শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ভালোলোকের দায়িত্ব কর্তব্য

এম. এম. আলী : পৃথিবীতে লক্ষাধিক মহামানুষ অর্থাৎ নবী-অবতার এসেছিলেন। তারা সাম্প্রদায়িকতা, প্রতারণা, শোষণ-নির্যাতন করতে শেখাননি। মানবতা, মানবিক দায়িত্ব-কর্তব্য এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ তথা বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টির নীতিমালা, ¯্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, তার স্তুতি-উপাসনা করার সঠিক পদ্ধতি শিখিয়েছেন।

বিশ শতাব্দী পর্যন্ত ধর্মবিজ্ঞান মানবজাতিকে যে জ্ঞান দান করেছে, ফলস্বরূপ একুশ শতাব্দীর প্রাক্কালেই বিশ্বে শান্তি বিরাজ করা উচিত ছিল। তা না হয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রতারণা, শোষণ, (ধর্মীয়, জাতীয়তাবাদী ও রাজনৈতিক দলীয়) সাম্প্রদায়িকতা বেঁচে থাকা বিশ্ববিবেক, রাষ্ট্রনায়ক, শিক্ষাবিদ ও বিচারবিভাগের দায়িত্বশীলদের মানবিক দায়িত্বকর্তব্যের সচেতনতার পরিচয় বহন করে না।

আমি সকল ধর্মের সারমর্ম মানবধর্মের কয়েকটি উপদেশের সংক্ষিপ্ত কথা তুলে ধরছি। মানবজাতি যদি এ কয়েকটি কথা-ই মেনে চলে, তা হলে পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করবে এবং সকল দ্বন্দ্ব-কলহ-যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে। আধুনিক বিজ্ঞানের দ্রুত উন্নতি হবে এবং বিশ্ববাসী মনে করবে মানবজাতি পরস্পর ভাই, একই পরিবারের মানুষ।

১। মানবজাতির প্রতি বিশ্বপ্রভু আল্লাহর সতর্কবাণী : “সময়ের শপথ, নিশ্চয়ই সকল মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। কিন্তু তারা নয়, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে, ভালো কাজ করছে, পরস্পর সত্য ও ন্যায়ের উপদেশ দিচ্ছে এবং ধৈর্যধারণের উৎসাহ দিচ্ছে। (ভাবার্থ সূরা আল আসর) আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু মানবজাতিকে ভয় দেখিয়ে ক্ষান্ত হননি। বিপদমুক্তির সহজ উপায়ও দেখিয়েছেন। তা হচ্ছে-

২। সৎ, ভদ্র, শিক্ষিত, সচেতন অর্থাৎ ভালোলোকের মর্যাদা দায়িত্ব ও কর্তব্য : “এখন তোমরাই মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম দল যাদের মানবজাতির কল্যাণ ও সংস্কার বিধানের জন্য উপস্থিত করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে ভালোকাজের আদেশ করবে এবং মন্দকাজে নিষেধ করবে আর আল্লাহর উপর ঈমান রাখবে। (৩-১১০) ভাবার্থ) কথা ক’টি সপ্তম শতাব্দীতে শেষনবীর অনুসারী সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল। সে সময় পৃথিবীতে তারাই ছিলেন সর্বোত্তম মানবদল। বর্তমানে সকল দল মতবাদেই কিছু ভালোলোক আছে, যাদের এটাই দায়িত্ব কর্তব্য।

৩। জন্মসূত্রে তোমরা আদিপিতা আদমসন্তান, পরস্পর ভাই। সুতরাং কাউকে ছোটজাত মনে করে অহংকার ঘৃণা করো না। বর্ণবাদ হচ্ছে বিধাতার নির্দেশ সত্য ও মানবতাকে অস্বীকার করা।

