গাজী নজরুল ইসলাম
ইদানীং একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা জনসম্মুখে বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন- মানুষ দিন দিন ধর্মান্ধতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যিনি এ বক্তব্যটি দিয়েছেন, তিনি কেবল একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাই নন, বরং কথাবার্তায় তাকে একজন আধুনিক, উচ্চশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত পরিবারের সন্তান বলেই মনে হয়। কিন্তু “ধর্মান্ধ” শব্দটি সম্পর্কে তার কতটুকু গভীর জ্ঞান আছে, তা আমার জানা নেই। তিনি যদি শব্দটির প্রকৃত অর্থ ও গভীরতা অনুধাবন করতে পারতেন, তবে বোধহয় লক্ষ লক্ষ জনগণকে ঢালাওভাবে এমন কথা বলতে গিয়ে কিছুটা সংযম বা সম্ভ্রমবোধ প্রকাশ করতেন।
আসুন প্রথমে দেখা যাক “ধর্মান্ধতা” সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কী বলেছে। মহান আল্লাহ পাক এরশাদ করেন: “আর যখন তাদের বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তোমরা তার অনুসরণ করো’, তখন তারা বলে, ‘না, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যেভাবে পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব।’ যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই বুঝতে পারেনি এবং তারা সৎপথেও পরিচালিত ছিলনা।” -(সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭০)
আল-কুরআনে এ আয়াতের পাশাপাশি আরও অনেক আয়াত এসেছে, যেখানে পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণের তীব্র নিন্দা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এ নিন্দা সব ঐতিহ্য বা রীতিনীতির জন্য নয়; বরং কেবল সে ঐতিহ্যের জন্য-যা চিরন্তন সত্যের পরিপন্থী। মূলত কুরআন অন্ধ ও যুক্তিহীন অনুকরণের নিন্দা করেছে, বিশেষ করে যখন বিষয়টি আকিদা (বিশ্বাস) ও তাওহিদের (একত্ববাদ) সাথে সম্পর্কিত হয়।
সূরা আল-বাকারার ১৭০ নম্বর আয়াতটি মূলত তৎকালীন আরবের মুশরিক ও কুরাইশ কাফেরদের প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছিল। তারা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতো এবং কোনো প্রকার অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই মহান আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে কথা বলতো। এমনকি তাদের যখন আল-কুরআনের আলো ও সত্য পথ অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হতো, তখন তারা তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করত। তারা সাফ জানিয়ে দিত-”না, আমরা কেবল তা-ই অনুসরণ করবো, যার ওপর আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি।” তারা তাদের বাপ-দাদা এবং তৎকালীন গোত্রপ্রধানদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে মূর্তি পূজা ও অন্যান্য প্রাচীন কুসংস্কারের ওপর অটল ছিল। (তানতাবি, আত-তাফসিরুল ওয়াসাত, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২১৩)
এ অন্ধ অনুকরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়; কারণ সব অনুকরণ কখনো ভালো হতে পারে না। আকিদা ও তাওহিদের বিষয়ে সঠিক জ্ঞান এবং বোধশক্তির অভাবে জাহেল (মূর্খ) পূর্বপুরুষদের পথ অনুসরণ করা মূলত সমাজ ও জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। পবিত্র কুরআনে তাই অন্ধ অনুকরণকারী, অহংকারী, একগুঁয়ে ও অসৎ মানসিকতার প্রতি কঠোর নিন্দা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, অন্ধ অনুকরণ মানবতাকে বিনাশের দিকে নিয়ে যায়-বিশেষ করে যখন পূর্বপুরুষেরা নিজেরাই চরম ভ্রান্তি ও কুফরির মধ্যে নিমজ্জিত থাকে।
মহান আল্লাহ পাক এ অন্ধ অনুকরণকারীদের করুণ অবস্থা বর্ণনা করে এর পরের আয়াতেই এরশাদ করেছেন: “আর যারা কাফের হয়েছে তাদের উপমা সে ব্যক্তির মতো, যে এমন কিছুকে ডাকছে যা কেবল হাঁকডাক আর চিৎকার ছাড়া আর কিছুই শোনে না। তারা বধির, বোবা ও অন্ধ; তাই তারা কিছুই বোঝে না।” -(সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭১)
