শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

মুফতী ফজলুল হক আমিনী (রহ:) স্মৃতিতে অম্লান এক মহান ব্যক্তিত্ব

মোঃ আমান উল্লাহ : আলেম সমাজের সাহসী কণ্ঠস্বর বলে পরিচিত দেশখ্যাত আলেমে দ্বীন, এ দেশের ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, ইসলামী ঐক্যজোটের সংগ্রামী চেয়ারম্যান, ঐতিহ্যবাহী লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া মাদরাসার সুযোগ্য প্রিন্সিপ্যাল হযরত মাওলানা মুফতী ফজলুল হক আমিনী (রহ:) আজ থেকে ১ বছর পূর্বে অর্থাৎ গত ১১/১২/২০১২ইং তারিখ ৬৭ বছর বয়সে অনেকটা আকস্মিকভাবে দুনিয়ার বুক থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। আমাদের আকাবিরে এজামদের মধ্য থেকে একেকজন মহান ব্যক্তিত্ব যখন এমনিভাবে আমাদেরকে ছেড়ে চলে যান তখন আমরা যেমন হারাই দ্বীনি ইলমের মহান উস্তাদকে তেমনি গোটা জাতি হারায় তার অভিভাবককে। যেমন, কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা হারিয়েছি জাতির দুই অভিভাবক শাইখুল হাদীস আল্লামা আযিযুল হক (রহ:) এবং জাতীয় মসজিদের খতীব আল্লামা উবাইদুল হক (রহ:) কে। এদেশের ইসলামী আন্দোলন ও সংগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রে মুফতী আমিনী (রহ:) এর শূন্যস্থান অদূর ভবিষ্যতে সহজে পূরণ হবার নয়। সাবেক চার দলীয় তথা বর্তমান ১৮ দলীয় জোটের তিনি ছিলেন অন্যতম শীর্ষ নেতা। বর্তমান সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি সরকারের রোষানলে পড়েন এবং প্রায় বিশ মাস যাবত তাঁর লালবাগ মাদরাসা ক্যাম্পাসে গৃহবন্দী তথা অবরুদ্ধ জীবন-যাপন অবস্থায় অবশেষে ইন্তিকাল করেন। তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানি সে বিষয়ে বর্ণনা করা আমার এ লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়। সেই প্রেক্ষিতে বিদগ্ধ পাঠকবৃন্দের জ্ঞাতার্থে তাঁর শিক্ষা, কর্ম ও আন্দোলনী জীবনের উপর আলোকপাত করা সঙ্গত মনে করছি।

১৯৪৫ সনের ১৫ নভেম্বর বি-বাড়ীয়া জেলার আমিনপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। ১৯৬১ইং সনে তিনি জামিয়া কুরআনিয়া আরাবীয়া লালবাগ মাদরাসায় আসেন। এখানে ৮ বছর পড়াশুনা করে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। অত:পর হাদীস শাস্ত্র বিশেষ করে ফেকাহ তথা ইসলামী আইনে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের নিমিত্তে ১৯৬৯ সনে পাকিস্তানের আল্লামা ইউসুফ বিণœুরী (রহ:) এর নিকট গমন করেন এবং করাচী নিউটাউন মাদরাসা থেকে হাদীস এবং ইসলামী আইনের উপর বিশেষ ডিগ্রী অর্জন করেন।

১৯৭০ সনে হাফেজ্জী হুজুর (রহ:) প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা-ই নূরীয়া, কামরাঙ্গীরচর মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। একই বছর তিনি হাফেজ্জী হুজুরের কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭৫ সনে তিনি লালবাগ মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে এই মাদরাসার সহকারী মুফতী, প্রধান মুফতী, ভাইস প্রিন্সিপ্যাল ইত্যাদি দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮৭ সনে হাফেজ্জী হুজুরের ইন্তিকালের পর মাদরাসার প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত এই মহান দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৭২ সনে মাদরাসায় কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি মাত্র ৯ মাসে হাফেজে কুরআন হন। তিনি একজন হাফেজে কুরআন এবং শায়খুল হাদীস হলেও মূলত: মুফতী হিসেবেই সর্বমহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৪ সনে তিনি ইরান-ইরাক ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বন্ধে হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক শান্তি মিশনের অন্যতম সদস্য ছিলেন।

