মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

চোখের পানি

তাহমিনা ইয়াসমীন : কলাবাগানের খেলার মাঠের পাশ দিয়ে উদ্্ভ্রান্তের মতো হাঁটছে তহুর আলী। কাঁধে ঝুলানো বড় কাপড়ের ব্যাগটি এক পাশ থেকে অন্য পাশে সরিয়ে নেয়। অবাধ্য চোখ দু’টোকে আজ সে কোনভাবেই শাসনে রাখতে পারছে না। বার বার ঝাপসা হয়ে তার চলার পথকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে তুলছে। খোকার ছোটবেলার মায়াবী চেহারাটা আজ বড় বেশি মনে পড়ছে। তহুর আলী কোনভাবেই সেই চেহারার সাথে গত রাতের চেহারা মিলাতে পারছে না। ‘এ কি আমার সেই খোকা নাকি অন্য কেউ!’ পাট ক্ষেতের আইল দিয়ে হাঁটতে গিয়ে পাট পাতায় বিছা দেখে যে ছেলে ভয়ে বাবার লুঙ্গির সাথে পেঁচিয়ে যেত সেই ছেলের এই আচরণ সে কোনভাবেই যেন মানতে পারছে না। খোকার লেখাপড়ার খরচ চালাতে গিয়ে তহুর আলী তার এক দাগের বড় জমিটিই বিক্রি করে দিয়েছে। সে নিজে সুযোগের অভাবে বেশি লেখাপড়া করতে পারেনি। তাই অন্তত ছেলেটাকে লেখাপড়া করানোর চেষ্টায় সে কোন ত্রুটি করেনি। সে জন্য মেয়ে দু’টোর দিকে সে কমই খেয়াল করতে পেরেছে। ভিতর থেকে কান্না তার উথলে উঠছে বার বার। গত বছর বড় মেয়ে তাহেরা প্রথম সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা যাবার সময়ও সে খুব কেঁদেছে। কিন্তু আজকের কান্না তার চাপা কষ্টের। খোকাকে নিয়ে তার কত স্বপ্ন ছিল। সে লেখাপড়া করে বড় হয়েছে, ব্যবসা করছে। অবশ্য তহুর আলী এখনো জানতে পারেনি সে কিসের ব্যবসা করে। কলাবাগানের একটি দোতলা বাড়িতে সে বউ নিয়ে থাকে। বিয়ের চার বছর পার হয়ে গেছে এখনও তাদের কোন ছেলেমেয়ে হয়নি। তিন বছর যাবত বাড়িও যায়নি। তাই গতকাল তহুর আলী নওগাঁ থেকে ছেলেকে দেখতে এসেছে। সাথে এনেছিল গাছের আম, কাঁঠাল ও এক হাঁড়ি গরুর দুধ। অনেক খোঁজাখুঁজি করে সে ছেলের বাসা বের করে। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। খোকা ও তার স্ত্রী তখন বাসায় ছিল না। বাবুর্চি রহমত তাকে খাতির-যতœ করে। গেস্টরুমে তাকে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। সারা দিনের জার্নির ক্লান্তিতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। রাত ১১টায় খোকা তার স্ত্রীকে নিয়ে বাসায় ফিরে। ঘুম ভেঙ্গে যায় তহুর আলীর। জরুয়া পার্টি ড্রেস পরা বৌমা তহুর আলীকে দেখার সাথে সাথে চেহারায় বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠে, যা তহুর আলীর দৃষ্টি এড়ায় না। ৩ বছর পর খোকাকে দেখে তহুর আলী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। দু’হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে বলতে থাকে, ‘বাবা খোকা, তুই ভালো আছিস তো?’

