শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

রাবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ-ছাত্রলীগের হামলায় গুলীবিদ্ধ ৪০ ॥ ক্যাম্পাস রণক্ষেত্র

রাবি রিপোর্টার : গতকাল রেববার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে পুলিশ ও ছাত্রলীগ। এতে অন্তত ৪০ জন গুলীবিদ্ধ হয়। আহত হয়েছেন সাংবাদিক ও দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

গতকাল রোববার বেলা ১১টায় পুলিশ ও ছাত্রলীগ যৌথভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। পরে পুলিশ দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের ওপর গুলী ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।  বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি ও সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগ এই হামলা চালায়। দিনভর দফায় দফায় হামলায় পুরো ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ছাত্রলীগ-পুলিশের বেপরোয়া গুলীতে সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী গুলীবিদ্ধ ও দুই শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। এদের মধ্যে গুরুতর আহত ৪০ জন শিক্ষার্থীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অন্যদের বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্র ও বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়। আহতদের মধ্যে অন্তত সাত জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা। ঘটনার প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ভবন, প্রাইভেটকার এবং মোটর সাইকেল ভাংচুর চালায়। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্যাম্পাসে দুই প্লাটুন বিজিবি এবং র‌্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রো-ভিসিসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পদত্যাগ দাবি করেন। ক্যাম্পাসের কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ওপর পুুলিশের হামলার প্রতিবাদে ৩ সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগ ও রাজশাহী মহানগর পূর্ব জোনের ডিসি প্রলয় চিচিমকে ক্যাম্পাস থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বর্ধিত ফি প্রত্যাহার ও সান্ধ্যকোর্স বাতিলের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে রোববার সকাল ৮টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা খ- খ- মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে জড়ো হয়। প্রশাসন ভবনের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করতে থাকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ একটি মিছিল থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গুলী ও ককটেল নিক্ষেপ করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর সিরাজুল ইসলাম, হেলাল উদ্দিন এবং জুলফিকার আলীর নেতৃত্বে পুলিশ ও ছাত্রলীগ যৌথভাবে শিক্ষার্থীদের বেপরোয়া গুলী, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে দিগি¦দিক ছুটাছুটি করতে থাকে। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থী তৌহিদ, সাজু সরদার, আতিকুর রহমান, জহির রায়হান, বিথি সাহা, সালমা, তারিন, আবু সুফিয়ান, রাজীব, জিলানী, রুবেল পারভেজ, আনোয়ার, মায়া, রোজিনা, সোভন, আশুরাসহ অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী গুলীবিদ্ধসহ দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। এ সময় বেশ কিছু শিক্ষার্থী পুরাতন ফোকলোর মাঠে অবস্থান নিলে ছাত্রলীগ সেখানেও হামলা চালায়। পরে বিভিন্ন আবাসিক হলে পুলিশ ও ছাত্রলীগ পৃথকভাবে হামলা চালালে বেশ কিছু শিক্ষার্থী আহত হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী আটকে পরে।

এদিকে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে আবাসিক হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা দুপুর পৌনে ২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনের দিকে যাওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে পৌঁছালে পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলী ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পুলিশী হামলায় অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে রবীন্দ্র কলা ভবন, জুবেরী ভবন, মমতাজ উদ্দিন কলা ভবনসহ দুটি মাইক্রোবাস ও চারটি মটর সাইকেল ভাংচুর করে।

এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথম দফায় পুলিশ-ছাত্রলীগ যৌথ হামলার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে আরএমপি পুলিশের উপ-কমিশনার (পূর্ব) প্রলয় চিচিম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ সহকারী প্রক্টর সিরাজুল ইসলাম, হেলাল উদ্দিন এবং জুলফিকার আলী’র নির্দেশে পুলিশ সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয় এবং একপর্যায়ে তাদের ওপর গুলী নিক্ষেপ করে। এতে ২ সাংবাদিক গুলীবিদ্ধসহ কমপক্ষে ১০ সাংবাদিক আহত হয়। আহতরা হলেন মাছরাঙ্গা টিভির গোলাম রাব্বানী, বিডি নিউজ-এর নাদিম মাহমুদ, শীর্ষ নিউজের জাকির হোসেন তমাল, নিউজ এইজ’র নাজিম মৃধা, দৈনিক মানবকণ্ঠের বুলবুল আহমেদ ফাহিম, জহুরুল ইসলাম মুন, মেহেদী ও গোলাম রসুল রনি। সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সাংবাদিকরা তাৎক্ষণিকভাবে গ্রন্থাগারের সামনে বিক্ষোভ করেন। পরে সাংবাদিকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সাথে সাক্ষাৎ করে প্রশাসনকে বিকেল ৫টার মধ্যে ঘটনার সাথে জড়িত ৩ সহকারী প্রক্টরের পদচ্যুত এবং উপ-কমিশনার প্রলয় চিচিমের ক্যাম্পাস থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানান। সাংবাদিকদের দাবি মানা না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকরা। এদিকে ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা নিয়ে সন্ধ্যা সাতটায় ভিসির বাসভবনে জরুরি সিন্ডিকেট বৈঠকে বসে।

এ ব্যাপারে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আহ্বায়ক আহসান হাবিব রকি বলেন, আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে প্রশাসনের নির্দেশে পুলিশ ও ছাত্রলীগ যৌথভাবে আমাদের ওপর হামলা চালায়। এতে অসংখ্য আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এসময় তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান।

ছাত্রলীগ সভাপতি মিজানুর রহমান রানা বলেন, আমরা মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় আন্দোলনকারীরা আমাদের লক্ষ্য করে ঢিল নিক্ষেপ করে ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়। আমরা তাদের পাল্টা জবাব দিয়েছি মাত্র।

এ বিষয়ে পুলিশের উপ-কমিশনার প্রলয় সিচিম বলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করতে থাকে। পরে ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশেই পুলিশ গুলী চালিয়েছে। ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে রাবি ভিসি প্রফেসর ড. মিজানউদ্দিন বলেন, বর্তমানে ক্যাম্পাস শান্ত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সন্ধ্যায় আমরা একটি জরুরি সিন্ডিকেট সভার আহ্বান করেছি। সেখানে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের সাথে পরামর্শ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