আসিফ আরসালান

জাসদ (ইনু) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের অন্ত নেই। শুধুমাত্র জুলাই বিপ্লবে অন্যতম হত্যাকারী অথবা হত্যাকাণ্ডের মদদদাতা হিসাবেই নয়, অতীতেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় খুনের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে তিনি গুরুদণ্ডের কোপ থেকে বেঁচে গেছেন। জাসদের আরেক নেতা, সিরাজুল আলম খানের অন্যতম ছায়া সঙ্গী কাজী আরেফকে হত্যার সাথেও তার নাম প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়েছিলো। তিনি জাসদের গণবাহিনীর সহকারী কমান্ডার ছিলেন। অর্থাৎ কর্ণেল তাহেরের পরেই তিনি ছিলেন গণবাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড। গণবাহিনীর প্রধান কর্ণেল তাহেরের ফাঁসি হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তি হাসানুল হক ইনু অক্ষত রয়েছেন।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ছাত্রজনতার রক্তে হাসিনার হাত রঞ্জিত হওয়ার পেছনে শুধুমাত্র হাসিনাই ছিলেন না, ছিলেন আরো অনেক আওয়ামী নেতা, জাসদ (ইনু) এবং ওয়ার্কার্স পার্টি। এমনকি, কিভাবে ছাত্রজনতার আন্দোলন দমন করা হবে, কিভাবে কারফিউ কার্যকর করা হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তিনি পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সাথে তার এ টেলিফোন সংলাপের ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখেছেন এবং শুনেছেন। সে ইনুর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডসহ ৮টি অভিযোগ থাকলেও গত ৩০ জুনের রায়ে তার মাত্র ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ভূয়া অভিযোগ তুলে একটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে আগে থেকে লেখা রায়ে তাকে প্রথমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এ রায় ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্টরা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে অপ্রতুল বলে মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে সারাদেশে তোলপাড় শুরু করে। যে আদালতে এ মামলা চলছিলো সে আদালতের বিধান মোতাবেক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে শাস্তি কমানোর জন্য সংক্ষুব্ধ পার্টির আপিল করার বিধান ছিলো। কিন্তু শাস্তি বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করবেন, এমন কোনো বিধান ছিলো না।

সুতরাং রায় ঘোষণার পরদিন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং অর্থায়নে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ নামে একটি গণঅসন্তোষের নাটক সৃষ্টি করা হয়। এ নাটকে দিন রাত ২৪ ঘণ্ডা কাদের মোল্লার মৃত্যু দাবি করা হয়।

এটি যে সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে হচ্ছে তার প্রমাণ হলো, এ গণজাগরণ মঞ্চ পরিদর্শন করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগমন্ত্রী দিপু মনি, তাজুল ইসলাম, প্রমোদ মানকিন, মাহবুব উল আলম হানিফ, মোহাম্মদ নাসিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মতিয়া চৌধুরী প্রমুখ। এছাড়াও আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী রাশেদ খান মেনন, সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, প্রাক্তন আওয়ামীমন্ত্রী এ.কে খন্দকার প্রমুখ অংশ নিয়েছিলেন। প্রকাশ্য দিবালোকে একজন রাজনৈতিক নেতার ফাঁসি দাবি করে যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয় সেটা দেখে তখন দৈনিক আমার দেশে প্রধান সংবাদ শিরোনাম দেওয়া হয়, “শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি।”

আদালতের কোনো রায় অপছন্দ বা অগ্রহণযোগ্য হলে তার বিরুদ্ধে আপিল করার বিধান আছে। কিন্তু তাই বলে প্রকাশ্যে কেউ বলতে পারে না যে, “এ রায় মানি না”। কিন্তু দৈনিক সমকাল ২০১৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বুধবার ৬ কলামব্যাপী শিরোনাম দেয়, “এ রায় মানি না”। বাংলাদেশে আজ অর্থাৎ ২০২৬ সালের ৩০ জুন কেউ কি প্রকাশ্যে বক্তৃতা করতে পারবেন অথবা সংবাদপত্রে ব্যানার হেডলাইন দিয়ে বলতে পারবেন যে , “ ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড মানি না। তার আরো গুরুদণ্ড চাই?” কিন্তু দেখছেন যে, আওয়ামী শাহবাগীরা সে গর্হিত কাজটিই করেছে।

