রবিবার ১২ জুলাই ২০২০
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান

সাদেকুর রহমান : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি তথা জাতীয় উন্মেষের মাস ফেব্রুয়ারির তৃতীয় দিন আজ সোমবার। প্রতিবছরই ফেব্রুয়ারি আসে ভাষা পুত্র রফিক-বরকতদের অমলিন স্মৃতিগাঁথা নিয়ে, অসীম সাহসিকতার বীরত্ব গাঁথা নিয়ে। তাদের তাজা রক্তের আখরেই বিরচিত হয়েছে ‘অমর একুশে’ নামীয় অবিনাশী মহাকাব্য। আর তার সুদৃঢ় ভিত্তি রচনা করেছে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’। ডান-বাম রাজনীতির চাপাচাপিতে এর নামটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে বিস্মৃত হতে চলেছিলো। শেকড় সন্ধানী মানুষ ও গবেষকদের তীক্ষè নজর থাকায় মতলববাজগোষ্ঠী আর যাইহোক অবশেষে তমদ্দুন মজলিসের ভূমিকার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে।

  রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন মানে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এ আন্দোলনের ইতিহাস প্রণয়ন, দলিলপত্র সংগ্রহ ও সংকলনের ব্যাপারে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হয় বদরুদ্দীন উমরের নাম। তিনি তিনখ-ে ‘পূর্ব-বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইটি রচনা করেন। তাছাড়া বাংলা একাডেমি থেকে দু’খ-ে প্রকাশিত হয়েছে ‘ভাষা-আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল’। বর্তমানে ভাষা-আন্দেলনের ইতিহাস রচনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ভাষা সৈনিক, ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক এম আর মাহবুবের ‘বাংলা কী করে রাষ্ট্রভাষা হলো’ গ্রন্থটি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস রচনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে আরও যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে বশীর আল হেলাল, ড. রফিকুল ইসলাম, ডা. আহমদ রফিক, মো¯তফা কামাল, এম এ বার্নিক প্রমুখের নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।

  এম আর মাহবুবের ‘বাংলা কী করে রাষ্ট্রভাষা হলো’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “১৯৫২ সালে একটি রক্তস্নাত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর সতের দিনের মাথায় তমদ্দুন মজলিস নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।” খুরশীদ আলম সাগরের ‘পলাশী প্রান্তর থেকে বাংলাদেশ ১৭৫৭-১৯৭১ ও আমাদের স্বাধীনতা’ শীর্ষক গ্রন্থে ভাষা আন্দোলন বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে- “সাংগঠনিক পর্যায় শুরু হয় তমদ্দুন মসলিস নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশের মধ্যদিয়ে। মত প্রকাশের একটি অন্যতম প্লাটফর্ম হিসেবে এটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৭ সালে ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র এবং অধ্যাপকের উদ্যোগে তমদ্দুন মজলিস গঠিত হয়। উদ্দেশ্য বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়াস চালানো। অক্টোবর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক মুসলিম হলে সাহিত্য সভা অনুষ্ঠানের পর তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগেই সর্বপ্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। তমদ্দুন মজলিসের অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের তৎকালীন তরুণ শিক্ষক ড. এএসএম নূরুল হক ভূঁইয়া প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক নির্বাচিত হন।

  এমএ বার্নিকের ‘ভাষা-আন্দোলন সারগ্রন্থে’ উল্লেখ করা হয়েছে, তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটিতে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বলা হয়। তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটি নামে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় ৩০ ডিসেম্বর ১৯৪৭ তারিখে। মজলিসের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ড. এ এসএম নূরুল হক ভূঁইয়া উক্ত কমিটির আহবায়ক নিযুক্ত হন। এ কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিলো ২৮ জন। তবে কমিটির মূল পরিচালনায় ছিলেন তমদ্দুন মজলিস প্রধান অধ্যাপক আবুল কাসেম। বাংলাদেশ পাকি¯তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পাশাপাশি পূর্ব-বাংলার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তুলে ধরার কাজ করেছে এ কমিটি। উক্ত গ্রন্থে আরও বলা হয়, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিটি বিশিষ্ট মহল, আইন পরিষদ সদস্য ও ছাত্র সমাজের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তমদ্দুন মজলিস তথা প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিটি সাধারণ সাংস্কৃতিক ফোরাম থেকে রাজনৈতিক ফোরামে এবং সরকারের কাছে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরার যে কাজটি তারা করেছেন, তা ভাষা-আন্দোলন এবং বাংলাদেশ ও জাতির ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা বলে বিবেচিত হচ্ছে।

  ড. এএসএম নূরুল হক ভূঁইয়া ‘ভাষা-আন্দোলনের তিন যুগ পরের কথা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেন, তমদ্দুন মজলিসের কর্মীগণ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে গিয়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়োজনীয়তার কথা ছাত্রগণকে বুঝাতে থাকেন। এতে তাদেরকে প্রবল বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু তখন প্রায় সকলেই বলতো যে, মাত্র ক’দিন আগে দেশ স্বাধীন হলো, এখনই যদি বাংলা-উর্দু প্রশ্ন তোলা হয় তাহলে দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। বহু কষ্ট করে তাদেরকে বুঝানো হতো যে, দেশের স্বাধীনতার চেয়ে নিজেদের স্বাধীনতাও কম মূল্যবান নয়। বরং রাষ্ট্রভাষা এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অবশ্য অল্প কিছু দিনের মধ্যেই পশ্চিমা বিহারী ও পাঞ্জাবীদের ব্যবহারে দেশের লোকজন আস্তে আস্তে বিরক্ত হয়ে উঠলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