উপরের সামগ্রিক আলোচনা থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, যারা সত্যকে অবজ্ঞা করে এমন অন্ধ আনুগত্যে লিপ্ত, তারাই মূলত প্রকৃত ‘ধর্মান্ধ’। ফলে “ধর্মান্ধ” শব্দটি আসলে কাদের প্রতি প্রয়োগ করা উচিত, তা মহান আল্লাহর এ শাশ্বত বাণীর আলোকেই পরিষ্কার হয়ে যায়।
এবার দেখা যাক, ‘ধর্মান্ধতা’ সম্পর্কে উইকিপিডিয়া কী বলে। ধর্মীয় অন্ধত্ব বা ধর্মান্ধতাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘Religious Blindness’। এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
“Religious or spiritual blindness typically refers to the inability to recognize divine truth, misinterpreting religious doctrine, or allowing rigid dogma to override reality and empathy”
অর্থাৎ, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব বলতে সাধারণত ঐশ্বরিক সত্যকে উপলব্ধি করতে না পারা, ধর্মীয় মতবাদের ভুল ব্যাখ্যা করা অথবা বাস্তবতা ও সহানুভূতির ঊর্ধ্বে কঠোর গোঁড়ামিকে স্থান দেওয়াকে বোঝায়।
পূর্বের পর্যালোচনার সাথে উইকিপিডিয়ার এ সংজ্ঞার গভীর মিল রয়েছে। ধর্মান্ধতা হলো মূলত জাহেলি যুগের কুসংস্কার, গোঁড়ামি এবং পূর্বপুরুষ কিংবা নেতাদের অন্ধ অনুকরণ করা। পবিত্র কুরআনও বলছে, এরাই প্রকৃত ধর্মান্ধ। এরাই ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দেয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা ধারণ করে চলে।
এখন প্রশ্ন হলো, ওই অঞ্চলের মানুষ কি আসলেই জাহেলি যুগের ধর্মান্ধতায় আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ কোনো গোষ্ঠী, যাদের উদ্দেশ্যে এমন ঢালাও মন্তব্য করা যায়? নাকি তারা জাহেলি যুগের ধর্মীয় অন্ধত্ব ও গোঁড়ামিকে পরিহার করে মহান আল্লাহর শাশ্বত চিরন্তন বাণীকে মনে-প্রাণে ধারণ করেছে? তারা তো তাদের যাপিত জীবনকে মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর যোগ্য অনুসারীদের জীবনালোকের আদলে পরিচালনা করতে চায়। এই সত্য ও আলোর পথে চলার চেষ্টার কারণেই কি তারা ওই মন্তব্যকারীর কাছে ‘ধর্মান্ধ’ হিসেবে গণ্য হলেন? এখন আসা যাক, ‘সংস্কৃতি’ বা ‘কালচার’ বলতে আমরা কী বুঝি? সংস্কৃতির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
“Culture encompasses the shared behaviors, beliefs, values, customs, and practices of a group. It serves as an invisible thread providing identity, religion, art, and social norms; it is continuously learned, adapted, and passed down through generations.”
অর্থাৎ, সংস্কৃতি হলো একটি নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর অংশীদারিত্বমূলক আচরণ, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, প্রথা এবং অভ্যাসের সমষ্টি। এটি একটি অদৃশ্য সুতোর মতো কাজ করে, যা মানুষের পরিচয়, ধর্ম, শিল্পকলা এবং সামাজিক রীতিনীতিকে ধারণ করে। সংস্কৃতি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা মানুষ ক্রমাগত শেখে, নিজের জীবনে গ্রহণ করে এবং তা বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বাহিত হতে থাকে।
সংস্কৃতির উক্ত ব্যাখ্যার আলোকে বলা যেতে পারে, আমাদের সংস্কৃতি কেবল ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ নয়, বরং এটি একটি ‘মুসলিম বাঙালি সংস্কৃতি’। পৃথিবীতে প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর নিজস্ব ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে। আমার চিন্তায়, এই মানবগোষ্ঠীর মধ্যে প্রধানত দুটি ধারা বিরাজমানÑএকটি হলো ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠী এবং অন্যটি গোত্রীয় জাতিগোষ্ঠী। যেমন: মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠী। অনুরূপভাবে বাঙালি, ইংরেজ, আরব এবং অন্যান্য গোত্রীয় জাতিগোষ্ঠী।
