রবিবার ১২ জুলাই ২০২০
Online Edition

নির্বাচন ইস্যুতে সরকারকে আলোচনা-সমঝোতার ‘সুযোগ’ দিয়ে ফের কর্মসূচি

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : সরকারকে কিছুদিন সময় দিয়ে আবারো আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করার কথা ভাবছে বিএনপি। এক্ষেত্রে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের তো কর্মসূচি থাকছে না বলে জানা গেছে। এছাড়া এপ্রিল পর্যন্ত বিএনপি দল গোছানোয় ব্যস্ত থাকতে পারে। এই সময়ে দলকে আবারো চাঙ্গা করতে বিভাগীয় শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সফর করার কথা রয়েছে। তার আগে যৌথবাহিনীর অভিযানে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় যেতে পারেন তিনি। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর সাথে দেখা করারও কথা রয়েছে ১৯ দলীয় জোটের এ শীর্ষ নেতার। তবে সূত্র জানায়, সরকার যদি বিরোধী জোটের ওপর চলমান দমন পীড়ন অব্যাহত রাখে, যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে নেতা-কর্মীদের হত্যা-গুম বন্ধ না করে, মামলা, গ্রেফতার বন্ধ করা না হয় এবং কারাগারে আটক নেতাদের মুক্তি দেয়া না হলে খুব শিগগরই হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি আসতে পারে। সূত্র জানায়, সরকারি দলের আচরণের ওপর নির্ভর করেই বিএনপি তাদের কর্মসূচি ঠিক করবে।

সূত্র মতে, বর্তমান সরকারকে যে বেশিদিন সময় দিতে চান না তা বেগম জিয়ার বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। গত ২৫ জানুয়ারি  কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বাধীন  জাতীয় পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে খালেদা জিয়ার হাতে ফুল দিয়ে ১৮ দলীয় জোটে যোগদান অনুষ্ঠানে সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বিএনপির চেয়ারপার্সন বলেছেন, পাঁচ বছর নয়, কয়দিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন, হাতে গুণে রাখুন। সময় বেশি  নাই। আমরা এখন আর ১৮ দল নয়, ১৯ দলে সম্প্রসারিত হয়েছি। আজ ২৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা  দিবস। এই দিনেই জন্ম নিল ১৯ দল। আপনারা জানেন, ১৯ সংখ্যাটি লাকি। ইনশাআল্লাহ, ২০১৪ সালের মধ্যে ১৯  দলীয় জোট বয়ে আনবে শুভ বার্তা, শুভ ফলাফল, জনগণের কল্যাণ।

সূত্র জানায়, গত ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের পর নতুন পথে, ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। ‘দ্রুত’ একাদশ নির্বাচনের দাবিতে ফের আন্দোলনে নামার আগে বেশ কিছু কাজে হাত দিচ্ছেন তিনি। সরকারকে আলোচনা-সমঝোতার ‘সুযোগ’ দেয়ার অংশ হিসেবে আগামী তিন মাসকে ‘সাংগঠনিক মাস’ হিসেবে নিয়েছেন তিনি। এ সময়ে দলের সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করার পাশাপাশি তিনি নিজেও মাঠে থাকবেন। হতাশ নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত রাখতে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে বিএনপি।

জানা গেছে, সংগঠন গোছানোর এই সময়ে আন্দোলনের মাঠ একদম ফাঁকা রাখতে চায় না দলটি। ইস্যু তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘এককভাবে’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। ফের নির্বাচনের দাবিতে সরকারের ওপর ‘চাপ’ অব্যাহত রাখতেও চলবে নানামুখী তৎপরতা। বিরোধী দলবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপিতে ওই নির্বাচন ও আন্দোলন নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন সত্ত্বেও বিএনপি কোন ভুলে ‘ফসল’ ঘরে তুলতে পারেনি তা নিয়ে যেমন আলোচনা আছে, তেমনি নির্বাচনে না যাওয়ার  সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক হয়েছে, তা নিয়েও আছে নানা মত। হঠাৎ করে আন্দোলন কর্মসূচিতে আপাতত ‘ইতি’ টানা নিয়েও প্রশ্ন আছে বিএনপির অভ্যন্তরে।