এই ভূখন্ডে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বিশেষ করে মুসলিম জাতীর সংকট মুহুর্তে উলামায়ে কেরাম যে আন্দোলন সংগ্রাম করে গিয়েছেন তার ঋণ কোন দিন শোধ হবার নয়। তারই প্রেক্ষাপটে ১৯৮১ সনে মাওঃ মোহাম্মদুল্ল¬াহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ:) “তওবার রাজনীতি” বলে এ দেশে ইসলামী রাজনীতির পুনর্জীবন দানে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এ সময় মুফতী আমিনী হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠন খিলাফত আন্দোলনের সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন। হাফেজ্জী হুজুরের ইন্তিকালের পরবর্তী পর্যায়ে মূলত: তাঁর সুযোগ্য পুত্র মাওঃ আহমাদুল্ল¬াহ আশরাফ এই সংগঠনের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে মুফতী আমিনী ইসলামী মোর্চা, সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। সর্বশেষ তিনি ইসলামী ঐক্যজোট সহ ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি, খেলাফতে ইসলামী বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। হযরত আমিনী এই সব সংগঠনের মাধ্যমে এ দেশে আল্লাহর আইন ও সৎ লোকের শাসন কায়েমের নিরন্তর সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন।

যদ্দুর মনে পড়ে এই মহান ব্যক্তিত্বকে আমার প্রথম দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল ৯০-এর দশকে পতিত রাষ্ট্রপতি এরশাদের শাসনামলের মাঝামাঝি সময়ে। আমি তখন নেত্রকোণা উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র। হযরত হাফেজ্জী হুজুরের আগমন উপলক্ষে একটি কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল নেত্রকোণা পাবলিক হলে। সেদিন হাফেজ্জী হুজুরের হেদায়াতী বক্তব্য, মুফতী আমিনীর অনলবর্ষী বক্তব্য এবং মাওঃ জাফরুল্লাহ খানের প্রাঞ্জল বক্তব্য আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল।

পরবর্তীতে তিনি ১৯৯২ ইং সনে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার প্রতিবাদে আয়োজিত লং মার্চের আয়োজন করেন এবং নেতৃত্ব দেন। তারই পূর্বাপর কোন এক সময়ে তিনি মোমেনশাহীর খাগডহর মাদরাসায় আগমন করেন। আমি তখন নাসিরাবাদ কলেজের ছাত্র ছিলাম এবং মাহফিলের বক্তব্য শুনার জন্য সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম। তার অল্প কিছুদিন পূর্বে তিনি হজ্ব সমাপন করে দেশে এসেছিলেন। হজ্বের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় তিনি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে ধরেছিলেন। আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগের কথা হলেও এখনো আমার কিছু কিছু মনে পড়ে। তাঁর ভাষায়, “হজ্বের তালবিয়া পাঠ করছি, লাব্বায়েক, আল্ল¬াহুম্মা লাব্বায়েক-------। আমার মনে হচ্ছিল যে, আল্ল¬াহ পাকের অতি কাছাকাছি এসে পড়েছি, মনে হচ্ছিল যে, আল্ল¬াহ ও তাঁর বান্দার ব্যবধান বুঝি মুছে গিয়েছে- আল্ল¬াহু আকবার।” “কাবার গিলাফ ধরে ক্রন্দন করছি, চোখ থেকে পানি ঝরছে, মনে হচ্ছে পানি ত নয়, জিন্দেগীর গোনাহগুলো বৃষ্টির মত ঝরে পড়ছে- আল্ল¬াহু আকবার।” এভাবে তিনি এক মর্মস্পর্শী ভাষায় বর্ণনা করছিলেন আর থেকে থেকে বলছিলেন- আল্ল¬াহু আকবার।