‘ভালো তো ছিলাম কিন্তু তুমি কেন আবার ঢাকায় আসতে গেলে বাবা? তাছাড়া আসার আগে আমাকে তো একবার জানাতেও পারতে।’ শুকনো মুখে বলে উঠে খোকা।

‘মানে ...., তোর মা তো আমাকে অনেক বলে কয়ে পাঠালো, গাছের ফলমূল তো তোকে না দিয়ে সে মুখে তুলতে চায় না। অনেক দিন বাড়ি যাসনি, কেমন আছিস জানতেও সে ব্যাকুল হয়ে আছে।’ তহুর আলী ছেলের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

‘কেন, ঢাকায় কি ফলমূলের অভাব? আর এত অস্থিরতারই বা কি আছে? দেখো তো, নোংরা কাপড় নিয়ে বেড সিটটাকে কি করে ফেলেছো। তোমার বৌমা তো এগুলো মোটেও সহ্য করতে পারে না।’ এই বলে চট চট করে নিজের রুমে ঢুকে যায় খোকা। খোকার আচরণ দেখে তহুর আলী যেন নিজেকে সামলাতে পারছে না। কী করবে সে এত রাতে! অস্থির হয়ে কতক্ষণ ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করে। তারপর বারান্দায় রাখা কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকে উদাস দৃষ্টি মেলে। ভাবতে থাকে তহুর আলী, হায়! আমি কেন যে স্ত্রীর কথায় ঢাকায় আসতে রাজি হলাম। ছেলে আমাদের ভুলে গেছে, আমাদের তো এত মায়া থাকা উচিত হয়নি। গ্রামে আমার মান-মর্যাদার অভাব নেই। একটি ছেলে না হয় .....।

এমন সময় বাবুর্চি রহমত পাশে এসে দাঁড়িয়ে আস্তে করে পিঠে হাত রাখে।

‘চাচা, সাহেব-বিবি ঘুমাইয়া গেছে। চলেন, ঘরে চলেন।’

‘না বাবা, আমি আর ঐ বিছানায় শুইতে চাই না। আমি আজকের রাতটা এভাবেই বসে কাটিয়ে দেব।’ ভাঙ্গা গলায় বলে তহুর আলী।

‘চাচা মন খারাপ কইরা কি করবেন, সবই নসীব। চলেন তাহলে আমার রুমে চলেন। আমরা গ্রামের মানুষ, আমরা মানুষের কষ্ট বুঝি।’

রহমত তহুর আলীকে দুই হাতে টেনে তুলে নিয়ে যায় নিজের রুমে। যতœ করে নিজের বিছানায় শুইয়ে দেয়। পাশে বসে বসে গল্প করে।

‘কি কইমু চাচা, আমরা গ্রামের মানুষ, এত কিছু বুঝি না। এই বাসায় কত মানুষ আসে আর আপনার জায়গা হয় না। প্রতি শুক্রবার এই বাসাতে কিসের জানি পার্টি বসে। কত মহিলা-পুরুষ একসাথে বইসা আনন্দ-ফূর্তি করে, গান-বাজনা করে, খাওয়া-দাওয়া করে। সকাল বেলা কত রং-বেরং-এর বোতল ঘরের মধ্যে পইড়া থাকে। আমি সাফ করি। সাহেব-বিবি অনেক বেলা কাইরা ঘুম থেকে উঠে, আমি টেবিলে নাস্তা সাজাইয়া বইসা থাকি। সাহেব তো বিবি সাহেবেরে খুব ডরায়। মুখের উপর কিচ্ছু কইতে পারে না। আসলে সাহেবের কপালে অনেক দুঃখ আছে। নইলে বাপের সাথে মানুষ এমন করে?’ এমনি বিভিন্ন কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ে দুইজন। ভোর বেলা তহুর আলী তার কাপড়ের ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

তহুর আলী হাঁটছে। ক্লান্তি যেন তাকে চেপে বসেছে। ভোরবেলা রাস্তায় তেমন মানুষজন নেই। একটা রিকশাও পাচ্ছে না। গাবতলী বাস স্ট্যান্ডের দিকে সে আস্তে আস্তে হাঁটছে। রাস্তায় কিছু মানুষ জগিং করছে। হঠাৎ সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় একটি লোক।

‘তহুর চাচা না? আপনি কোথা থেকে?’ তহুর আলী মুখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পারে। পাশের গ্রামের নূরুন্নবী মাস্টারের ছেলে সুমন। কলেজের প্রফেসার। কলাবাগান মাঠে জগিং করে বাসায় ফিরছিল। ‘সুমন, বাবা কেমন আছো?’

‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি চাচা। আপনি ঢাকায় এসেছিলেন কবে?’ জানতে চায় সুমন।

‘বাবা, জরুরি একটি কাজে গতকাল এসেছিলাম, আজ বলে যাচ্ছি।’ নিজের কষ্টের কথা বুকে লুকিয়ে রেখে জবাব দেয় তহুর আলী।

‘আজই চলে যাচ্ছেন মানে? চলেন আপনি আমার বাসায় আজ বেড়াবেন। আপনাকে আমি আজ যেতে দিচ্ছি না।’ এই বলে তহুর আলীকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে সুমন তার বাসার দিকে। তহুর আলী না করতে পারে না। সুমনের বাসা এখান থেকে বেশি দূরে নয়। বাসায় গিয়ে স্ত্রীকে ডেকে বলে, ‘দেখো, আমি আমার প্রিয় চাচাকে নিয়ে এসেছি, তাড়াতাড়ি আমাদের জন্য নাস্তা রেডি কর।’ সুমন আলমারী থেকে ইস্ত্রি করা নিজের একটি পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি বের করে দিয়ে বলে, ‘আপনাকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে; আপনি বাথরুমে গিয়ে গোসল সেরে ফ্রেস হয়ে নেন।’ তহুর আলী গোসল করতে ঢুকে। বাথরুমের শাওয়ার ছেড়ে কিছুক্ষণ মন খুলে কাঁদে।

‘হায় রে পৃথিবী! যে ছেলের জন্য এত কষ্ট করলাম সেই ছেলে, সেই রক্ত আমার বেঈমান হয়ে গেছে। অথচ সুমন কি সম্পর্ক তার সাথে আমার? মুখে ডাকা সম্পর্ক ছাড়া তো আর কিছু নয়! কত পার্থক্য দু’জনের মধ্যে। কি সুন্দর তার আপন করে নেয়ার কৌশল!’

নাস্তা সেরে সুমন অনেকক্ষণ বসে গল্প করে তহুর আলীর সাথে। গ্রামের সবার খোঁজ-খবর নেয়। খোকার কথা জিজ্ঞেস করায় তহুর আলী অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। সুমন বুঝতে পেরে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলে।

‘চাচা, ছুটিতে আমি বাড়ি যাব। সেখানে আমি একটি ইসলামী গানের জলসা করবো, আপনি থাকবেন কিন্তু।’

‘হ্যাঁ বাবা, আমি জানি তুমি খুব সুন্দর গান গাও। তোমার লেখা গানগুলো এখন গ্রামের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। সৃষ্টি ও ¯্রষ্টাকে নিয়ে লেখা তোমার গানগুলো অনেকের মাঝেই নতুন উদ্দিপনার সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যে গ্রামের কিছু কিছু যুবকের চরিত্রেও পরিবর্তন এসেছে। চালিয়ে যাও বাবা। গ্রামের মানুষের মাঝে পরিবর্তন এলে সমাজে অন্যায় অনাচার বন্ধ হবে। আমি দোয়া করি বাবা, তোমার এই প্রচেষ্টা যেন সফল হয়।’

‘জি চাচা, আপনাদের দোয়া আমার খুব প্রয়োজন। আমি পাঁচ বছর আগে যখন গ্রামে গিয়ে দেখলাম, গ্রামের মানুষ আর আগের মত নেই। ঘরে ঘরে টিভির প্রভাবে গ্রামের মানুষগুলো তাদের চিরচেনা ব্যবহার হারিয়ে ফেলেছে। কমে এসেছে ঘরে ঘরে ধর্মের চর্চা, তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে সবার সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলবো। আর আল্লাহর দেয়া আমার গানের গলাটাকে ব্যবহার করবো সমাজ সংশোধনের কাজে।’

‘বেশ ভালো, আমি সময় করে অবশ্যই আসবো তোমার জলসায়। আর কোন সহযোগিতার দরকার হলে এই বুড়ো ছেলেটাকে স্মরণ করতে ভুলো না যেন।’ উৎসাহের সাথে বললো তহুর আলী।

