॥ মো. মোবারক হোসাইন ॥
রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধার লাশ উদ্ধারের ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়; এটি আমাদের পরিবারব্যবস্থা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের সামনে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘটনাটি যতটা হৃদয়বিদারক, তার চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক এর অন্তর্নিহিত বার্তা, আমরা কি ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে মানুষ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, কিন্তু সম্পর্কগুলো হারাচ্ছে প্রাণ ও দায়িত্ববোধ?
জানা গেছে, মিরপুরের একটি বাসা থেকে পুলিশ এক বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার করে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক সপ্তাহ আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর স্বামী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, যিনি কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তাঁদের তিন ছেলের একজন যুগ্মসচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং অপরজন কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে। অথচ জীবনের শেষ সময়ে এই মা কোনো সন্তানের স্থায়ী আশ্রয়ে ছিলেন না; তিনি মেয়ের সঙ্গে বসবাস করছিলেন। আরও মর্মান্তিক বিষয় হলো, মৃত্যুর পর কয়েকদিন পর্যন্ত বিষয়টি পরিবারের কেউ বুঝতে পারেননি বা জানতে পারেননি।
একজন মা, যিনি সন্তানের জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সময়, ঘুম ও জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দেন। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় যদি কাটে নিঃসঙ্গতায়, তবে সেটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি সামাজিক সংকেত।
তবে কোনো ঘটনার পূর্ণ বাস্তবতা না জেনে নির্দিষ্ট পরিবার বা ব্যক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ন্যায়সঙ্গত নয়। পারিবারিক বাস্তবতা, অসুস্থতা কিংবা অন্যান্য জটিলতা থাকতে পারে, যা বাইরের মানুষ জানে না। কিন্তু এই ঘটনা যে আমাদের সমাজের একটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
শিক্ষা বেড়েছে, কিন্তু সম্পর্ক কি দুর্বল হচ্ছে
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সন্তানের সফলতা প্রায়ই মাপা হয় তার ডিগ্রি, চাকরি কিংবা বিদেশে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কে বড় কর্মকর্তা, কে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কে উন্নত দেশে থাকেন; এসব নিয়ে পরিবার গর্ব করে। কিন্তু একটি প্রশ্ন খুব কমই করা হয়, সে কতটা মানবিক? মা-বাবার প্রতি তার দায়িত্ববোধ কতটা? পরিবারে তার উপস্থিতি কতটা আশ্রয় হয়ে উঠেছে?
শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে, কিন্তু মূল্যবোধ তাকে মানুষ বানায়। ডিগ্রি ও পেশাগত সাফল্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, সেগুলো কখনো মানবিকতা ও পারিবারিক দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।
আজ বহু পরিবারে দেখা যায়; একসঙ্গে থাকা মানুষও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। প্রযুক্তি যোগাযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্বও অনেক ক্ষেত্রে বাড়িয়েছে। বৃদ্ধ মা-বাবারা প্রায়ই নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও মানসিক অনিরাপত্তার মধ্যে জীবন কাটান। অর্থ পাঠানো হয়, খোঁজ নেওয়া হয় ফোনে, কিন্তু অনেক সময় প্রয়োজন হয় পাশে বসা একজন মানুষ, আন্তরিক যত্ন ও ভালোবাসার।
সমস্যার মূল কোথায়
এই ধরনের ঘটনার পেছনে শুধু ব্যস্ততা বা নগরজীবনের চাপ দায়ী নয়; এর গভীরে রয়েছে মূল্যবোধের সংকট।
আমরা সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাই, উচ্চশিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, ক্যারিয়ার গঠনে সবকিছু ব্যয় করি; কিন্তু অনেক সময় তাদের হৃদয়ে আল্লাহর ভয়, আখিরাতের জবাবদিহি, পিতা-মাতার অধিকার এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি না।
সন্তানকে শুধু শিক্ষিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিই হওয়া উচিত মানুষ গঠনের মূল ভিত্তি। কারণ শিক্ষা মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, কিন্তু ঈমান তাকে দায়িত্বশীল ও বিবেকবান মানুষে পরিণত করে।
পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্কের ভিত্তি যদি হয় ঈমান, তাহলে সেই সম্পর্ক শুধু রক্তের বন্ধনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরিণত হয় আমানত, দায়িত্ব ও ইবাদতের সম্পর্কে। যে সন্তান বিশ্বাস করে; মা-বাবার সেবা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ এবং এর জন্য একদিন জবাবদিহি করতে হবে, সে সহজে তাঁদের অবহেলা করতে পারে না।
আল্লাহর নির্দেশ কী বলে
ইসলাম পিতা-মাতার মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন-
“তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের প্রতি ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং সম্মানজনক কথা বলো।”- সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩
এই আয়াত শুধু ভদ্র আচরণের নির্দেশ নয়; এটি পরিবার ও মানবিক দায়িত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা। ইসলাম মা-বাবার সেবাকে কেবল সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে ইবাদত ও জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে শিক্ষা দিয়েছে।
একটি সমাজে যদি আল্লাহর নির্দেশ ও নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে বাহ্যিক উন্নয়ন থাকলেও সম্পর্কের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
সমাধান কোথায়
এই সংকটের সমাধান শুধু আইন বা সামাজিক সমালোচনায় নয়; এর সমাধান পরিবার, শিক্ষা ও ঈমানভিত্তিক মূল্যবোধের পুনর্গঠনে।
প্রথমত, পরিবারে নিয়মিত যোগাযোগ ও দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। মা-বাবার খোঁজ নেওয়া যেন আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে ভালোবাসা ও দায়িত্বের অংশ হয়।
দ্বিতীয়ত, সন্তানকে শুধু ক্যারিয়ারমুখী নয়, মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাকে শেখাতে হবে- জীবনের সফলতা শুধু পদমর্যাদায় নয়, চরিত্র ও দায়িত্ববোধে।
তৃতীয়ত, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে পারিবারিক জীবনের অংশ করতে হবে। ঘরে যদি আল্লাহর ভয়, কুরআনের শিক্ষা ও আখিরাতের জবাবদিহির অনুভূতি থাকে, তাহলে সম্পর্কগুলোও দায়িত্ব ও মমত্বে দৃঢ় হয়।
চতুর্থত, সমাজ ও রাষ্ট্রকেও প্রবীণ মানুষের নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সহায়তার বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কারণ বৃদ্ধ মানুষ শুধু একটি পরিবারের নয়; তারা সমাজেরও অংশ।
শেষ কথা
মিরপুরের এই বৃদ্ধার মৃত্যু আমাদের জন্য শুধু একটি সংবাদ নয়; এটি একটি আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের পরিবার ও সমাজকে দেখতে পারি।
আমরা কি এমন প্রজন্ম গড়ে তুলছি, যারা শুধু প্রতিষ্ঠিত হবে- নাকি এমন মানুষ, যাদের হৃদয়ে থাকবে ঈমান, দায়িত্ববোধ ও পিতা-মাতার প্রতি গভীর ভালোবাসা?
কারণ দিনশেষে মানুষের পরিচয় তার পদ-পদবি নয়, তার ব্যবহার; তার সম্পদ নয়, তার দায়িত্ববোধ। আর সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়-আল্লাহভীরু, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
আল্লাহ তাআলা আমাদের পরিবারগুলোতে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও ঈমানের বন্ধন দৃঢ় করুন এবং কোনো মা-বাবাকে যেন নিঃসঙ্গ ও অসহায় পরিণতির মুখোমুখি না করেন। আমিন।