আয়েশা সিদ্দিকা

শিক্ষা মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশের অন্যতম অনুষঙ্গ। মূলত, শিক্ষা হলো মানুষের জ্ঞানলাভের একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তির সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলনের নাম। শিক্ষা প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয়া হয় এবং তাকে সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য যে সব দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলি অর্জনে সহায়তা করা হয়। সাধারণ অর্থে দক্ষতা বা জ্ঞান অর্জনই হল শিক্ষা।

বস্তুত, সুশিক্ষা হলো কেবল পুঁথিগত বিদ্যা বা ডিগ্রি অর্জন নয়; বরং এটি এমন এক আলো যা মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে জাগ্রত ও আলোকিত করে। এটি মানুষকে শুধু শিক্ষিত নয়, বরং একজন আদর্শ, মানবিক ও সহানুভূতিশীল ‘প্রকৃত মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলে এবং সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। সুশিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, সর্বোপরি ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারা এবং ন্যায়ের পথে চলা। অন্যের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ রক্ষা করা। অন্ধবিশ্বাসের বদলে যুক্তিবোধ ও সঠিক চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটানো। সুশিক্ষা ছাড়া কেবল শিক্ষিত সমাজ ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে, তাই প্রকৃত অর্থে ‘সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’। তাই জাতিকে শিক্ষিত নয় বরং সুশিক্ষিত হিসাবে গড়ে তোলার সময়ের বড় দাবি।

নৈতিক শিক্ষা মানুষের চরিত্র, মানবিকতা ও মূল্যবোধ গঠনের মূল ভিত্তি। এটি কেবল ভালো-মন্দের পার্থক্যই শেখায় না বরং সততা, সহানুভূতি ও ন্যায়পরায়ণতার মতো গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে। আদর্শ জাতি গঠনে এবং ব্যক্তিজীবনে সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে এর কোনো বিকল্প নেই। বস্তুত, নৈতিক শিক্ষা মানুষকে লোভ, হিংসা ও অসদুপায় থেকে বিরত রাখে এবং সততার পথে চলতে শেখায়। এটি মানুষের মধ্যে সহানুভূতি, পরোপকার ও সহমর্মিতার বীজ বপন করে, যা একটি সুন্দর ও শান্তিময় সমাজ গঠনে সহায়ক। প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি সচেতন করে তোলে। দুর্নীতি, অপরাধ ও অন্যায় প্রতিরোধে নৈতিক শিক্ষা একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করে। একথা কারো অজানা নয় যে, নৈতিক শিক্ষা ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলির অন্তর্গত। ইসলামি মূল্যবোধে আদি শিক্ষক হলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। তাই ফেরেশতারা বলেছিলেন: ‘হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র! আপনি যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনোই জ্ঞান নেই; নিশ্চয় আপনি মহাজ্ঞানী ও কৌশলী।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩২)।

বিশ্বনবী (সা.)-এর প্রতি ওহির প্রথম নির্দেশ ছিল: ‘পড়ো তোমার প্রভূর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানব ‘আলাক’ হতে। পড়ো, তোমার রব মহা সম্মানিত, যিনি শিক্ষাদান করেছেন লেখনীর মাধ্যমে। শিখিয়েছেন মানুষকে যা তারা জানত না।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১-৫)। ‘দয়াময় রহমান (আল্লাহ)! কোরআন শেখাবেন বলে মানব সৃষ্টি করলেন; তাকে বর্ণ শেখালেন।’ (সুরা রহমান, আয়াত ১-৪)।

আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধনই শিক্ষার উদ্দেশ্য। নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে যেসব বিষয় সরাসরি সম্পর্কিত সেগুলো হলো সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ইত্যাদি। আচরণে অভীষ্ট ইতিবাচক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধনের জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তথ্য প্রদান বা জ্ঞান দান করাকে শিক্ষা বলে। চতুর্থ খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর এক প্রশ্নের জবাবে হজরত উবায় ইবনে কাআব (রা.) বলেন, ‘ইলম হলো তিনটি বিষয় আয়াতে মুহকামাহ (কুরআন), প্রতিষ্ঠিত সুন্নত (হাদিস) ও ন্যায় বিধান (ফিকাহ)।’ (তিরমিজি)। হজরত উবাই ইবনে কাআব (রা.) বলেন, ‘(শিক্ষিত তিনি) যিনি শিক্ষা অনুযায়ী কর্ম করেন (অর্থাৎ শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষাও থাকে)।’ (সহিহ তিরমিজি ও সুনানে আবু দাউদ)। ইলম বা জ্ঞান হলো মালুমাত বা ইত্তিলাআত তথা তথ্যাবলি। এটি দু’ভাবে অর্জিত হতে পারে: (ক) পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা। যথা (১) চক্ষু, (২) কর্ণ, (৩) নাসিকা, (৪) জিহ্বা ও (৫) ত্বক। এ প্রকার ইলমকে ইলমে কাছবি বা অর্জিত জ্ঞান বলে। (খ) ওয়াহি। যথা (১) কোরআন ও (২) হাদিস। এ প্রকার ইলমকে ইলমুল ওয়াহি বা ওয়াহির জ্ঞান বলে।

হাদিসে রাসূল (সা.)-এর বর্ণনা মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা (মুদগাহ) আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখো, সে গোশতের টুকরাটি হলো কলব।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস: ৫০)।

আত্মিক ও মানবিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন সদ্‌গুণাবলি অর্জন ও ষড়রিপুর নিয়ন্ত্রণ। সদ্‌গুণাবলির মধ্যে আছে কৌমার্য, সতীত্ব, শক্তিমত্তা, সত্যবাদিতা, ন্যায়বোধ, দয়া, মহানুভবতা, পরোপকারিতা, ধৈর্য-সহনশীলতা, মিতাচার বা সংযম ইত্যাদি। ধর্মীয় সদ্‌গুণ তিনটি; যথা (১) বিশ্বাস, (২) আশা ও (৩) ভালোবাসা। বর্জনীয় বিষয় হলো ষড়রিপু বা কুপ্রবৃত্তিসমূহ। যথা (১) কাম, (২) ক্রোধ, (৩) লোভ, (৪) মোহ, (৫) মদ, (৬) মাৎসর্য। সাধারণত মানুষের মধ্যে ১০টি সদ্‌গুণ ও ১০টি বদগুণ বিদ্যমান থাকে। পরিভাষায় এগুলোকে রজায়িল (কুপ্রবৃত্তি) ও ফাজায়িল (সুকুমারবৃত্তি) বলা হয়। মানুষের উচিত বদগুণ বর্জন ও সদ্‌গুণ অর্জনের মাধ্যমে পূর্ণতা অর্জন করা। এ ছাড়া কিছু উত্তম বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অর্জন করা মানুষের জন্য বাঞ্ছনীয় ও প্রশংসনীয় এবং কল্যাণের পথে সহায়ক। রজায়িলগুলো হলো (১) হিরছ (লোভ), (২) তমা (লালসা), (৩) রিয়া (প্রদর্শনের ইচ্ছা), (৪) কিবর (অহংকার), (৫) কিজব (মিথ্যা), (৬) গিবত (পরনিন্দা), (৭) হাছাদ (হিংসা), (৮) উজব (অহমিকা), (৯) কিনা (পরশ্রীকাতরতা) ও (১০) বুখল (কৃপণতা)।

ফাজায়িলগুলো হলো (১) তাওবা (গুনাহের জন্য অনুতাপ করা, ক্ষমা চাওয়া), (২) ইনাবাত (আল্লাহর দিকে মন সর্বদা রুজু রাখা), (৩) জুহদ (দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত আশা পরিত্যাগ করা), (৪) অরা (সন্দেহজনক জিনিস থেকে বেঁচে থাকা), (৫) সবর (ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করা), (৬) শোকর (কৃতজ্ঞতা, উপকারীর উপকার স্বীকার করা), (৭) তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হওয়া), (৮) তছলিম (আল্লাহর হুকুম-আহকাম/নিয়ামত ও মুসিবত সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়া এবং আল্লাহর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা), (৯) রেজা (আল্লাহর ইচ্ছার ওপর রাজি থাকা), (১০) কানাআত (অল্পে তুষ্টি)।