তিনি ১৯৯৪ ইং সনে এদেশের নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। বিশেষত: বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরীনের বিরুদ্ধে তিনি দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর এই আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ডানপন্থী সংগঠন ব্যাপক সমর্থন যুগিয়েছিল। ফলে তৎকালীন সরকার তসলিমা নাসরীনকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। আন্দোলন যখন পুরোদমে জমে উঠেছে তখনকার কথা। মুফতী আমিনী সফরে গিয়েছিলেন হযরত মাও: আতহার আলী (রহ:) এর স্মৃতিধন্য কিশোরগঞ্জে। সেখানকার ঐতিহাসিক শহীদি মসজিদে এক বিশাল গণজমায়েতের তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি। তখন তিনি ছিলেন সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের মহাসচিব। ঐ সময় নেত্রকোণা জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা জনাব উসমান গণি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে নেত্রকোণা জেলা সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেছিলেন এবং কিশোরগঞ্জের জনসভায় এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। আমার পরিষ্কার মনে পড়ে মুফতী আমিনী সেই প্রেক্ষিতে বলেছিলেন, “আজ নেত্রকোণা জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি হয়ে গিয়েছেন নেত্রকোণা সংগ্রাম পরিষদের সেক্রেটারি। আমি আশা করি এক দিন সমগ্র বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি হয়ে যাবেন ইসলামের ঝান্ডাবাহক সংগ্রাম পরিষদের সেক্রেটারি।”

তার পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর মোমেনশাহীর কওমী মাদরাসা ভিত্তিক উলামায়ে কেরামদের সংগঠন ‘ইত্তেফাকুল উলামা’ কর্তৃক কয়েকদিন ব্যাপী এক সীরাত মাহফিলের আয়োজন করা হয় মোমেনশাহী ঈদগাহ ময়দানে। আমি কোন এক কাজে তখন মোমেনশাহী গিয়েছি এবং মাহফিল স্থলে উপস্থিত হয়েছি। যদ্দুর মনে পড়ে পোষ্টারে মুফতী আমিনীর নাম চোখে পড়েনি কিন্তু দায়িত্বানুভূতির তাগিদে এবং হৃদয়ের টানে তিনি সেখানে হাজির হয়েছিলেন। তাকে যখন গাড়ী থেকে নামতে দেখেছি মনে হল খুবই সাদামাটা ভাবে তিনি এসেছেন। তার মধ্যে ক্লান্তির কোন ছাপ ছিলনা। কারণ, তার কোন গতানুগতিক পেরেশানী ছিল না। পেরেশানী একটাই যে, কিভাবে দাওয়াত ইলাল্লাহর কাজকে ব্যাপক করা যায়, দেশব্যাপী বিস্তৃত করা যায়।

বিগত আওয়ামী শাসনামলে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় এনজিওদের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র আন্দোলন সংগঠিত করেন। এনজিও’র বিরুদ্ধে আন্দোলন একপর্যায়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। সরকার সেই আন্দোলনের কর্মসূচীকে বানচাল করতে গুলী বর্ষণ করে। ফলে তিনজন হাফেজে কুরআন সহ ৯ জন আলেম ও তালেবে এলেম শাহাদাত বরণ করেন। উক্ত আন্দোলনের মূল প্রেরণাদায়ির ভূমিকায় ছিলেন মুফতী আমিনী (রহ:)।

সম্ভবত: ২০০১ সনের প্রথম দিকে হাইকোর্ট থেকে ফতোয়া নিষিদ্ধের রায় ঘোষিত হলে তিনি গর্জে উঠেছিলেন এবং দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলন সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার ফলে তিনি আওয়ামী দু:শাসনের কোপানলে পড়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন, কারাভোগ করেন দীর্ঘ ৪ মাস।

