মানুষ বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য গ্রহণ করে, রোগাক্রান্ত হওয়ার জন্য নয়। একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য নির্ভেজাল ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা পাওয়া প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সবার ভাগ্যে এই নির্ভেজাল খাবার জোটে না। খাদ্যে ভেজালের প্রভাবে বিশুদ্ধ খাবার খুঁজে পাওয়া আজ দায় হয়ে পড়েছে। অথচ এ বিষয়ে আমাদের সোচ্চার ভূমিকা অনুপস্থিত। ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, তীব্র যানজট, হরহামেশাই সড়ক ও রেল দুর্ঘটনা কিংবা সর্বগ্রাসী দুর্নীতি নিয়ে আমরা যতটা সোচ্চার তার সামান্যতম অংশও যদি খাদ্যে ভেজাল ও অনিরাপদ খাবারের বিরুদ্ধে হতাম, তাহলে খাদ্যের নামে আমাদের বিষ খেতে হতো না। ফুড পয়জনিং বা খাদ্যবাহিত রোগে মানুষের জীবন বিপন্ন হতো না। সম্প্রতি তরুণ কন্টেট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসকদের মতে তাঁর এই মৃত্যুর পেছনে মূল দায়ী ছিল অনিরাপদ খাদ্য ও দূষিত পানি। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও স্ট্রিট ফুডে ব্যবহৃত নোংরা পানি, মলমূত্রের জীবাণুর উপস্থিতি, পচা-বাসি উপকরণ এবং চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরির কারণেই এ ধরনের প্রাণঘাতী ভাইরাস মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। অথচ আমাদের চোখের সামনে প্রতিদিন ঘটেচলা এসব জীবনবিনাশী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান বা কার্যকর কোন পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান চালানো হলেও কিছুদিন পর আবার সে আগের দৃশ্যই ফিরে আসে- ইঁদুর বিড়াল খেলার কাণ্ডের মত।
খাদ্য ছাড়া মানুষের জীবন বাঁচে না, এটি সর্বজনীন সত্য। কিন্তু পচা, বাসি, ভেজাল কিংবা বিষাক্ত খাবার মানুষ তো দূরের কথা, কোনো হিংস্র পশুর জন্যও নিরাপদ নয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতের খাবার-সবকিছুতেই আজ ভেজালের দাপট। কাঁচাবাজার, পাড়ার দোকান কিংবা ঝকঝকে সুপারশপ কোথাও নিরাপদ খাবারের সন্ধান পাওয়া যায় না। আবার অতিরিক্ত অর্থ খরচ করলেই যে, বিশুদ্ধ খাবার মিলবে, তার নিশ্চয়তাও শূন্যের কোঠায়। আমরা সবাই জেনে-বুঝেই একপ্রকার বিষ খাচ্ছি। এর অন্যতম কারণ- আমরা নীতিনৈতিকতার তোয়াক্কা করছি না, ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন লালন করছি না। ফলে সামান্য দুনিয়াবি লোভে নীতিহীন কাজ করতেও কুন্ঠাবোধ করছি না। অপরাধ জেনেও মানুষের জীবনবিনাশী কেমিক্যাল মিশিয়ে আর্থিক লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছি। ফলে ভেজাল আমাদের পিছু ছাড়ছে না। মাছ ব্যবসায়ী মাছে কেমিক্যাল দিচ্ছেন, সবজি বিক্রেতা সবজিতে ক্ষতিকর রঙ ও রাসায়নিক মেশাচ্ছেন, ফল বিক্রেতা কেমিক্যাল দিয়ে ফল পাকাচ্ছেন, আর চাল বিক্রেতা কিংবা রাইস মিল মালিক চালকে আকর্ষণীয় ও ধবধবে সাদা করতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করছেন। ডাল-চালের ভেজাল মেনে নিয়েই আমরা বিষাক্ত খাবার খেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু যখন দেখা যায় প্রাণরক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল, তখন হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী উৎপাদনের খরচ কমাতে ওষুধের মূল উপাদানের জায়গায় সস্তা ও নিম্নমানের রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এমনকি তরল ওষুধ বা সিরাপে ভালো দ্রাবকের বদলে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কোনটা আসল আর কোনটা নকল ওষুধ তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক গবেষণায় একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে- দেশের সামগ্রিক খাদ্যের অন্তত ৩৩.৩ শতাংশই অনিরাপদ ও ভেজালযুক্ত। সারাদেশে মানহীন, অবৈধ ও নকল পণ্যের সয়লাব হলেও বিএসটিআই (BSTI) এর কার্যকর তদারকির অভাবে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে পকেট ভারী করছে। এমনকি বিএসটিআই এর লোগো ব্যবহার করেই নিম্নমানের পণ্য বাজারে ছাড়া হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় গঠিত কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভূমিকাও সন্তোষজনক নয়। কেবল রমযান মাস এলেই পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে তাদের কিছু বিবৃতি বা তৎপরতা চোখে পড়ে, বছরের বাকি ১১ মাস তারা প্রায় নিষ্ক্রিয়। অথচ ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ক্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কেবল মৌসুমি উদ্যোগ নয়, বছরজুড়ে ধারাবাহিক ও কঠোর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। আজ প্রশ্ন উঠেছে- খাবারে বিষ নেই কোনটিতে? মাছ, দুধ বা শাকসবজির মতো দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর একটি বড় অংশতেই মিলছে মারাত্মক মাত্রায় দূষণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার আর নোংরা পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুতের ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। কলা ও আনারাস দ্রুত পাকাতে মারাত্মক ক্ষতিকর ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা হচ্ছে। শাকসবজি ও মাছে পচন রোধে মেশানো হচ্ছে ক্যানসার সৃষ্টিকারী ফরমালিন। মুড়ি ও জিলাপি সাদা ও মচমচে করতে হাইড্রোজ, চানাচুর ভাজতে পোড়া মবিল এবং গুঁড়ো মশলায় কাপড়ের রঙ, কাঠের গুঁড়ো ও ইটের বালু মেশানোর মতো ভয়াবহ ঘটনা অহরহ ঘটছে। বেকারি পণ্য, জুস, ডাল ও ডালডায় কারখানার ক্ষতিকর রঙ মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে। এমনকি শিশুদের দুধে পাওয়া যাচ্ছে ইউরিয়া, ডিটারজেন্ট ও কৃত্রিম ফ্লেভার, আর কনডেন্সড মিল্কে মিলছে নিম্নমানের পাম অয়েল। ভেজাল সরিষার তেল আর বিষাক্ত রঙ মেশানো হচ্ছে ঘিতে। একদিকে অস্বাস্থ্যকর ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে তৈরি হচ্ছে রুটি, বিস্কুট ও সেমাই। অন্যদিকে হোটেল রেস্তোরাঁগুলোতে মেয়াদহীন বা বাসি খাবার এবং মরা মুরগির গোশত খাওয়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। অভিযানের সময় এসব উপাদানসহ অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রায়ই হাতেনাতে ধরা পড়লেও ভেজাল থামছে না।
রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা ও থানা শহরের রাস্তার পাশে, শপিংমহলের সামনে কিংবা স্কুল-কলেজের গেটে ফুচকা, চটপটি, ভেলপুরি, ভাঁজাপোড়া, চা ও নাস্তা দেদারসে পরিবেশন করা হচ্ছে। এসব খাবার কতটুকু মানসম্মত, তার কোন খেয়ালই নেই তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে যেকোন বয়সি মানুষের। কিন্তু এসব ফাস্টফুডের অধিকাংশই বিষাক্ত কেমিক্যাল, রঙ, অস্বাস্থ্যকর তেল, ডালডা, দূষিত পানি দিয়ে তৈরি। এসব খাদ্য গ্রহণের ফলে ফ্যাটি লিভার, উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের ভয়াবহ রোগ বাড়ছে। স্লো-পয়জনিং এর মতো এসব বিষাক্ত উপাদান মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সকাল থেকে শুরু করে রাত ১২ টা পর্যন্ত এসব খাবারের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। কিন্তু কেউ একবারও ভেবে দেখে না- আমরা খাদ্যের নামে কী খাচ্ছি? এসব অনিরাপদ খাবারের ফলে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি বিকল, হৃদরোগ ও লিভার সিরোসিসের মতো ভয়াবহ রোগ শরীরে বাসা বাঁধছে। ভেজাল খাবার শুধু বড়দের নয়, শিশুদেরও জীবন কেড়ে নিচ্ছে, অনেক শিশু জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। এটি আমাদের জন্য এক চরম অশনিসংকেত।
খাদ্যে ভেজাল মেশানো কেবল আইনি অপরাধ নয়; এটি মানবজাতির বিরুদ্ধে এক নীরব গণহত্যা। এই বিষাক্ত থাবা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে কঠোর আইনের প্রয়োগ, ভ্রাম্যামাণ আদালতের নিয়মিত অভিযান এবং সমাজজুড়ে গণসচেতনতা বাড়ানো দরকার। দেশের আইন অনুযায়ী খাদ্যে ভেজাল দেয়ার অপরাধে জরিমানা ও কারাদণ্ড থেকে শুরু করে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তাই ভোক্তা হিসেবে বাজারে কোনো অনিয়ম বা ভেজাল খাদ্য চোখে পড়লে সাথে সাথে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের হটলাইনে ১৬১১৫ এ কিংবা তাদের অফিশিয়াল পোর্টালে অভিযোগ জানানো আমাদের নাগরিক নৈতিক দায়িত্ব। বিশ্বের বেশ কিছু দেশ ইতোমধ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও কঠোর নজরদারির জোরে ভেজালের এই দৌরাত্ম্য রুখে দিয়েছে। যেমন: আমদানিনির্ভর সিঙ্গাপুর তাদের ‘ সিঙ্গাপুর ফুড এজেন্সি (SFA-এর মাধ্যমে প্রতিটি খাদ্যের কঠোর ল্যাব টেস্ট নিশ্চিত করে জিরো টলারেন্স নীতিতে হাঁটছে। জাপান কিউআর (QR)) কোড প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপারমার্কেটের প্রতিটি শাকসবজি, মাছ বা গোশতের মূল খামার, ব্যবহৃত সার ও কীটনাশকের তথ্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যা ভোক্তা স্ক্যান করেই দেখতে পান। ডেনমার্ক ও সুইডেন বিশেষ নেটওয়ার্কের সাহায্যে অনিরাপদ খাদ্য চিহ্নিত হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে বাজার থেকে সরিয়ে ফেলে এবং নিউজিল্যান্ড পশুখাদ্য ও খামার পর্যায় থেকেই ডিজিটাল সেন্সরে মান নিয়ন্ত্রণ করছি। অথচ আমাদের দেশে এখনো পশুখাদ্য ও মাছের খাবারে অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে বিষাক্ত জিঙ্ক, সিসা কিংবা ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকারক রাসায়নিক- যা ঘুরেফিরে মানুষের পাতেই আসছে। আমরা যদি ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। কারণ অসুস্থ জনগোষ্ঠী নিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায় না। তাই অনিরাপদ খাদ্যের কারণে প্রতিবছর জিডিপির বিপুল আর্থিক ক্ষতি এবং অগণিত মানুষের জীবনহানি বন্ধ করতে এখনই জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়া অপরিহার্য।
লেখক : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক।