মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

খাদ্য-পানীয় বিষাক্তকারীদের শাস্তি চাই

গত ১৬ জুন গাজীপুর এলাকার তিনটি পোশাক কারখানার ট্যাপের পানি খেয়ে অর্ধশতাধিক শ্রমিক মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর আগে ৫ জুন একই এলাকার আরেকটি পোশাক কারখানায় ট্যাপের পানি খেয়ে অনেক শ্রমিক আহত হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কারখানায় সরবরাহকৃত পানি পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হলেও এর রিপোর্ট এখনও পাওয়া যায়নি। পরীক্ষার রিপোর্ট দীর্ঘ ১০ দিন পরেও কেন পাওয়া গেল না তা তদন্ত করা উচিত বৈকি। সরবরাহকৃত পানিতে এমন কী পদার্থ থাকছে যার দূষণে পানি বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তা পান করে অসংখ্য শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। পরীক্ষার রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত পানি দূষণের রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয় বলেই আমাদের মনে হয়। তবে যেখানে শত শত শ্রমিক কাজ করে সেখানে যে পানি সরবরাহ করা হয় তা নিশ্চিতরূপে বিশুদ্ধ বা দূষণমুক্ত হওয়া দরকার। এটা নিশ্চিত করতে হবে কারখানার মালিক পক্ষকেই। তারা কেবল শ্রমিকদের ঘামঝরা পরিশ্রমে তৈরি পোশাক দিয়ে কোটি কোটি টাকা কামাই করবেন, শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বাস্থ্যবিষয়ে উদাসীন থাকবেন এমনটি বাঞ্ছনীয় নয়। বিশেষত কারখানায় সরবরাহকৃত পানি যাতে বিশুদ্ধ ও জীবাণুমুক্ত হয় সেদিকে কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে। অন্যথায় বারবার শ্রমিকরা দূষিত পানি খেয়ে অসুস্থ হবে এবং তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে; এমনটা মেনে নেয়া যায় না।

পানিদূষণ, ফলদূষণ, খাদ্যে ভেজাল, প্লাস্টিক সামগ্রীর দূষণ, ওষুধে ভেজাল প্রভৃতি কারণে আমাদের জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে যথাযথভাবে নজর দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এখন আমাদের দেশে রসালো ফল আম, কাঁঠাল প্রভৃতির সময়। ছোটবড় সকলের কাছে প্রিয় এবং আকর্ষণীয় ফল লিচুর মওসুম এখন যাই যাই করছে। একশ্রেণীর ফলব্যবসায়ী এবং আমবাগানের মালিক অধিক মুনাফার লোভে আম, লিচু, কাঁঠাল প্রভৃতিতে ফরমালিনসহ নানারকম রাসায়নিক, কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে। এমনকি ফল তাড়াতাড়ি বড় করবার জন্য বিভিন্ন রকম হরমন প্রয়োগ করে থাকে। অন্যদিকে গাছ থেকে পেড়ে দু’তিন ঘণ্টায় ফল পাকিয়ে ফেলবার জন্যও ক্যালসিয়াম কার্বাইড জাতীয় কেমিক্যাল ব্যবহার করে। আর ফরমালিন ব্যবহার করা হয় দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য। আমরা জানি, ফল পুষ্টিকর এবং মুখরোচক খাদ্য। আম, কাঁঠাল, লিচু, মাল্টা, কমলা, আপেল, কলা, আঙ্গুরসহ সব ফলই বাঙালিসহ সব মানুষের কাছে প্রিয়। এমনকি বিভিন্ন মওসুমী ফল শিশুসহ সব বয়সের মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। চিকিৎসকরাও এসব ফল সকল শ্রেণীর রোগীকে পথ্য হিসেবে গ্রহণের উপদেশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, একশ্রেণীর অসাধু ও অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীর দাপটে আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, আপেল প্রভৃতি ফল মানুষের প্রাণঘাতী বিষে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিষাক্ত ফল খেলে মানুষের কিডনি, লিভার, প্যানাক্রিয়াস, মস্তিষ্কসহ নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্তসহ নানাবিধ জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। তাই চিকিৎসকরা কেমিক্যালযুক্ত ফলগ্রহণ থেকে রোগীদের বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমে প্রায়শ দেখা যায়, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরা হাজার হাজার টন ফল বিনষ্ট করছে। কারণ সেগুলো বিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত। এগুলো মানুষ খেলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই বিষযুক্ত ফলগুলো এভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন, মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা ফলে বিষ মেশাচ্ছে কীভাবে ঢাকাশহর বা জেলা পর্যায়ের শহরে ফল আসার আগে যেখানে ফলে বিষ মেশানো হয়, সেখানে ব্যবস্থা নেয়া হয় না কেন? গাছে মুকুল বা ফুল আসবার সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে নানা রকমের কেমিক্যাল, হরমন, কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। পৃথিবীর বহু দেশে ফল সংরক্ষণে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এর প্রয়োগবিধি এবং বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি রয়েছে। আমাদের দেশে এসবের ধার ধারে না কেউ। ফলচাষী কিংবা ব্যবসায়ী কারুরই এসব পদ্ধতি যথাযথভাবে জানা নেই। নেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও। তাই লাভের আশায় যে যেভাবে পারছে করছে রাসায়নিক ব্যবহার। এতে পুষ্টিকর ও মুখরোচক ফল পরিণত হচ্ছে প্রাণঘাতী বিষে। অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে ফলের মতো অর্থকরী সম্পদ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এমনকি ফুটপাতের অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও আর্থিকভাবে ক্ষতির মধ্যে পড়ছে। তাই গোড়াতেই ফলে যেন বিষ মেশানো রোধ করা যায় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। প্রয়োজনে যারা বাগানে যথেচ্ছভাবে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে ফল বিষময় করে তোলে কিংবা আড়তে এ অপকর্ম করে, জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক। এছাড়া মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