জানা গেছে, নির্বাচন নিয়ে বিএনপির তৃণমূল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর বেশ ক্ষুব্ধ। তৃণমূল নেতারা মনে করছেন, রাজধানীতে কোনো আন্দোলন গড়ে না ওঠায় কাক্সিক্ষত সফলতা আসেনি। দলের মহাসচিবসহ শীর্ষ নেতাদের আত্মগোপনও তারা ভালোভাবে নেননি। সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূল নেতাদের শত অভিযোগ-মতামত আমলে নিয়েই নতুন পথে হাঁটতে শুরু করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দলকে কী করে ফের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করা যায়,  সেটাই এখন খালেদা জিয়ার চিন্তার মূল জায়গা। শুক্রবার বাদ দিয়ে প্রতিদিনই নিজ কার্যালয়ে বসছেন তিনি। দল গোছানোসহ আগামীদিনের করণীয় নির্ধারণে তিনি পেশাজীবীদের সাথে সিরিজ বৈঠক করছেন। সবার বক্তব্যগুলো তিনি মনোযোগ সহকারে শুনছেন। রাজধানীতে আন্দোলনের ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন তিনি। এছাড়া কিভাবে আন্দোলনের সাথে অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায় তা নিয়ে সবার মতামত জানছেন খালেদা জিয়া। শীর্ষ নেতারা কারাগার থেকেই বেরিয়ে এলে পুরোদমে সংগঠন গোছানোর কাজে হাত দেবেন বিএনপি প্রধান। এক্ষেত্রে দলের শীর্ষ থেকে বিভিন্ন পদে রদবদলের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

জানা গেছে, তৃণমূল বিএনপিকে চাঙ্গা রাখতে উপজেলা নির্বাচনে যাওয়ার  সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ওইসব নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইতোমধ্যে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় নেতাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের নেতৃত্বে স্থানীয় পর্যায়ের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপজেলা নির্বাচন মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। যেসব স্থানে বিএনপির একাধিক প্রার্থী রয়েছে সেখানে একক প্রার্থী দেয়ার কথাও বলা হয়েছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান বলেন, স্থানীয় নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। উপজেলা নির্বাচনে স্থানীয় নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাংগঠনিক কার্যক্রম ধারাবাহিকতার বিষয়। সংগঠনের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। চেয়ারপার্সন যদি মনে করেন, তাহলে সাংগঠনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারেন।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যারা সক্রিয় ছিলেন না, তাদের ওপর খুবই অসন্তুষ্ট খালেদা জিয়া। তাই দলে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে যোগ্য নেতাকে যোগ্য জায়গায় নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে চান তিনি। এজন্য মার্চের শেষের দিকে দলের জাতীয় কাউন্সিল করার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। কাউন্সিলের পর ঢেলে সাজানো হবে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি।

জানা গেছে, কঠোর কোনো কর্মসূচির চিন্তা বাদ দিয়ে দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে মনোযোগ দিচ্ছেন খালেদা জিয়া। তাই শীতের তীব্রতা কমার পাশাপাশি চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার পরেই তিনি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। এছাড়া জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক সফরে বের হবেন তিনি। এই সফরকালে জেলা ও মহানগর কমিটিগুলোর সাংগঠনিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিতে স্থানীয় নেতাদের সাথে বৈঠক করবেন। সূত্র জানায়, এই সময়েও নির্দলীয় সরকারের দাবিতে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি।

সাংগঠনিক পুনর্গঠন দলের নিয়মিত কাজের অংশ দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে সংগঠন গতিশীল করাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না বিগত সময়ের আন্দোলনের ব্যর্থতার অন্যতম একটি কারণ সাংগঠনিক দুর্বলতা। কিভাবে এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা যায় সেভাবেই কাজ শুরু করা হবে। নিষ্ক্রিয় ও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করে দলকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। শিগগিরই এই ব্যাপারে দলের চূড়ান্ত ফোরামে আলোচনা হবে বলে জানান তিনি। তিনি জানান, চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে আন্দোলনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে না পারার পেছনে কি কি দুর্বলতা ছিল তা চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে দলটি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