জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের গর্ব ও প্রেরণার উৎস। তিনি যে শুধু মাত্র বিদ্রোহের বার্তা দিয়েছেন তাই নয়, আমাদের জাতীয় জীবনের অনেক দিক আমাদের আবেগ ও চাওয়া পাওয়া তার লেখায় প্রস্ফুটিত। গত ১১ জ্যৈষ্ঠ পালিত হয়েছে জাতীয় কবির জন্ম বার্ষিকী। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং ২০২৪ সালে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে তার কবিতা ছিল আমাদের প্রতিদিনের প্রেরণা। তার কবিতার বাণীর সঙ্গে মিল রেখে জুলাই যোদ্ধারা স্লোগান উচ্চকিত করেছেন, তৈরি করেছেন সুন্দর সুন্দর গ্রাফিতি। ফলে তিনি আছেন আমাদের চেতনার সাথে মিশে। এই জুলাইয়ে জাতি তা স্মরণ করছে।

আশার কথা, সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কালকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর পাশাপাশি কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানা যায়।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল অতীত ইতিহাস নন, তিনি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস। তিনি আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি রাষ্ট্র এবং সমাজে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ জন্ম নেন, যারা আমাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক জীবন কিংবা আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক দর্শন ও আমাদের মনোজগতে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। কবি নজরুল তেমনই একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। কৈশোর থেকে পরিণত বয়স, আমাদের জীবনের সকল পর্যায়েই তার প্রভাব অপরিসীম।’ গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কক্ষে আয়োজিত এক সভায় (জুম প্ল্যাটফর্ম) বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, বিরহের কবি, তারুণ্যের কবি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয়, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো।’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার কবিতা ও গান যেমন ছিল অনুপ্রেরণার প্রবল উৎস, তেমনি আমাদের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তার সৃষ্টিশীলতাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মূল ভাষা।’ তিনি বলেন, ‘শুধু অতীত ইতিহাস নয়, বর্তমান প্রজন্মের জন্য, এমনকি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নজরুল আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক। এ কারণেই আমাদের জাতীয় কবির জীবন ও কর্মের সঙ্গে, গণমানুষ বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক আরো গভীর ও নিবিড় করার লক্ষ্যে নানা আয়োজনে ‘নজরুল বর্ষ’ শুরু হয়েছে।’

তিনি অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে নজরুল গবেষক ও নজরুলপ্রেমীদের প্রাধান্য দেয়ার ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের অনুষ্ঠানে যেমন নজরুল গবেষকদের উপস্থিতি মানায় না, তেমনি নজরুল বর্ষের অনুষ্ঠানেও আমলাদের চেয়ে নজরুল অনুরাগীদের অংশগ্রহণই বেশি কাম্য। এ সময় সারাদেশে নজরুল বিশেষজ্ঞ ও নজরুল প্রেমীদের নিয়ে গঠিত ‘নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি’র মাধ্যমে বছরব্যাপী সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুল সংগীতের আসর, নাট্যোৎসব এবং চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন সফল করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। সে সাথে আমরা মনে করি জাতীয় কবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে নজরুল বর্ষ পালনের যে সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেছেন তা যথার্থ। এর ফলে জাতীয় কবির অবদান আমাদের সামনে সুন্দরভাবে প্রতিভাত হবে। বিলম্বে হলেও কবি নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিগত অন্তবর্তী সরকার একটি প্রশংসনীয় কাজ করেছে। ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। আর বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাকি কাজগুলো এগিয়ে নেবে বলে আশাবাদী। আমরা নজরুল বর্ষের এই আয়োজনের সর্বাঙ্গীন সফলতা কামনা করি।