এবারও দেশে আওয়ামী দু:শাসন শুরু হলে তিনি সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। ফলে তিনি জালিম সরকারের রোষানলে পড়েন। তাকে দুর্বল করার কৌশল হিসেবে সরকারের গোয়েন্দাবাহিনী তাঁর ছেলেকে অপহরণ করে। একপর্যায়ে মুফতী আমিনী তাঁর ছেলেকে হারানোর বিষয়টি আল্লাহর নিকট সোপর্দ করে দেন। তিনি দোয়া করেন, “হে আল্ল¬াহ! আমার কলিজার টুকরো ছেলেকে অপহরণের জন্য যে দায়ী তার ছেলেকেও অনুরূপ পরিণতি দান কর”। বিস্ময়কর ভাবে এর কয়েকদিন পরেই তিনি তাঁর ছেলেকে অসুস্থ অবস্থায় ফিরে পান।

অষ্টম সংসদ নির্বাচনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-২ আসন থেকে অংশগ্রহণ করেন এবং বিজয়ী হন। আমার জানামতে এ আসন থেকে তিনবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় এম.পি উকিল আব্দুছ ছাত্তার বি.এন.পি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশনায় মুফতী আমিনীর সম্মানে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। পরে অবশ্য উকিল আব্দুছ ছাত্তার মন্ত্রী পরিষদে স্থান লাভ করেন।

বিগত জোট সরকারের শাসনামলে কওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসকে মাষ্টার্স মান দেয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আমার জানামতে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার তৎকালীন ভি.সি. ড. মুস্তাফিজুর রহমানের অনেক চেষ্টার পরেও প্রক্রিয়াগতভাবে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর কওমী মাদরাসাগুলোকে তাদের অনুগত বানাবার জন্য ফন্দি-ফিকির শুরু করে। তারই অপপ্রয়াস হিসেবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে এবং দেশের বৃহত্তম ঈদগাহ শোলাকিয়ায় তাদের পছন্দের ইমাম ও খতীব নিয়োগ করে। জাতীয় মসজিদের খতীব এমনই বশংবদ যে, আওয়ামী লীগের দলীয় সভায় ডাক পেলে সেখানে উপস্থিত হতেও কুন্ঠিত হননা। আর শোলাকিয়া মাঠের ইমাম নাস্তিক হিসেবে পরিচিত সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের প্রত্যক্ষ মদদদানকারী, উস্কানীদাতা বললেও বাড়িয়ে বলা হবেনা। দু:খজনক হলেও সত্য যে, উভয়কেই সরকারি সহায়তায় পুলিশী শক্তি প্রয়োগ করে তাদের ইমামতি পরিচালনা করতে দেখেছি। গণমানুষের নিকট তাদের এসব কান্ডকারখানা কেবল ঘৃণারই জন্ম দিয়েছে। যা হোক, উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাটহাজারী দারুল উলুম মাদরাসার মহাপরিচালক, সর্বজনশ্রদ্ধেয় ইসলামী ব্যক্তিত্ব আল্ল¬ামা আহমদ শফী’র নির্দেশনার প্রেক্ষিতে মুফতী আমিনী কওমী মাদরাসার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের পরিচালিত যাবতীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে আপোষহীন ভূমিকা রেখে গিয়েছেন। ফলে এ দেশের কওমী মাদরাসাগুলো তার নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে।

জীবনের শেষ দিনও তিনি ইসলামী শিক্ষা, ইসলামী আন্দোলন তথা ইসলামের জন্য কাজ করে গিয়েছেন। শেষ দিন মাগরিবের পর তিনি বুখারী শরীফ থেকে হাদীসের দরস দেন। লালবাগ শাহী মসজিদে ইশার নামাজান্তে একটি জানাযা নামাজের ইমামতি করেন। অত:পর সাংগঠনিক নেতা-কর্মীদের সাথে ঘরোয়া বৈঠকেও মিলিত হন। আল্লাহ পাকের অপার রহমত যে, তিনি জীবনের শেষদিনও ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাওয়ার তাওফীক প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

