মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

জানুয়ারিতে বিচারবহির্ভূত হত্যকান্ডে শিকার ৩৯ জন

* ১৫ জনই জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী

সংগ্রাম ডেস্ক : বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন বলে তথ্য প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’।

শনিবার সংস্থাটির মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের তথ্য দেয়া হয়েছে এ প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে একজন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। শীর্ষ নিউজ। ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনের পর যৌথবাহিনীর অভিযানের সময় বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ পাওয়া যায়। অধিকার’র তথ্যমতে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হন ৩৯ জন। সংস্থার হিসাব মতে, ২৭ জানুয়ারি ভোরে সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আজহারুল ইসলাম (২৮) যৌথবাহিনীর গুলীতে নিহত হয়েছেন। ২৬ জানুয়ারি আজহারুল ইসলামকে ঘোনা এলাকার একটি চিংড়িঘের থেকে আটক করে যৌথবাহিনী। আজহারুল ইসলামের স্ত্রী কামিনী পারভিন চম্পা জানান, তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তার শাশুড়ি ও শিশু সন্তান নিয়ে সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তালা থানার গেটে দাঁড়িয়েছিলেন। রাত ১২টায় তাদেরকে থানার গেট থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর ৭-৮টি পুলিশের গাড়ি থানার সামনে আসে এবং তার স্বামীকে নিয়ে চলে যায়। সকালে তারা জানতে পারেন ভোর রাতে মাগুড়া খেয়াঘাট এলাকায় তার স্বামীকে গুলী করে হত্যা করা হয়েছে।

নীলফামারী জেলা সদরের রামগঞ্জ বাজারে তৎকালীন এমপি (বর্তমান সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী) আসাদুজ্জামান নূরের গাড়িবহরে হামলার ঘটনার আসামী ছাত্রদল নেতা আতিকুর রহমানের (২৬) লাশ গত ২০ জানুয়ারি নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার বাইপাস সড়কের নাড়িয়াডাঙ্গা এলাকা থেকে পুলিশ উদ্ধার করে। আতিকুরের বড় ভাই আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আসাদুজ্জামান নূরের গাড়িবহরের হামলার ঘটনার পর থেকে আতিকুর পলাতক ছিল। ১৩ জানুয়ারি রাতে টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলা সদরের শাফিয়া বালিকা বিদ্যালয়ের পাশের একটি বাড়ি থেকে আতিকুর ও একই গ্রামের মহিদুলকে (২৬) গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা আটক করে বলে জানতে পারেন। কিন্তু থানা পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়েও তারা আতিকুরের অবস্থান জানতে পারেননি। এর ২ দিন আগে গত ১৮ জানুয়ারি আসাদুজ্জামান নূরের গাড়িবহরে হামলার অন্যতম আসামী নীলফামারী জেলার লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর লাশ উদ্ধার করে নীলফামারী থানা পুলিশ। গোলাম রাব্বানীর আত্মীয়রা অভিযোগ করেন, র‌্যাব রব্বানীকে তার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় এবং কয়েক দিন পর তার লাশ পাওয়া যায়। গত ১৯ জানুয়ারি দিবাগত রাতে মেহেরপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (৩৫) যৌথবাহিনীর গুলীতে নিহত হয়েছেন বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। এদিন বিকাল ৩টায় মেহেরপুর শহরের ইসলামী ব্যাংক ভবন থেকে গোয়েন্দা পুলিশ ও সদর থানা পুলিশের একটি দল তাকে আটক করে। অধিকারর প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারি মাসে ৩৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব হত্যাকা- র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি এবং যৌথবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ১৪ ডিসেম্বর নীলফামারীতে তৎকালীন এমপি আসাদুজ্জামান নূরের গাড়িবহর রামগঞ্জ ব্রিজের সামনে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের কেটে দেয়া রাস্তায় আটকে যায়। এ সময় পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত-শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এই ঘটনায় ৪ জন আওয়ামী লীগের কর্মী ও একজন জামায়াতের কর্মী নিহত হন।

এদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের ফলে নিহত ৩৯ জনের মধ্যে ২০ জন ক্রসফায়ার/এনকাউন্টার/বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে র‌্যাব কর্তৃক দু’জন, পুলিশ কর্তৃক ১০ জন এবং যৌথবাহিনী কর্তৃক আট জন ক্রসফায়ার/এনকাউন্টার/ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহত ৩৯ জনের মধ্যে ১৮ জন গুলীতে নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে র‌্যাবের হাতে দু’জন, পুলিশের হাতে ১২ জন, বিজিবি’র হাতে একজন এবং যৌথবাহিনীর গুলীতে ৩ জন নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহত ৩৯ জনের মধ্যে বিজিবি একজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। নিহত ৩৯ জনের মধ্যে ১১ জন বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের সদস্য, ১৫ জন জামায়াত-শিবিরের সদস্য, একজন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সদস্য, একজন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) সদস্য, ১০ জন কথিত অপরাধী বলে জানা গেছে এবং একজনের পেশা জানা যায়নি।

সংখ্যালঘু নাগরিকদের ওপর হামলার ব্যাপারে অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনের পরেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য হামলা করা হয়েছে এবং তা এখনও হচ্ছে। অধিকার অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে লক্ষ্য করছে যে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ওপর প্রতিটি নির্বাচনের পর হামলা চালানোর ঘটনা একটি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে আক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে সরকার ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার জন্য মানবাধিকার কর্মীরা উদ্বিগ্ন ছিলেন।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এর প্রসঙ্গে অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে বিএসএফ ২৯ জন নিরস্ত্র বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করে। ২০১৪ সালেও এই ধারা অব্যাহত আছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে এই সমঝোতা এবং চুক্তি লঙ্ঘন করে সীমান্তের কাছে বাংলাদেশীদের দেখামাত্র গুলী করে হত্যা করছে ও অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বাংলাদেশী নাগরিকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ। এতে বলা হয়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে দেশে ১৬ ব্যক্তি গণপিটুনিতে মারা গেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