৪। সকল মানুষের কল্যাণ কামনা করবে এবং শত্রুকেও সৎ পরামর্শ দেবে। সর্বোত্তম পরামর্শ হচ্ছে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস কর। মন্দ কাজ কোরো না, মানুষকে ভালোকাজের আদেশ এবং মন্দকাজে নিষেধ কর। কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা কর, অন্যদেরও এরূপ পরামর্শ দাও এবং কর্মঠ, জ্ঞানী, সংযমী, ধৈর্য, ক্ষমা ও দানশীল হও।

৫। বিশ্বনেতা বলেছেন : “আল্লাহ কর্মঠ হাত পছন্দ করেন”। সুতরাং তোমরা কর্মব্যস্ত ও জ্ঞানার্জনে ব্যস্ত থাকবে: অথবা সমাজকল্যাণ, গণশিক্ষা, ইবাদত, আরাধনা ও আত্মশুদ্ধিমূলক কাজ করবে। যথাসাধ্য অপরের কাজে সাহায্য করবে। পূর্ব শিক্ষার বিষয় ও সুযোগের অভাব ছিল। আধুনিক বিজ্ঞান বিদ্যার বহু শাখা আবিষ্কার করেছে। আজ তা থেকে দু’চারটা অর্থকরী বিদ্যা শিক্ষা করা যুগের দাবি। মানবতা, মানবিক দায়িত্ব, কর্তব্য ও গণতন্ত্র যে কোন মতবাদ ও পেশাধারী মানুষের অবশ্যই জ্ঞাতব্য। গল্প ও আড্ডা দেয়ার সময় কোথায়? আজকাল নিরক্ষর ও অজ্ঞ থাকা মহাপাপ আর এ পাপের অংশীদার রাষ্ট্রের নেতাগণও।

৬। তোমরা সত্য কথা বলবে, সত্য সাক্ষ্য দেবে আর ন্যায়বিচার করবে। তা যদি তোমার নিজের বিরুদ্ধে, পিতামাতা এবং আত্মীয়স্বজনদের বিরুদ্ধে হয় তবুও। হাসি, ঠাট্টা এমনকি শিশুর মনভোলানোর জন্যও মিথ্যা বলবে না। তবে সন্ধিস্থাপনের উদ্দেশ্যে কিছু ব্যতিক্রমের অনুমতি আছে।

৭। তোমরা মন্দকে প্রতিহত করবে ভাল (কথা ও ব্যবহার) দিয়ে।

৮। রাগ করো না। রাগ নেক আমল নষ্ট করে দেয়। (সুন্দর কথায় বুঝিয়ে দাও। ভাষা ও ধৈর্যের দৈন্যতা রাগ হওয়ার কারণ)

৯।  বেশি বেশি আয় করবে। মিতব্যয়ী হবে, দান করবে এবং কর্মঠ প্রার্থীকে হাওলাত দেবে।

১০। যৌথভাবে (সমবায়ভিত্তিক) ব্যবসা করবে। যৌথ ব্যবসায়ে আল্লাহর দয়া বেশি থাকে। তবে আমানতের খেয়ানত করা চলবে না।

১১। ধন, সম্পদ ও সময়ের অপচয়, অপব্যয় আর প্রয়োজনহীন আড়ম্বর ও বিলাসিতা করো না। অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।

১২। নিজেরা যা খাও যেমন পর, তোমাদের অধীনস্থদেরও তেমনি দেবে।

১৩। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো না। এ বিষয়ে পরকালে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। তবে অবৈধ ওয়াদা অবশ্যই বাতিল করবে।

১৪। শিষ্টাচার ও সালামের চর্চা রেখো। উহা তোমাদের মধ্যে ভালবাসা বৃদ্ধি করবে। (সালাম হচ্ছে দু’আ, কল্যাণ কামনা করা)

১৫। বিনা অনুমতিতে কারো দ্রব্য নেবে না, ব্যবহার করবে না এবং বাড়ি-ঘরে প্রবেশ করবে না।

১৬। আল্লাহ ছাড়া কারো এবাদত করোনা আর পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।

১৭। ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, চেনা অচেনা, দেশী বিদেশী এবং সকল মতবাদের মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করবে।

