পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়ে চলেছে। রাজ্য বিধানসভা সম্প্রতি ‘অ্যান্টিগুন্ডা বিল’ নামে একটি বিতর্কিত বিল পাস করেছে। এই বিল সবদিক থেকে মানবাধিকার হরণ করবে বলে অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের। ১৭৬ বিধায়কের সমর্থন এবং ৪১ বিধায়কের বিরোধিতায় ‘অ্যান্টিগুন্ডা বিল’ নামে পরিচিত ‘ওয়েস্টবেঙ্গল পাবলিক সেফটিঅ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাকটিভিটিজ বিল-২০২৬’ পাস হয়।

বিধান সভায় আলোচনার সময় বিজেপি’র মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রস্তাবিত আইনের পক্ষে জোর দিয়ে বলেছিলেন-এর উদ্দেশ্য কেবল মানুষকে জেলে পাঠানো নয়, রাজ্যে সংঘটিত অপরাধ এবং গণঅশান্তি দমনে সরকারের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে যে দু’টি বিল আনা হয়েছে, এটি তার একটি। অন্য বিলটি হলো, ‘ওয়েস্টবেঙ্গল মেইনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’। ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছেÑনির্মাণ সিন্ডিকেট তোলাবাজি ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এই প্রস্তাবিত বিল দু’টি ইতিমধ্যে নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিজেপি নানা কৌশলে নির্বাচনে জয়লাভ করলেও দলটি সম্পর্কে মানুষের ধারণা তেমন ইতিবাচক নয়। বিজেপি কি কি করতে পারে তা মানুষ ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গেও তার কোনো ব্যতিক্রম হবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। প্রথম বিলটি মূলত ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর পরিধি আরও বাড়িয়েছে। জননিরাপত্তার জন্য হুমিক, এমন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিচার ছাড়াই ১২ মাস পর্যন্ত আটকে রাখার ক্ষমতা প্রশানকে দিয়েছে এই বিল। এছাড়া যাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার বা আটকে রাখার আদেশ রয়েছে, তাদের আশ্রয় বা সাহায্য করাকেও এখানে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই প্রস্তাবিত আইনে ‘গুণ্ডা’ শব্দের ব্যাপক সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে অভ্যাসগত অপরাধী, সংগঠিত অপরাধী দলের সদস্য, তোলাবাজি, জমি দখল, অবৈধ খনি, প্রাকৃতিক সম্পদ পাচার এবং অস্ত্র, মাদক ও বিস্ফোরক আইনের অপরাধীরা অন্তর্ভুক্ত। প্রস্তাবিত এই আইনে পুলিশকে তল্লাশি, বাজেয়াপ্ত ও গ্রেপ্তারের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর এই আইনের আওতায় অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ‘ওয়েস্টবেঙ্গল মেইনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’-এর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের মূল আইনটি সংশোধন করে দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, সহিংস আন্দোলন এবং গণঅশান্তির সময় হওয়া ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ আদায়ের একটি বিশেষ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ক্ষতিপূরণ শুধু সহিংসতায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের থেকেই নয; বরং পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, উসকানিদাতা এবং সহায়তাকারীদের কাছ থেকেও আদায় করা যাবে। অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে ভূমি রাজস্ব আদায়ের মতো কঠোর প্রক্রিয়া বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলাম করা হতে পারে। বিলে যে কাঠিন্য ও ব্যাপকতা দেওয়া হয়েছে, তাতে উদ্বিগ্ন বিরোধী দলের নেতা-কর্মী এবং মানবাধিকার কর্মীরা। অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তির ব্যাপারে একমত হওয়ারও কথা তারা বলেছেন-সরকারি দল আইনকে বিরোধীদের দমনে কিভাবে কাজে লাগায়, তা কারো অজানা নয়। বিচার ছাড়াই কাউকে ১২ মাস পর্যন্ত আটকে রাখার যে ক্ষমতা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে, তা বিজেপি সরকার খুব খারাপভাবে ব্যবহার করবে বলে আশংকা রয়েছে। একারণেই বিল দু’টি নিয়ে নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস দলীয় সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র প্রস্তাবিত আইনগুলোকে গত কয়েক দশকের রাজ্যে দেখা সবচেয়ে কঠোর আইন হিসেবে বর্ণনা করেন। বিষয়টিকে অনেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অশনি সংকেত হিসেবে বিবেচনা করছেন।