দুইদিন খুব আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে কেটে যায় তহুর আলীর। তারপর সুমন তাকে গাবতলীতে নিয়ে গিয়ে টিকেট কেটে তুলে দেয় নওগাঁর বাসে।

ঈদুল ফিতরের পরের দিন সুমন গ্রামে ইসলামী গানের জলসার আয়োজন করে। আশে পাশের গ্রামের যুবকেরা বেশ আনন্দের সাথে সেই জলসায় আসতে থাকে। তহুর আলী তার নিজের গ্রামের ছেলেদেরকে উৎসাহ দিয়ে নিয়ে এসেছে। সুমনের মর্মস্পর্শী গানগুলো সবার মাঝে আবেগের সৃষ্টি করেছে। গ্রামের অনেক মুরুব্বীও এসেছেন গান শুনতে। তারা আল্লাহ ও নবী প্রেমের গানগুলো শুনে কাঁধের গামছা দিয়ে চোখের পানি মুছতে থাকে। গানের আসর শেষে সুমন ঘোষণা করলো, ‘আগামীকাল রয়েছে জলাভূমি পরিষ্কারকরণ ও পথের ধারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। আমি ঢাকা থেকে উন্নতজাতের কিছু কাঠ ও ফলের গাছ এনেছি। আপনারা কারা কারা কালকের কর্মসূচিতে শরিক হতে চান?’

ছেলে-বুড়ো সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, ‘আমরা রাজি।’

‘হ্যাঁ, আমি জানি, আপনারা পলির দেশের মানুষ। আপনাদের মনগুলো পলিমাটির মত নরম। আমরা যদি আপনাদেরকে সঠিকভাবে গাইড দিতে পারতাম তাহলে গ্রামের প্রতিটি মানুষ এক একটি শক্তিতে পরিণত হতো। গ্রামগুলো হতো স্বনির্ভর, সুন্দর।’

তিনদিন বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের পর এবার সুমনের ঢাকায় ফেরার পালা। একে একে সবাই দেখা করতে আসছে সুমনের সাথে। প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার ইব্রাহীম স্যার সুমনের ছোটবেলার শিক্ষক। তিনিও এসেছেন সুমনকে বিদায় জানাতে। ইব্রাহীম স্যার সুমনের মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করছেন। ‘বেঁচে থাকো বাবা। ঘরে ঘরে তোমার মতো সৎচিন্তার ছেলে যেন জন্ম হয়। এইভাবে সবাই চিন্তা করতে পারলে গ্রামের যুব সমাজ আর বিপথে যেতো না। তাদের যার যা যোগ্যতা আছে কাজে লাগিয়ে দেশ গড়ার কাজে সাহায্য করতে পারতো।’

‘ঠিকই বলেছেন স্যার, আসলে জনসংখ্যা আমাদের কোন সমস্যা নয়, সমস্যা হলো মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর জন্য পরিকল্পনার অভাব। এ ব্যাপারে কিছুলোককে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

সুমনকে বিদায় দেয়ার জন্য পাশের গ্রামের তহুর আলী ছুটে এসেছে। সে রিকশা ভর্তি করে নিয়ে এসেছে নিজের ক্ষেতের টাটকা শাক-সবজি ও ফলমূল। তার স্ত্রী ঘন করে জ্বাল দিয়ে এক বোতল গরুর দুধ দিয়েছে সুমনের জন্য। এলুমিনিয়ামের বড় পাতিলের মুখে পাতলা কাপড় দিয়ে বেঁধে অনেক পুকুরের কিছু তাজা মাছ। মনে মনে ভাবছে তহুর আলী, ‘খোকা নামের কোন সন্তান আমার নাইবা থাকলো, সুমন তো আমার রক্তের চেয়েও বেশি। আমি না হয় ওর মধ্যেই আমার সন্তান সুখ খুঁজে পাবো।

সুমন তার প্রাইভেট কারে উঠে বসলো। তহুর আলী পাঞ্জাবির হাতায় আলতো করে সরিয়ে নিলো চোখের পানিটুকু। ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিল, সাথে সাথে পাতিলের ভিতরে তাজা মাছগুলো খলবলিয়ে উঠলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