১৮। মাদকদ্রব্য, জুয়া, ব্যভিচার, অশ্লীলতা (লম্পট ও বারবণিতার সংস্কৃতি) থেকে দূরে থাকবে। উহা কেবল নিজে অপরাধ নয় বরং আরও বহু প্রকার অপরাধ সৃষ্টির সহায়ক।

ব্যাখ্যা : লম্পট অর্থ বৈধ জীবনসাথী নয় এবং অপরের স্ত্রী ও মহিলাদের যৌবন নিয়ে যারা আনন্দ উল্লাসে অভ্যস্ত। বারবণিতা সংস্কৃতি হচ্ছে-দুর্বল চরিত্রের মানুষকে আকৃষ্ট করতে বেশ্যা, তাদের দালাল ভারুয়া এবং বারবণিতার ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের তৎপরতা ও কর্মকা- বিশেষ।

১৯। তোমাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ-মনোমালিন্য হলে তোমরা সবাই মিলে অবিলম্বে আপোষ করে দেবে। সমাজের শিক্ষিত, ভদ্র ও সচেতন মানুষ, সরকার এবং সকল শ্রেণীর চাকরিজীবী এবং শাসন, বিচার ও আইন বিভাগের মানুষরা যদি আল্লাহর এ নির্দেশের প্রতি শ্রদ্ধা (ঈমান) রাখে, তাহলে সমাজে কোন প্রকার বিবাদই থাকতে পারে না। তবে জটিল বিষয়ে আদালতের ফতোয়া অর্থাৎ রায় নেয়াই উত্তম। শিক্ষিত, সৎ ও ভদ্র সমাজে বিশেষ করে মুসলমানদের জন্য তিন দিনের বেশি সময় মনোমালিন্য রাখা জায়েয নেই। নগণ্য সংখ্যক হলেও এমন সমাজ আছে যারা থানা অথবা কোর্টে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। এ নির্দেশের দৃষ্টিভঙ্গীতে জাতিসংঘকে শক্তিশালী করে তুললে আন্তঃদ্বন্দ্ব জাতিসংঘ মেটাবে। বিশ্বে কোন দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ থাকবে না।

ভেটো প্রথা বাতিল করে সংখ্যাগুরু জাতিকে একাধিক সদস্য ও ভোটের অধিকার দিলেই এর সমাধান হতে পারে। বহুসংখ্যক সদস্য এক সিদ্ধান্ত নিল কিন্তু এক দেশের ভেটোতে তা অকেজো হয়ে পড়ল এটা কি মানবতা হতে পারে? এর নাম কী গণতন্ত্র? জাতিসংঘেই যদি মানবতা ও গণতন্ত্র না থাকে তাহলে বিশ্বশান্তি কী করে আশা করা যায়?

২০। সুদ নিষিদ্ধ আর যাকাত অবশ্যই আদায় করতে হবে। এ দুটি বিষয় অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একমাত্র রক্ষাকবচ। আল্লাহর এদু’টি নির্দেশ উপেক্ষা-অমান্য করে মানবজাতি যেন কোন ভবিষ্যতেই অর্থনৈতিক স্বস্তির আশা না করে। এতদ্ব্যতীত প্রতারণার মাধ্যমে লাম্পট্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দারিদ্র্য, নিত্য নতুন অপরাধ, ঘুষ, চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাস, ব্যভিচার, ছিনতাই, রাহাজানি ইত্যাদি বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। শ্রমিকগণ লাখ টাকা বেতন পেলেও দরিদ্রতর হবে এবং আবাসিক হোটেলের নামে বিশ্বময় আধুনিক বেশ্যালয় সৃষ্টি হবে। সৎ ও বিশ্বস্ত জীবনসাথী পেতে পাশ্চাত্যের মতই সোনার হরিণ পাওয়ার মত দুষ্প্রাপ্য হবে। অর্থনৈতিক বিপদ এড়ানোর জন্য সরকার অবৈধভাবে অতিরিক্ত নোট ছাপাবেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হবে- ব্যভিচারী ধনকুবেরদের খুশি রাখতে সর্বোচ্চ প্রশাসন ও রাষ্ট্রনায়কদেরকে আবাসিক হোটেলে নারী (প্রমোদবালা) এবং মাদকদ্রব্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত রাখতে হবে এবং বিলম্বে হলেও গণবিপ্লব অথবা গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী মাও ও লেনিনবাদীদের (যা তাদের জন্মস্থানের মানুষই প্রত্যাখ্যান করেছে) নিকট ধনকুবের ও রাষ্ট্রনায়কদের লাঞ্ছিত হতে হবে।