এখানে বাঙালি গোত্রীয় বা জাতিগত পরিচয়টি প্রধানত দুটি বড় ধারায় বিভক্তÑএকটি মুসলিম বাঙালি এবং অন্যটি হিন্দু বাঙালি। হিন্দু বাঙালিরা তাদের বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা-অর্চনার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক তৃপ্তি লাভের চেষ্টা করে। তাদের যাপিত জীবনের সংস্কৃতিতে পোশাকের ক্ষেত্রে পুরুষদের ধুতি-পাঞ্জাবি এবং নারীদের শাড়ি পরার রেওয়াজ রয়েছে। বিবাহিত নারীদের হাতে শাঁখা এবং কপালে সিঁদুর পরার চল রয়েছে। এছাড়া এ গোষ্ঠীর নারীদের মধ্যে পর্দার মুসলিম শাস্ত্রীয় বিধান বা বাধ্যবাধকতা নেই; ফলে তারা সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী চুল খোলা রাখা বা অন্যান্য স্বাভাবিক পোশাকে যাপিত জীবনের সব ক্ষেত্রে চলাফেরা করতে পছন্দ করেন এবং এটিকে তাদের সংস্কৃতির অংশ মনে করেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে তারা মূর্তিপূজা করেন, নিজেদের তৈরি মাটির বা পাথরের দেব-দেবীর চরণে অর্ঘ্য ও নৈবেদ্য নিবেদন করেন। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস একাধিক ধর্মগ্রন্থ, যেমনÑবেদ ও গীতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
অপরপক্ষে, মুসলিম বাঙালিরা একমাত্র লা-শরিক আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী। তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শেষ নবী হিসেবে মান্য করে এবং তাঁরই আদর্শ অনুসরণ করে চলে। তারা একমাত্র নিরাকার আল্লাহর দরবারে সিজদা করে এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায়ে ব্রতী থাকে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনকে তারা জীবনের একমাত্র শাশ্বত বিধান হিসেবে বিশ্বাস করে।
পোশাক ও যাপিত জীবনের সংস্কৃতিতে মুসলিম বাঙালি পুরুষদের মাঝে সাধারণত লুঙ্গি, পায়জামা, পাঞ্জাবি, টুপি, পিরহান, জুব্বা, কাঁধে রুমাল ও হাতে তসবীহ রাখার রেওয়াজ দেখা যায়। অন্যদিকে মুসলিম নারীদের পোশাকের সংস্কৃতিতে রয়েছে শাড়ি, ওড়না, বোরকা, হিজাব বা হাত-মুখ ও চুল ঢেকে রাখার পর্দা প্রথা। তাদের সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো-তারা হাতে কখনো সনাতন ধর্মীয় শাঁখা পরেন না এবং কপালে কখনো সিঁদুর দেন না। এটিই তাদের সংস্কৃতির স্বতন্ত্র পরিচয়।
অনুরূপভাবে, বিশ্বের অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষের মাঝেও এই ধর্মীয় সংস্কৃতির পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়। যেমনÑহিন্দি ভাষাভাষী হিন্দু জনগোষ্ঠী তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও পোশাকে সনাতন ভাবধারা বজায় রাখে। আবার একই অঞ্চলের হিন্দি বা অন্য ভাষাভাষী মুসলিমদের আচার-আচরণ ও পোশাকে সুস্পষ্টভাবে ইসলামী ভাবধারা প্রকাশ পায়। ঠিক একইভাবে, ইংরেজ খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় রীতিনীতি ও পোশাকের সংস্কৃতি যেমন একরকম, তেমনি ইংরেজ বংশোদ্ভূত মুসলিমদের জীবনযাত্রায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব বিশ্বব্যাপী দৃশ্যমান। তদ্রূপ, আরবি ভাষাভাষী মুসলিম নর-নারীদের ধর্মীয় রীতিনীতি ও মূল সংস্কৃতি এক হলেও, ভৌগোলিক কারণে পোশাকের সংস্কৃতিতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়; তবে তা কোনোক্রমেই ইসলামী সংস্কৃতির শালীনতার বাইরে নয়।
পৃথিবীর অন্যান্য ভাষাভাষী অমুসলিমদের ধর্মীয় চর্চা ও পোশাকের সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। অন্যদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর নর-নারীদের পোশাকে ভৌগোলিক কারণে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
লেখক: জাতীয় সংসদ সদস্য।