তাঁর নামাজে জানাযা সম্পর্কে কিছু কথা উল্লেখ না করে পারছিনা। জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে তার জানাযায় যে লোক সমাগম হয়েছিল অভিজ্ঞ মহল তাকে স্মরণকালের বৃহত্তম জানাযা বলে মনে করছেন। এর কিছু দিন পূর্বে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র মাওলানা রাফীক বিন সাঈদীর নামাজে জানাযায় অভূতপূর্ব লোক সমাগম হয়েছিল। যদিও সরকার কোন বৃহৎ ময়দানে নামাজে জানাযার ব্যবস্থা করতে অনুমোদন দেয়নি। মুফতী আমিনীর নামাজে জানাযায় ১৮ দলের নেতৃবৃন্দ, দেশের বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিপুল সংখ্যক ইসলামী ব্যক্তিত্ব অংশগ্রহণ করেন। সকলেই নির্বিশেষে একটি কথাই বলেন যে, মুফতী আমিনীর মৃত্যু কোন স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, সরকারের অব্যাহত মানসিক নিপীড়নের ফলশ্রুতিতেই তার মৃত্যু হয়। কিন্তু সরকারের স্মরণে রাখা উচিৎ যে, ইসলামী আন্দোলনের একজন নেতাকে হত্যা করে গোটা ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়া যায়না।

তাঁর প্রণীত ব্যতিক্রমধর্মী বই “দোয়া-মুনাজাত” গ্রন্থটি আমার পড়ে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। লালবাগ মাদরাসা থেকেই বইটির প্রকাশ। এ ধরণের বই আমি এর আগেও অধ্যয়ন করেছি যা ছিল হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ:) এর রচিত। বর্তমান সময়ে “দোয়াউল হুসনা” নামে একটি ছোট সাইজের বই বের হয়েছে যা সহজলভ্য ও বিশুদ্ধ। তবে মুফতী আমিনীর বইটি একটু ব্যতিক্রম এজন্য যে, এতে বিভিন্ন মর্মস্পর্শী দোয়াই কেবল প্রাধান্য পেয়েছে। বইটির সম্পাদনা পরিষদের ভাষায়: “সাধারণের মাঝে মুফতী আমিনী ইসলামের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজন প্রতিবাদী দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু তিনি যে তার মহান মনিবের দরবারে অবুঝ শিশুর মত রোনাজারী করতে পারেন তারই পরিচয় জ্ঞাপক হচ্ছে উক্ত বই”।

সময়ের সাহসী ব্যক্তিত্ব মুফতী আমিনী বর্তমান শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সরকারি জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে বক্তব্য-বিবৃতি প্রদান করতে পিছ পা হননি। তিনি বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের নামে আল্লামা সাঈদী সহ জামায়াত নেতৃবৃন্দের উপর চাপিয়ে দেয়া অমানবিক তৎপরতার বিরুদ্ধে কথা বলেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, জামায়াতের সাথে আমাদের মতাদর্শগত পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু তাদের উপর সরকারের অব্যাহত জুলুম কিছুতেই মেনে নেয়া যায়না। এ ধারণা অমূলক নয় যে, জামায়াতের ব্যাপারে তার এহেন ভূমিকার দরুণ সরকার তার প্রতি আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তার অবরুদ্ধ জীবন যাপনকে অধিকতর প্রলম্বিত করে।

উপরোক্ত লেখাটি বিশেষ কোন তত্ত্ব-তথ্যের সমাহার নয়, তাই বাহুল্য কোন কিছুর উল্লেখ থাকলে সুধী পাঠক নিশ্চয়ই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বিবেচনা করবেন। পরিশেষে হৃদয়ের সবটুকু আবেগ উজাড় করে দিয়ে ফরিয়াদ ব্যক্ত করি: ইয়া আল্লাহ! মুফতী আমিনীর শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য এ জাতির মধ্য থেকে একজন যথোপযুক্ত ব্যক্তিত্ব বের করে নাও।

-লেখক: কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