২১। পর্দার প্রধান দু’টি কথা- যাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ, এমন যুবক ও যুবতী নির্জনে বসে আলাপচারী করবে না এবং মহিলাগণ পুরুষরা সহজে আকৃষ্ট হয় এমন সাজে বাইরে যাবে না। প্রকৃতভাবে পুরুষদের দায়িত্ব কর্তব্য ও কর্তৃত্ব একটু বেশি থাকলেও অধিকার সমান।

হাজার ভালো কাজের প্রথমটি নামায। এর বিকল্প নেই। বিশ্বপ্রভু আল্লাহ মানবজাতির শুরু থেকে লক্ষাধিক নবীর মাধ্যমে যেসব উপদেশ দিয়েছেন তার সারমর্ম ‘কুরআন’ (১০-৩৭)। অতএব বিশ্ববাসী যদি শান্তির আশা করে, কুরআনের নির্দেশ পালন ব্যতীত উপায় নেই। ব্যক্তি, পরিবার, সচেতন মানুষ, রাষ্ট্রনায়কদের পথনির্দেশ এবং এটাই দেখায় বেহেশতের পথ।

কুরআন দাবি করে এটা সকল ঐশীগ্রন্থের সারমর্ম এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা। তবুও সন্দিগ্ধ সত্যের সন্ধানীরা বাইবেল, বেদ ও কুরআনের তুলনামূলক পাঠ করে দেখতে পারেন। এ সবের সমালোচনা পড়ে ক্ষান্ত হলে প্রতারিত হবেন। আর অতিবিপ্লবী চাপাবাজদের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে হলে আটটি মতবাদের চারটি বিষয় উৎস, বিশ্বাস, করণীয় (কর্তব্য), বর্জনীয় (নিষিদ্ধ) বিষয়সমূহ তুলনামূলক অধ্যয়ন এবং কোন মতবাদ মানবজাতির শান্তিপূর্ণ সর্বোত্তম জীবন ব্যবস্থা দেখায়, চিন্তা করুন। মতবাদগুলো হচ্ছে ইহুদী, বৌদ্ধ, হিন্দু, খৃস্টান, ইসলাম, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাস্তিকতা ও সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম। সমাজে এরূপ একখানি পুস্তক খুবই প্রয়োজন, আমি মনে করি, পুস্তকখানি একশত পৃষ্ঠার কম হবে।

ইহুদী, বৌদ্ধ, হিন্দু, খৃস্টান, মোহাম্মদী ইত্যাদি ধর্মের সঠিক নাম নয়। নবী-অবতারগণ সাম্য, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব অর্থাৎ জীবন ব্যবস্থা শিখিয়েছেন, মানবিক দায়িত্ব কর্তব্য সচেতন করেছেন।

সুতরাং সকল ধর্মের নামই শান্তির পথ, মানবধর্মও বলা যায়। শান্তিপথ আরবীতে ইসলাম। আল্লাহর নির্দেশের মান্যকারী-অনুগত। আরবীতে অনুগত অর্থ মুসলিম। কিন্তু সকল মতবাদকেই শাসক ও ধর্মব্যবসায়ীরা সুবিধামত পরিবর্তন করে বিকৃত করেছে। অবশেষে আল্লাহ সকল নবীর শিক্ষার সমষ্টি পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা আল কুরআন অবতীর্ণ করেন শেষনবীর (সা.) মাধ্যমে যা থেকে কিছু কথা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বৈরাচারী মুসলিম শাসকদের কারণে মুসলমানদের মধ্যেও ধর্মব্যবসায়ের বহু মতবাদ সৃষ্টি হয়ে থাকলেও আল কুরআন বিশ্বের একমাত্র সুরক্ষিত ঐশিগ্রন্থ যা মানবজাতির দিশারী।

