শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

সরকারি অর্থের অপচয় প্রসঙ্গ

‘পুলিশের বাজেটের টাকায় যুক্তরাষ্ট্রে আনন্দভ্রমণ!’ শিরোনামে প্রথম আলোর খবরটিতে বলা হয় : পুলিশের বাজেটের টাকা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সফরে যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের এক প্রতিনিধি দল। এ ভ্রমণে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে। পুলিশের বাজেটের টাকায় এ ধরনের সফরের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র সচিব। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। সফরসূচি বহাল রাখা হয়েছে। কয়েকদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির যুক্তরাষ্ট্রে একটি অপ্রয়োজনীয় সফর নিয়েও পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল। গুরুত্বহীন কয়েক মিনিটের একটি সভায় যোগদানের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় ও দীর্ঘ সফরের কোন যৌক্তিক কারণ খুঁজে না পেয়ে পত্রিকায় মন্তব্য করা হয়েছে, হয়তো ফটোসেশনে অংশগ্রহণের সুযোগটাই আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দুঃখের বিষয় হলো, সম্পদশালী রাষ্ট্রের মন্ত্রীরা এ ধরনের বৈঠককে অগ্রাহ্য করতে সমর্থ হলেও, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তেমনটি করতে সমর্থ হলেন না। আর এবার তেমন ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সম্ভাব্য সফরকারীরা বলছেন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ যেন আরো বেশিসংখ্যক লোক পাঠাতে পারে, সে বিষয়ে আলোচনা করতেই তারা যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন। কিন্তু ভ্রমণের উদ্দেশ্য বিষয়ে নথিতে বলা হয়েছে, ‘জাতিসংঘ সদর দফতর পরিদর্শনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফর।’ এদিকে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদর দফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জাতিসংঘ থেকে এ বিষয়ে কোনো আমন্ত্রণপত্র আসেনি। নিজেরাই এ ধরনের প্রস্তাব তৈরি করেছেন। এ সফর মূলত ‘আনন্দভ্রমণ’। ভাবতে অবাক লাগে, দেশের স্বার্থরক্ষা ও অপচয় রোধে যেখানে মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সজাগ থাকার কথা, সেখানে তারাই একের পর এক অপচয়ের মাধ্যমে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র সচিব এ আনন্দভ্রমণের বিপক্ষে মতামত দিলেও, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী ঐ প্রস্তাবে সুপারিশ করেন। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর এমন ভূমিকাকে অনুমোদন দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এ বিষয়ে সরকারি আদেশও জারি হয়েছে। সফরকারী দলে যারা রয়েছেন তাদের তালিকা বিশ্লেষণ করলেও উপলব্ধি করা যায়, কিভাবে রাষ্ট্রের অর্থ ও সময়ের অপচয় করা হচ্ছে। পুলিশ দফতর সূত্রে জানা গেছে, এই সফরকারী দলে রয়েছেনÑ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ও তার একান্ত সচিব (পিএস) হারুন-অর-রশীদ বিশ্বাস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোঃ ছায়েদুল হক, পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামালউদ্দিন আহমেদ, পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুনতাসিরুল ইসলাম ও মহিউল ইসলাম। এছাড়া ব্যক্তিগত খরচে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রীও তাদের সঙ্গে যাচ্ছেন। পুলিশের দু’জন সাবেক আইজি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুলিশের বাজেট থেকে এভাবে প্রতিমন্ত্রী, আইজি ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিদেশে সফরে যেতে পারেন না। পুলিশের বাজেট থেকে প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ বা যে কোনো আয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরই যাওয়া উচিত। এছাড়া প্রতিমন্ত্রী বা তার পিএসের ভ্রমণ খরচ মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকেই হওয়া উচিত।

চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীদের ভরাডুবির পর মানুষ আশা করেছিল, সরকারের মন্ত্রী ও কর্তা ব্যক্তিরা আত্মসমালোচনায় নিমগ্ন হবেন। কারণ আত্মসমালোচনায় নিমগ্ন হলেই শাসকরা উপলব্ধি করবেন কোন কোন ভুলের কারণে জনগণ তাদের অনাস্থা জ্ঞাপন করেছে। কারণ সম্পর্কে সচেতন হলেই তো সংশোধনের প্রশ্ন আসে। কিন্তু এর বদলে যদি ক্ষমতার দম্ভ, অহমিকা এবং কূটচাল ও চাতুর্যপূর্ণ বক্তব্যের ভ্রান্ত পথকেই পছন্দ করা হয়, তাহলে তো সংশোধন বা পরিশোধনের আশা থাকে না। পুলিশের বাজেটের টাকায় যুক্তরাষ্ট্রে আনন্দভ্রমণের মতো উদাহরণ আমাদের সরকার, মন্ত্রী কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যাপারে আস্থা রাখার প্রেরণা দেয় না। তাই প্রশ্ন জাগে, আমাদের নেতা-নেত্রীদের দায়িত্বশীল হতে আরো কত সময়ের প্রয়োজন হবে? আমাদের নেতা-নেত্রীদের উজ্জ্বল উদাহরণ দেখতে জনগণকে আর কত প্রহসন ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে? তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পরও তারা যদি দায়িত্ব সচেতন না হন, তাহলে সামনে হয়তো তাদের জন্য আরো বড় পরাজয় অপেক্ষা করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