বিদ্যা মানে জ্ঞান, শিক্ষা মানে আচরণে পরিবর্তন। সব শিক্ষাই বিদ্যা কিন্তু সব বিদ্যা শিক্ষা নয়; যদি তা কার্যকর বা বাস্তবায়ন করা না হয়। জ্ঞান যেকোনো মাধ্যমেই অর্জন করা যায়, অধ্যয়ন জ্ঞানার্জনের একটি পন্থা মাত্র। অধ্যয়ন মানে পঠন বা পাঠ করা অথবা পাঠ গ্রহণ করা; অধ্যাপনা মানে পাঠন বা পাঠদান বা পাঠ প্রদান করা। অধ্যয়ন সব সময় জ্ঞানার্জনের সমার্থক নয়; জ্ঞানার্জন সর্বদাই অধ্যয়নের সমার্থক হয়। বর্তমানে বস্তুবাদী শিক্ষা ও আর্থসামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আমাদের সমাজকে করেছে কলুষিত, জাতিকে করেছে কলঙ্কিত, দেশকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ।

শিশুর বা সন্তানের নৈতিক শিক্ষার প্রথম ও প্রধান উৎস হলেন তার পিতা, মাতা ও অভিভাবকেরা। তাঁদের জীবন ও কর্ম পৌষ্য বা সন্তানের জীবনে সরাসরি প্রতিফলিত হয়। তাঁরা যদি সৎ ও সুন্দর পরিশীলিত চরিত্র ও মার্জিত আচরণের অধিকারী হন, সন্তানেরা দেখে দেখেই তা আয়ত্ত করবে। সন্তানেরা তাঁদেরই প্রতিবিম্ব।

একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, নৈতিক বা সুশিক্ষার অভাবে মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে না। ফলে সমাজে দুর্নীতি, অপরাধ, অসাম্য এবং ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা বৃদ্ধি পায়। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা পুথিগত বিদ্যা দিয়ে চরিত্র গঠন সম্ভব হয় না, যদি না এর সাথে মূল্যবোধ, সততা এবং মানবিকতার সমন্বয় ঘটে। নৈতিকতার অভাবে মানুষ নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখে, ফলে অফিসে, ব্যবসায় ও রাজনীতিতে দুর্নীতির প্রবণতা বাড়ে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে চুরি, ছিনতাই, খুন এবং অপরাধের হার বৃদ্ধি পায়। নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে, মানুষ সবসময় ফাঁকি দেওয়ার উপায় খোঁজে। নীতিহীন আচরণের ফলে ব্যক্তি নিজের কাছেই ছোট হয়ে যায়, যা তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সমাজে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও হানাহানি বেড়ে যায়, যা সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে। নৈতিক শিক্ষার অভাবে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত মানুষ তৈরি হলেও, প্রকৃত ‘মানুষ’ তৈরি হয় না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ এ তিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ছোটবেলা থেকেই সততা ও দায়িত্ববোধের চর্চা করানো উচিত।

এক্ষেত্রে শিক্ষক সমাজের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত, শিক্ষকরা হলেন শিক্ষার্থীদের জন্য আলোর মশাল বাহক। সর্বোপরি তারা হলেন, শিক্ষার্থীর জীবনের প্রধান প্রভাবক ও নিয়ামক শক্তি। তাই শিক্ষককে হতে হবে শিক্ষার্থীর রোল মডেল বা আদর্শের বাস্তব নমুনা। আর তারাই এ জাতিকে আগামীর দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। তাই একটি সুশিক্ষিত জাতিকে গড়তে হলে শিক্ষক সমাজ সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হবে।

মানুষ সামাজিক জীব। পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রভাব সমাজজীবনে প্রকট। সুতরাং আমাদের সমাজজীবনের প্রতিচ্ছায়া শিক্ষার্থীর মন, মানস ও শিক্ষাকে প্রভাবিত করে। তাই সুশিক্ষার জন্য চাই সহায়ক পরিবেশ; ন্যায়বিচার, সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা। সর্বোপরি আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামো সহ শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা। একই সাথে অবারিত গবেষণার সুযোগ। অন্যথায় একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতিকে প্রস্তুত করা যাবে না। ফলে আমাদের সকল অর্জনই নিষ্ফলা হতে বাধ্য।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।