গণজাগরণ মঞ্চে ছিলো আওয়ামী ও কমিউনিস্টদের একই আওয়াজ, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই। কিন্তু যাবজ্জীবন বদলে ফাঁসির জন্য আবেদনের বিধান তো তথাকথিত আইসিটি (ট্রাইব্যুনালে) এ্যাক্টে ছিলো না। সুতরাং আইসিটি আইন এ মর্মে সংশোধন করে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা হয় যে, রাষ্ট্রপক্ষ গুরুদণ্ড চেয়ে আপিল করতে পারবে।

সব কিছুই তো ছিলো সাজানো নাটক। সুতরাং সংশোধিত আইন মোতাবেক আওয়ামী সরকার উচ্চ আদালতে আপিল করে এবং ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ বদলে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এভাবে মব সৃষ্টি করে দেশের হাইকোর্ট ও সুপ্রীম কোর্টের ওপর নতুন আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড বা গুরুদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো আইন সংশোধন করে সেটি ভূতাপেক্ষ কার্যকর (Retrospective effect) হয় না। কিন্তু আওয়ামী আমলে এমন চরম বেআইনি আইনও পাস করা হয়।

১২ ডিসেম্বর ২০১৩ সালের দৈনিক নয়া দিগন্তে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার বড় ছেলে হাসান জামিল এ মামলায় ৪টি গুরুতর অসংগতি তুলে ধরেছেন। প্রথম অসংগতির প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার বাবা এতো বড় যুদ্ধাপরাধী এটাতো ঘাদানিক জানতো। জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ যখন জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করেছে তখন আমার বাবা কাদের মোল্লা লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ছিলেন। আমার পিতা যদি যুদ্ধাপরাধী হয়ে থাকেন তাহলে যুদ্ধাপরাধীর সাথে আওয়ামী লীগ এক টেবিলে বসলো কিভাবে? কিভাবে তারা একসাথে আন্দোলন করেছে? ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি (ঘাদানিক) তখন কোনো কথা বলেনি কেনো?

২য় অসংগতির প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার পিতা যদি যুদ্ধাপরাধী কিংবা হত্যাকারী হন তবে ২০০৭ সালে তার বিরুদ্ধে মামলার আগ পর্যন্ত কেনো মামলা বা কোনো জিডি (সাধারণ ডায়েরি) নেই কেনো?

তৃতীয় প্রশ্নে হাসান জামিল বলেন, ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কাদের মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স (আইআর) বিষয়ে স্নাতক করেছেন। তিনি যদি যুদ্ধাপরাধী হয়ে থাকেন, দেশ স্বাধীন হবার পরও দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেলেন কিভাবে ?

হাসান জামিলের ৪র্থ প্রশ্ন, তার পিতা তৎকালীন রাইফেলস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে (বর্তমান বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ) সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন, পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি উদয়ন স্কুলেও শিক্ষকতা করেছেন। এতো বড় যুদ্ধাপরাধী হলে কিভাবে তিনি এ সুযোগ পেলেন? কেন তাকে তখন বরখাস্ত করা হলো না ? আমার বাবা সাংবাদিক ইউনিয়নে পরপর দুবার নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। এত বড় যুদ্ধাপরাধীকে কেন সাংবাদিকরা ভোট দিলেন? কেন সে সময়কার সাংবাদিকরা সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেন না ?

শুধু জনাব কাদের মোল্লা নন, জামায়াতে ইসলামীর যেসব শীর্ষ নেতা মানবতা বিরোধী অপরাধের নামে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন তাদের প্রত্যেকের কেসই ছিলো বানোয়াট এবং সম্পূর্ণ সাজানো। জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জনাব কামারুজ্জামানের মামলাটিও ছিলো একটি নগ্ন প্রতিশোধের ঘটনা। ১৯৭১ সালে কামারুজ্জামানের বয়স ছিলো মাত্র ১৯ বছর। এ ১৯ বছরে তিনি কিভাবে একটি জেলার কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে পারেন, যেখানে জেলার সামরিক প্রশাসক ছিলেন একজন মেজর। তার বিরুদ্ধে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগও দেওয়া হয়েছিলো। এটি যে কত বড়ো মিথ্যা সেটি বলেছেন নিউইয়র্ক প্রবাসী মিনা ফারাহ।