গবেষকগণ বলেছেন কল্কি, কলির অবতার, অন্তিম বুদ্ধ, মেসাইয়া প্যারাক্লিৎস এবং খাতমুন্নাবীয়ীন একই ব্যক্তি হযরত মুহাম্মদ (সা.)।

যিশু ত্রিত্ববাদ শেখাননি। যিশুকে হত্যাকারী সম্প্রদায়ের একজন পাদ্রী সেজে ত্রিত্ববাদের সৃষ্টি করে।

হিন্দুধর্মে বর্ণবাদ, অস্পৃশ্যতা ও মূর্তিপূজা নেই। ‘এক মেবা দ্বিতীয়ম’ বলা হয়েছে। এ বিষয়ে চুলচেরা সমালোচনা করেছেন প্রফেসর ধর্মাচার্য ড. বেদপ্রকাশ উপাধ্যায়, এম এ (সংস্কৃত বেদ) বেদসহ সকল ধর্মের গবেষক বহুভাষাবিদ, প্রয়াগ বিশ্ববিদ্যালয়, এলাহাবাদ ভারত। এ বিষয়ে তিনি তিনখানা পুস্তক লিখেছেন। নরাশংস ও অন্তিম ঋষি, বেদ পুরান কি দৃষ্টিতে ধর্মীয় একতাকি জ্যোতি এবং কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব। পুস্তকগুলো বাংলানুবাদ করেছেন ড. অসীত কুমার বন্দোপাধ্যায় ও ড. গোরী ভট্টাচার্য, প্রফেসর, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলিকাতা।

পৃথিবীময় নাস্তিকদের প্রভাব থাকলেও বাংলাদেশে এর তৎপরতা খুব বেশি। বিশেষ করে শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের স্থান খুব শক্ত। কিন্তু নাস্তিকরা জানেন না যে, তারা ইহুদী ষড়যন্ত্রের শিকার।

ঊনিশ শতকে ইহুদীরা ব্যাপকভাবে নাস্তিক সৃষ্টি করে পাশ্চাত্যে। তাদের কর্মসূচিতে আছে- ‘আমরা কোন ধর্মকে বরদাস্ত করব না। সকল ধর্ম মিটিয়ে দেব। মানবজাতিকে চরিত্রহীন আর ফটকাবাজার ও সূদী ব্যবসায়ের মাধ্যমে শোষণ করে তাদের পদানত করার কর্মসূচিও রয়েছে। সূত্র : ঞযব চৎড়ঃড়পধষং ড়ভ ঃযব খবধৎহবফ ঊষফবৎং ড়ভ তরড়হ এর বাংলানুবাদ “ইহুদী চক্রান্ত”।

পরাশক্তিদের নেতা আর ধনকুবেরগণ যদি মানবতা ও মানবিক দায়িত্ব কর্তব্য সচেতন হতেন, তাহলে পৃথিবীর দূর প্রান্তেও কোন নিরক্ষর অজ্ঞ থাকতো না। আর মুসলিম কোটিপতিগণ যদি ইসলামের দাবি সম্পর্কে বুঝতেন তা হলে তাদের দূরতম আত্মীয় এবং কারখানা ও বাড়ির আশপাশের এলাকায় কোন নিরক্ষর, অজ্ঞ ও দরিদ্র থাকতো না।

এ দুঃখজনক পরিস্থিতির  কারণ শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকদের অহংকার, অবহেলা, উদাসীনতা, তাই ব্যর্থতা। তারা এসব পদের বহু সুবিধা ভোগ করে অনেকেই প্রাচুর্যের অধিকারী হয়েছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মানবতা, মানবিক দায়িত্ব কর্তব্য ও গণতন্ত্র সচেতন করার গুরুত্ব দেননি। সুতরাং এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।

