রেমিট্যান্স প্রবাহে নানাবিধ চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়েই কেটেছে বিগত কয়েকটি অর্থ বছর। কারণ, এক্ষেত্রে কোন ধারাবাহিকতা ছিলো না। উত্থান-পতনই ছিলো রেমিট্যান্সের নিত্যসঙ্গী। তবে আর্থিক বছর শেষে এর ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। মূলত, দেশে রাজনৈতিক সংঘাত কমে আসায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে সৃষ্টি হয়েছে ইতিবাচক ধারা। সে ধারাবাহিকতায় রেকর্ড দিয়ে শেষ হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছর। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য সত্যিই ইতিবাচক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের (জুলাই-জুন) ১২ মাসে দেশে বৈধ চ্যানেলে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪ লাখ ৩৮ হাজার ১২৮ কোটি টাকার বেশি। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এত বেশি রেমিট্যান্স এর আগে কখনো আসেনি।
আগের অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৫২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থান, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে নগদ প্রণোদনা, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত অর্থ পাঠানোর সুযোগ বাড়ায় প্রবাসীরা আগের তুলনায় বেশি বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করছেন। ফলে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে।
এদিকে অর্থবছরের শেষ মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা ভাটির টান লক্ষ্য করা গিয়েছিলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জুনে দেশে এসেছে ২৮০ কোটি ৬ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে আগের বছরের জুনের তুলনায়ও রেমিট্যান্স কিছুটা কমেছে। তবে ব্যাংক হলিডের কারণে ১১টি ব্যাংকের তথ্য প্রাথমিক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে এ অঙ্ক কিছুটা বাড়তে পারে। এর আগে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের অক্টোবরে, তখন আসে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার। সংশ্লিষ্টদের মতে, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠান। ঈদ-পরবর্তী সময়ে সে চাপ কমে যাওয়ায় জুন মাসে রেমিট্যান্সেও কিছুটা স্বাভাবিক নিম্নগতি দেখা দিয়েছে। তবে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই তা ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে মাসভিত্তিক রেমিট্যান্সের চিত্রে দেখা যায়, জুলাইয়ে এসেছে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার, নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি ডলার, মার্চে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার, এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, মে মাসে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং জুনে ২৮০ কোটি ৬ লাখ ডলার।
রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে নিট ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে ৩২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। যা আমাদেরকে সত্যিই আশাবাদী করে তুলেছে।
রেমিট্যান্সই আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী আমলে একদেশদর্শী পররাষ্ট্রনীতি ও রাজনৈতিক সংকটের কারণে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছিলো। কিন্তু আগস্ট বিপ্লবের পর সে ধারার ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। সে ধারাবাহিকতায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বিদায়ী অর্থবছর। যা আমাদের অর্থনীতির জন্য সুখরই বলতে হবে। তবে এ ধারাবাহিকতা রক্ষার দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। একই বৈদেশিক শ্রমবাজারও সম্প্রসারণ জরুরি। তাহলেই রেমিট্যান্সে নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হবে। একই সাথে আমাদের অর্থনীতিও মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।