামলার কার্যক্রম আজ সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করেন।

সাক্ষীর জবানবন্দীর

উল্লেখযোগ্য অংশ

চট্টগ্রামের পটিয়া থানার হুলাইন গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘৭১ সালের নবেম্বর মাসের শেষ দিকে এক গভীর রাতে আল-বদরের সদস্যরা আমাকে চোখ বেঁধে মারতে মারতে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে একটি অন্ধকার হোটেলে ঢুকিয়ে আমাকে তারা নির্যাতন করে। আমার কাছ থেকে কিছু না পেয়ে তারা চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে চলে যায়।

সাক্ষী বলেন, কিছুক্ষণ পর এসব আল-বদরদের সাথে নিয়ে মীর কাসেম আলী ওই কক্ষে প্রবেশ করে জানতে চায় ‘ওর কাছ থেকে কিছু আদায় করতে পারোনি? ওকে আরো পেটাও’। এরপর আল-বদররা তাকে লাঠি, লোহার রড, ইলেকট্রিক তার এসব দিয়ে ইচ্ছেমতো পেটাতে থাকে। এক পর্যায়ে মীর কাসেম আলীও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিছুই আদায় করতে না পেরে আল-বদরদের নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায় এবং তাকে পেটাতে পেটাতে রক্তাক্ত করে এক পর্যায়ে তারা বেরিয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘হোটেলের ওই কক্ষে থাকা অবস্থায় অন্য কক্ষ থেকে আরো মানুষের আর্তনাদ গোঙ্গানীর শব্দ আমি শুনতে পেয়েছি। ওইসব মানুষকে সেখানে নির্যাতন করা হতো। আমাকেও হোটেলের এক রুম থেকে অন্য রুমে নিয়ে প্রায়ই নির্যাতন করা হতো।’

সাক্ষী বলেন, সহবন্দীদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন মীর কাসেম আলীর নির্দেশে ও তার উপস্থিতিতে অনেক বন্দীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেয়া হয়।  জবানবন্দী শেষে আসামীপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম তাকে জেরা শুরু করেন। জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় মামলার কার্যক্রম আজ সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এর আগে তার বিরুদ্ধে আরও দু’জন সাক্ষী তাদের জবানবন্দী পেশ করেছেন। পরে মীর কাসেম আলীর আইনজীবী তাদের জেরা করেছেন।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী কায়সারের

বিরুদ্ধে ৪ মার্চ থেকে

সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু

এদিকে অপর এক মামলায় সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। আগামী ৪ মার্চ থেকে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করার আদেশ দেয়া হয়। গতকাল রোববার সকালে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগসহ ১৬টি অভিযোগ গঠন করেন।

অভিযোগ গঠনের শেষ দিকে ট্রাইব্যুনাল সৈয়দ কায়সারের কাছে জানতে চান তিনি দোষী না নির্দোষ। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করলে ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন।

গত বছর ১৫মে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সৈয়দ কায়সারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। গত বছরের ২১মে রাজধানীর একটি হাসপাতাল থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২২মে জামিনের আবেদন খারিজ করে ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাগারে পঠিয়ে দেন। তবে ৫ আগস্ট শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল তাকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেন। তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

কায়সারের বিরুদ্ধে 

আনিত ১৬ অভিযোগ

তদন্ত সংস্থা জানায়, মুক্তিযুদ্ধকালে কায়সারের অপরাধের বিস্তৃৃতি ছিল হবিগঞ্জ থেকে বি-বাড়িয়া পর্যন্ত। একাত্তরের ১৫ নবেম্বর কায়সার তাঁর বাহিনী ও পাকিস্তানি সেনারা বি-বাড়িয়ার নাসিরনগর থানা এলাকার ২০-২২টি গ্রামে অভিযান চালিয়ে শতাধিক লোককে হত্যা করে এবং বাড়িঘর লুণ্ঠনের পর অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া তাঁর নেতৃত্বে কায়সার বাহিনী ও পাকিস্তানি সেনারা বি-বাড়িয়ার বিজয়নগর ও নাসিরনগর থানা এবং হবিগঞ্জের সদর, মাধবপুর ও শায়েস্তাগঞ্জ থানায় হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণ সংঘটিত হয়।

একাত্তরের ১১-১২মে কায়সার পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে এক সাঁওতাল নারীকে ধর্ষণ করে। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি মাধবপুর থানায় অপহরণ, নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় কায়সার জড়িত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে কায়সার বাহিনী একাত্তরের ১৮ আগস্ট চুনারুঘাট চা বাগান এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজন মুক্তিযোদ্ধাকে আটকের পর নির্যাতন করে এবং সবাইকে হত্যা করে লাশ কুয়ার মধ্যে ফেলে দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