শিক্ষা বিষয়ক মহানবীর একটি হাদীস : “প্রত্যেক মুসলমানের (সকল মানুষের) জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ-অবশ্য কর্তব্য। আর অযোগ্য লোককে জ্ঞান দান করা যেমন শূকরের গলায় মণিমুক্তা, হিরা জহরতের মালা পরানো। (ভাবার্থ)

মন্তব্য : শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান-আলো। তারা হবে সৎ কর্মব্যস্ত, মানুষের কল্যাণকামী সুপরামর্শদাতা। তা না করে যে উচ্চশিক্ষিত মানুষ মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে, আত্মসাত করে, ঘুষ খায়, চুরি করে, ভেজাল দেয়, জালিয়াতি করে, সন্ত্রাস, দলাদলি, মারামারি, লাগিয়ে দেয়, লম্পট, তরুণদের আনন্দের নামে চরিত্রহীনতার দিকে ঠেলে দেয়, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় এবং যে সব দায়িত্বশীলরা ন্যায়বিচার না করে অপরাধীকে শাস্তি অথবা সুপরামর্শ না দিয়ে প্রশ্রয় দেয় এরা কী শিক্ষিত শুয়োরের পর্যায়ে পড়ে না?

বিশ্বনবী সাম্প্রদায়িকতার কবর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন কোন মুসলমান (মানবতা ও মানবজাতির শত্রু) কোন ইহুদীর প্রতি যদি অবিচার করে, হাশরের দিন আমি ইহুদীর পক্ষে দাঁড়াব। সুতরাং অত্যাচার করেও কেহ বলবে আমি মুসলমান, হাস্যকর এবং মিথ্যা কথা।

বিশ্বস্ত ধার্মিক সঠিক জ্ঞান ও কর্মে তৎপর। এ জ্ঞানের জন্য পাঁচ-দশ বছর গবেষণা করার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন কিছু সময় ব্যয় করলেই হয়। যে হিন্দু নিজ মতবাদের মূল বেদ-এর নির্দেশ জানতে সচেষ্ট নন। তিনি কি করে বিশ্বস্ত  হিন্দু হতে পারেন? তেমনি যে মুসলমান মানবজাতির জন্য প্রেরিত গ্রন্থ কুরআনের নির্দেশ জানতে আকাক্সক্ষা ও সচেষ্ট নন তিনিও কি সচেতন মুসলমান? ভালো সচেতন মানুষতো নিজ ধর্মের সাথে প্রতিবেশির ধর্মও জানতে চেষ্টা করবে, তা হলে অজ্ঞতা ও সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। ধর্ম হচ্ছে শান্তিপূর্ণ পরিবার, সমাজ তথা বিশ্ব গড়ার জীবনবিধান। জীবনের যে কোন মুহূর্তে মানবিক দায়িত্বকর্তব্যের পথ প্রদর্শক। কোন্্ কোন্্ কাজ করলে ইহকালে শান্তি ও পরকালে বেহেশত এবং কোন্্ কোন্্ কাজ এবং কর্তব্যে অবহেলা করলে ইহকালে বিশৃঙ্খলা দ্বন্দ্ব অশান্তি এবং পরকালে অনন্তকাল নরক বা জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করবে।

