রবিবার ২৬ জুন ২০২২
Online Edition

চুয়াডাঙ্গা নগরীর প্রাচীন ইতিহাস

মোঃ মাহতাব উদ্দিন : আজ থেকে প্রায় ৪শ' বছর পূর্বে চুয়াডাঙ্গা শহরের গোড়া পত্তন হয়। এলাকাটি ছিল জলমগ্ন ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ। এর আশপাশ দিয়ে এলাকার প্রধান নদী মাথাভাঙ্গা ও তার শাখা-প্রশাখা বয়ে যেত। স্থানটি ছিল একটি দ্বীপ। অসংখ্য নদীনালা-খালবিল থাকায় এখানে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যেতো। ফলে এখানকার আদি অধিবাসীরা ছিল মৎস্যজীবী।

খ্রিস্টীয়  ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত এখানকার সঠিক ইতিহাস জানা সম্ভব হয়নি। একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে এখানে পাল ও সেন বংশের রাজাগণ রাজত্ব করতেন।

রাজা লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী নবদ্বীপ আক্রমণ করে নদীয়ার অধিকাংশ স্থান দখল করে নেন। বাংলাদেশের নবদ্বীপ দখল হওয়াতে অনেক ধর্মপ্রচারক এদেশে  আগমন করেন। এই সময় চুয়াডাঙ্গার আশেপাশে অনেক দরবেশের আগমন ঘটে। তারা এসে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। এদের কবর বিভিন্ন স্থানে এখনও বিদ্যমান।

পরবর্তীতে বাংলার বার ভূঁইয়াদের অন্যতম রাজা প্রতাপ আদিত্যের অধীনে আসে। এর কিছুকাল পরে তা মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। মোগলরা নদীয়া রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদারকে এই এলাকা ইজারা দেয়। ভবানন্দের উত্তর পুরুষ কৃষ্ণচন্দ্র রায় ১৭২৮ খৃস্টাব্দে নদীয়ার রাজা হন। এই সময় চুয়াডাঙ্গার অনেক স্থান রাণী ভবানীর জমিদারীর অংশ ছিল।

এদিকে মোগলদের দুর্বলতার সুযোগে সুবাদার মুর্শিদকুলী প্রায় স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করতেন। এরপর সুজা উদ্দিন ও সরফরাজ খান বাংলার সুবাদার হন। এই সময় রাজ্যে বিশৃক্মখলা দেখা দিলে আলীবর্দী খান বাংলার সিংহাসন দখল করে নেন। আলীবর্দীখার রাজত্বকালে বর্গী হামলায় অতিষ্ঠ হয়ে বহু লোক মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে চুয়াডাঙ্গার আশপাশে বসতি গড়ে তোলে। দেশে শান্তি ফিরে এলে অনেক বর্গী এখানে স্থায়ীভাবে থেকে যায়।

১৭৫৭ সালে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর প্রাণভয়ে আরো লোকজন এখানে এসে বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে শুরু করে। আস্তে আস্তে এলাকায় লোকসংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে। পরবর্তীতে স্যার জোন শোয়েব প্রস্তাবক্রমে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে কালেক্টর প্রথা প্রবর্তিত হয়। এই সময় নদীয়া জেলা সর্বপ্রথম গঠন করা হয়। তখন ১৭৮৭ সাল।

নবাব আলীবর্দী খার আমলে মুর্শিদাবাদ জেলার সীমানার ইটেবাড়ি মহারাজপুর হতে চুলো মল্লিক মাথাভাঙ্গা নদী পথে সপরিবারে চুয়াডাঙ্গা শহরের উত্তর দিকে বসতি স্থাপন করেন। তিনি এলাকার নাম চুয়াডাঙ্গা রাখেন বলে জানা যায়। তিনি বসতি স্থাপন করার পর এই শহরে আস্তে আস্তে লোকসংখ্যা বাড়তে থকে। এই সময় জলপথেই বেশি মানুষ চলাচল করতো।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ এবং ১৮৬০/৬১ সালে নীল বিদ্রোহ দেখা দেয়। এই সময় নীল বিদ্রোহ দমন তথা প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য নদীয়া জেলাকে পাঁচটি মহকুমায় ভাগ করা হয়। এগুলো হল কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা।

১৮৬১ সালে চুয়াডাঙ্গা মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হবার পর মিঃ এইচজেএস কটন-এর প্রথম মহকুমা প্রশাসক হন। প্রথম মহকুমার সদর দফতর ছিল দামুড়হুদা। পরে ১৮৬২ সালে ১৫ নবেম্বর রেলপথ চালু হবার পর সদর দফতর চুযাডাঙ্গায় স্থানান্তরিত করা হয়।

রেললাইন চালু হবার পর ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে ব্যবসা করার জন্য লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। এদের মধ্যে রাজপুতনার মাড়োয়ারী সম্প্রদায় অন্যতম। বৃটিশ আমলে ৩৮ জন, পাকিস্তান আমলে ২২ জন ও বাঙলাদেশ আমলে ১১ জন মোট ৭১ জন মহকুমা প্রশাসক এখানে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হলে নদীয়া জেলাও ভাগ হয়। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর মহকুমার ২টি থানা পূর্ব পাকিস্তানের অংশে পড়ে। কুষ্টিয়াকে জেলা করা হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা মহকুমার বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। এই সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা জেলার মর্যাদা লাভ করে। আজিজুল হক ভূঁইয়া প্রথম জেলা প্রশাসক নিযুক্ত হন। মোট ১৩ জন জেলা প্রশাসক এখানে কাজ করছেন। বর্তমান জেলা প্রশাসক সৈয়দ মাহবুব হাসান। এই সময় চুয়াডাঙ্গা মহকুমার চারটি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। থানাগুলো হলো-আলমডাঙ্গা, জীবননগর, দামুড়হুদা ও চুয়াডাঙ্গা।

এই জেলার উল্লেখযোগ্য ও প্রাচীন স্থানসমূহ হল : উজিরপুর, খোলদাড়ি, হারদি, আব্দুলবাড়িয়া, কার্পাসডাঙ্গা, জয়রামপুর, দর্শনা, দামুড়হুদা, জীবননগর, আলমডাঙ্গা, হাসাদহ, কমলাপুর, কুড়ুলগাছি, দত্তনগর, মোমিনপুর, খাসকররা, ঠাকুরপুর, বন্ডবিল, গোবিন্দপুর প্রভৃতি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