২০০৫ সালে আজকের কলাম লেখক যখন নিউইয়র্ক ছিলেন তখন তার সাথে মিনা ফারাহ’র দেখা হয়। মিনা ফারাহ জন্ম গ্রহণ করেন শেরপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে। পরবর্তীতে তার স্বামী মুসলমান হওয়ায় মিনা রানী সাহা তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন মিনা ফারাহ। তখন তিনি ভয়ানক আওয়ামীপন্থী ছিলেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তার রাজনৈতিক চিন্তা ধারার পরিবর্তন ঘটে।

২০০৯ সালে এ কলামিস্ট যখন পুনরায় নিউইয়র্ক যান তখন মিনা ফারাহ কথা প্রসঙ্গে তাকে জানান যে, হাসিনা সরকার কামারুজ্জামানকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে কাঠগড়ায় তুলছে। কিন্তু আমি আপনাকে বলছি, কামারুজ্জামান সাহেব পাক বাহিনীর সাথে কোনোরকম কোলাবরেশন করেননি।

২০১২ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে যখন কামারুজ্জামান সাহেবের বিচার শুরু হয় তখন মিনা ফারাহ নিউইয়র্ক থেকে আমাকে ফোন করেন। তিনি বলেন, কামারুজ্জামান সাহেব যে নির্দোষ সেব্যাপারে তিনি সাক্ষী দিতে চান। এর কিছুদিন পর লন্ডন থেকে তিনি আমাকে আবার ফোন করেন। বলেন যে, লন্ডন থেকে ঢাকা যাওয়ার ভিসা বা অনুমতি দিচ্ছে না সেখানকার দূতাবাস। আমি বলি, যদি আপনি না আসতে পারেন তাহলে আপনার বক্তব্যকে আইনি দলিলে রূপান্তরিত করে সেটি ঢাকা পাঠান। তিনি তাই করেছিলেন। কিন্তু আইসিটি তো বিচারিক ট্রাইব্যুনাল ছিলো না, ছিলো আওয়ামী রাজনৈতিক ট্রাইব্যুনাল। তারা মিনা ফারাহ’র লিখিত স্বাক্ষ্যকে আমলে নেয়নি।

মানুষ সুখরঞ্জন বালীর কথা এখনো ভুলে যায়নি। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য সাক্ষী দিতে এসে তিনি গোয়েন্দাদের হাতে গায়েব হয়ে যান। অতঃপর ড. কামাল হোসেনের জামাতা সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তাকে কলকাতার এক জেলে আবিষ্কার করেন।

এভাবেই জামায়াত নেতৃবৃন্দ এবং সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বিচারের নামে হত্যা করা হয়েছে। বিচারের নামে আওয়ামী লীগের প্রহসন ও সাজানো নাটকের কথা বিস্তারিত বলতে গেলে একটি মহাকাব্য রচনা করা যেতে পারে। জামায়াত নেতা এটিএম আযহারুল ইসলামের বেকসুর খালাস প্রমাণ করে যে, যদি সেই সময় জুলাই বিপ্লব পরবর্তী পরিবেশ থাকতো তাহলে জামায়াত নেতৃবৃন্দ ও বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হতো না।

জনগণের প্রশ্ন, হাসানুল হক ইনুর এ লঘু দণ্ডের বিরুদ্ধে গুরুদণ্ড দেওয়ার জন্য কি রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করবে না? এব্যাপারে সরকার পক্ষে এখনো কিছু বলা হয়নি। তবে যেভাবে শহীদ হাদির হত্যা মামলা কোল্ডস্টোরেজে চলে যাচ্ছে, যেভাবে ক্রসফায়ার ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শামুকের গতিতে চলছে, যেভাবে ১৫ জন সাবেক ও কর্মরত সেনা অফিসারের বিচার গদাই লস্করি তালে চলছে, সেগুলো দেখে মনে পড়ে সে বহু পুরাতন প্রবাদ বাক্য। সেটি হলো, ঘর পোড়া গরু সিঁদরে মেঘ দেখলে ভয় পায়।

মেজর জেনারেল (অব) ফজলুর রহমান অনেক খেটেখুটে বিডিআর ম্যাসাকারের তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করেছেন। সেটিরই বা কী হলো? শাপলা ম্যাসাকারের তদন্তের তো কোনো উদ্যোগই নেই। আর অন্যদিকে জুলাই বিপ্লবকে খাটো করার পাঁয়তারাও আর গোপন নয়। ২ জুলাই বিএনপি এমপি নিলোফার চৌধুরী মনির বক্তব্য দেখুন। অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

Email:[email protected]