নাস্তিকদের স্বাধীনতা : তারা বলে আল্লাহ নেই পরকাল, পাপপূণ্য, স্বর্গ-নরক, দোজখ-বেহেশত মিথ্যা কথা। চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাস, প্রতারণা, ব্যভিচার, বিশ্বাসঘাতকতা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, মিথ্যা মামলা করা, নির্দোষ লোককে হত্যা করা, ভালো লোকদের অপবাদ দেয়া ইত্যাদি মন্দকাজ হলেও পাপ নয়। নিজেদের স্বার্থ-সুখ ভোগের জন্য করতে নিষেধ নেই। তবে ধরা পড়ো না। ধর্ম বা আল্লাহকে অস্বীকার করলে আল্লাহর নির্দেশ মাতা-কন্যার মর্যাদা অস্বীকার করা হয়। তারা মনে করে পুরুষ ও নারী অবাধ স্বেচ্ছাচারের নিষেধ নেই। কিন্তু নাস্তিকরা জানেন না যে, তারা ইহুদী ষড়যন্ত্রের শিকার যা পূর্বেই বলা হয়েছে। এসব কথা থেকে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে নাস্তিকদের চরিত্র কেমন হতে পারে।

সারা দুনিয়াই আজ ন্যায়বিচার সুশাসন ও শান্তির কাঙ্গাল। তাই সৎ নেতৃত্ব প্রয়োজন। এজন্য সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি ত্যাগ করে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ নেতা নির্বাচিত করতে হবে। নির্বাচনে প্রার্থী যে কোন মতবাদ ও দলেরই হোক সৎ ও ন্যায়পরায়ণ প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে। এটা ধর্ম ও মানবতার নির্দেশ। জেনে শুনে মন্দকে সমর্থন করলে মন্দ নেতার অপকর্মের পাপের অংশীদার হতে হবে। তারা ভয় দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা দিলে, নীরবে তা গ্রহণ করবে। কিন্তু গোপন ভোটটি দিবে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ প্রার্থীকে। জনগণের মধ্যে এমন সৎ সাহস থাকলেই সৎ নেতৃত্ব, সুশাসন ন্যায়বিচার ও বিশ্ব শান্তি আশা করা যায়।

যে কথায় সকল ধর্মই একমত

অন্যায় মন্দ ও নিষিদ্ধ কাজে অভ্যস্থ মানুষেরা দল মত নির্বিশেষে আস্তিক-নাস্তিক পৌত্তলিকসহ দূরসম্পর্কের হলেও তারা আমাদের ভাই, আদম সন্তান। অপকর্মের পরিণাম কঠোর শাস্তির কথা তাদেরকে বার বার স্মরণ করিয়ে সতর্ক করে দেয়া সকল সচেতন মানুষের কর্তব্য। সকল ধর্ম যে কথায় একমত তা হচ্ছে- সত্যগোপনকারী, সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী, শোষক, লম্পট এবং প্রতারকগণ পরকালে নরক বা জাহান্নামে শাস্তিভোগ করবে। তারা পীর, পাদ্রী, পোপ, রাব্বী (ইহুদীদের পুরোহিত) ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু, পুরোহিত যা-ই হোক না কেন, পরকালে তারা অনন্তকাল নরক বা জাহান্নামে থাকবে।

পরকালে দোজখে-নরকে আরও থাকবে অসৎ, ঘুষখোর, ডাকাত, আত্মসাতকারী, অত্যাচারী, অত্যাচারীদের সাহায্য সমর্থনকারী, ব্যভিচারী, ধর্ষক, মূর্তিপূজক, বিশ্বাসঘাতক, সূদী ব্যবসায়ী, কৃপণ ও নাস্তিক ইত্যাদি। সে বা তিনি যাই হোন না কেন, উকিল, মোহরী, পুলিশ, শিক্ষক, প্রশাসক কিংবা সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী, বিচারক, অধ্যাপক, ভিসি কিংবা জাতিসংঘের জাদরেল কর্ণধার হোন না কেন তিনি জাতীয় নেতা-নেত্রী, রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, এমপি, চেয়ারম্যান, মেম্বার, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, সাধু, মোহান্ত কিংবা কোন হুজুর। সত্য গোপন, সত্য প্রত্যাখ্যান, প্রতারণা, লাম্পট্য, অত্যাচার, বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি অপকর্মের শাস্তি পরকালে অবশ্যই ভোগ করতে হবে। কার কী মর্যাদা এবং কে কত বড় সম্মানিত, কুলীন এবং দেশ-বিদেশের বহু ভার্সিটির ডিগ্রী ও দেশী-বিদেশী বহু সনদপ্রাপ্ত সে প্রশ্ন থাকবে না। অপরাধীদের ছোট বড়, উচু-নীচু সকলকে একত্রে জন্তু-জানোয়ারের দলের মত হাঁকিয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

আল-কুরআনের সূরা আরাফের ১৭৯ আয়াতের ভাবার্থ আমি যা বুঝেছি- “বিভিন্ন মতবাদের সক্ষম, শিক্ষিত, সচেতন, জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীগণ যারা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং মিথ্যা-মন্দ ও অন্যায়ের বিপক্ষে পদক্ষেপ নিতে গড়িমসি-উপেক্ষা-অবহেলা করবেন এবং মানবিক দায়িত্ব কর্তব্য পালনে অনিচ্ছুক-নারাজ, জগতসমূহের প্রভু আল্লাহ তাদেরকে পশুর চেয়ে অধম আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন, “পরকালে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে (তারা মর্যাদায় যা-ই হোন না কেন। সুদূর পল্লীবাসী হতে জাতিসংঘের কর্ণধার পর্যন্ত এর মধ্যে যে কেউ-ই হোক।)

পক্ষান্তরে যারা তাদের কৃত অপকর্মের জন্য অনুশোচনা করে সময়মত (অবিলম্বে) ক্ষমা চাইবেন, আত্মসাৎকৃত  ধনসম্পদ  ফেরত দেবেন, মন্দকাজ ত্যাগ করে তার পুনরাবৃত্তি করা থেকে বিরত থাকবেন, মানুষকে ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করবেন, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে সততার সাথে অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করবেন, আশা করা যায়, তিনি পরকালে অনন্তকাল বেহেশতে থাকবেন। ধর্মবিজ্ঞানের নির্দেশ- তুমি যেখানে যে কাজ এবং যা চিন্তা কর, মনে রেখ সবসময়ই আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। তাই নিষিদ্ধ (হারাম) কাজ অর্থাৎ- নিজের, সমাজ ও মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর এমন কাজ করো না। আল্লাহপাক বলেছেন : “হে নবী! আপনার কাজ হচ্ছে, মানুষের কাছে আমার কথা (ভাল কাজের পুরস্কার-মন্দ কাজের শাস্তি) জানিয়ে দেয়া, কে তা মানলো আর কারা তা প্রত্যাখ্যান করলো, সে হিসেব আমি নেব।” (ভাবার্থ)

বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন : “আমার পর আর কোন নবী আসবে না। আমার একটি কথাও যে জান, অপরের কাছে পৌঁছে দাও”। তাই যোগ্যতা না থাকলেও নির্দেশ পালনের চেষ্টা করেছি। উদ্দেশ্য যোগ্য লোকদের সচেতন করা, তারা খুব সুন্দর, সহজ এবং আকর্ষণীয় যুক্তি ও ভাষায় লিখে মানবজাতিকে শান্তি ও কল্যাণের দিকে এগিয়ে নেবেন, বিশ্বভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলবেন, বিশ্ববাসী যেন  মনে করে “আমরা এক জাতি পরস্পর ভাই এবং একই পরিবারের মানুষ”।

এ পুস্তিকার বিষয়ের আলোকে শত শত উপন্যাস, নাটক ও সিনেমা তৈরি হতে পারে। যা আনন্দদায়ক হওয়ার সাথে সাথে পাঠক ও দর্শকদেরকে কল্পনাতীতভাবে কর্মব্যস্ত, জ্ঞানপিপাসু, সদাচারী ও কর্তব্যপরায়ণ করে তুলবে। তবে লেখকদের করণীয় (ফরজ) ও বর্জনীয় (হারাম) অর্থাৎ মানবজাতির জন্য কল্যাণকর ও ক্ষতির বিষয়সমূহের সঠিক ধারণা থাকতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