আমার মা কই...আমার মারে আনি দাও, মারে ছাড়া আমি বাঁচুম না! বুক চাপড়ে আকাশ বাতাস কাঁপানো কিশোর সিফাতের বুকফাটা আর্তনাদ আমাদের চারপাশের দেয়ালগুলোকে নাড়িয়ে দিলেও আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে পারেনি। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও মায়ামমতা দূর আকাশের নীলিমায় মিলিয়ে গেছে। অথচ একটা সময় এমন ছিল, মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ছিল। কিন্তু আজ আত্মকেন্দ্রিকতা আর সংকীর্ণ স্বার্থপরতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মানবিক বোধগুলো। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে মানুষ মানুষকে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করছে না। আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকা সত্ত্বেও হত্যার নিষ্ঠুরতা কিছুতেই থামছে না। প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের পাতায় চোখ বুলালেই ভেসে ওঠে হত্যা, খুন আর ধর্ষণের বিভীষিকাময় সব চিত্র। চারদিকে শুধু হাহাকার আর জীবন কেড়ে নেওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিনিয়ত পৈশাচিকতার শিকার হচ্ছে মানুষ। হত্যার বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়; পৃথিবীতে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৫২ জন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার প্রতিটি মিনিটেরও কম সময়ে এই ধরনী থেকে চিরতরে ঝরে যাচ্ছে একটি তাজা প্রাণ। নিভে যাচ্ছে একটি সম্ভাবনাময় জীবনের আলো।
অথচ সবচেয়ে বড় বেদনার বিষয় হলো যারা এই জঘন্য ও পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, অবয়বে তারাও আমাদের মতো মানুষ! হত্যার ব্যাপারে কুরআনের সূরা আল-মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘‘ যে ব্যক্তি কোনো মানুষকে (অন্যায়ভাবে) হত্যা করল- অন্য কোনো জীবনের বিনিময় ছাড়া কিংবা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া-সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল; আর যে একটি জীবন রক্ষা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করল। ’’
হত্যার মতো পৈশাচিকতা জ্যামিতিক হারে ক্যান্সারের মতো ভয়াবহতা ছড়াচ্ছে। কিছুতেই থামনো যাচ্ছে না এ প্রবণতা। প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ এমন বেপরোয়া নিষ্ঠুর হয়ে গেল কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে অবলীলায় দৃশ্যমান হয়-দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, লোভ, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক অবসাদের অবর্ণনীয় চাপ ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার টানাপোড়েনে একটা সময় মানুষ হিংস্র অমানুষে পরিণত হয়। কেউ পেশাদার খুনি হয়ে জম্মায় না; বরং এর পেছনে লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকে বহু অন্ধকার গল্প। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলের সেই চেনা চরম নৈরাজ্যের অন্ধকার চোরাগলির মতোই ক্রমান্বয়ে এক গভীর খাদের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে। সমাজে এই নৃশংসতা বাড়ার পেছনে যতগুলো কারণ নিহীত রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-সহমর্মিতা, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে উসকানি, গুজব, ভুয়া তথ্য, মাদকাশক্তি ও বেকারত্ব মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে মাদক সেবনের ফলে মানুষের স্বাভাবিক বিবেকবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লোপ পায়। ফলে মানুষ সহিংস হয়ে উঠে। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রে মুদ্রিত হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন স্বৈরশাসকের পতন হলো তখন দেশের মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ছিল। গুম, খুন, অপহরণ আর রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা বিতাড়িত হবে, মানুষ বুক ভরে মুক্ত বাতাসে নির্বিঘ্নে শ্বাস নেবে, ঘর থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে ঘরে ফিরবে। কিন্তু সবই গুড়ে বালি। স্বৈরশাসক বিতাড়িত হওয়ার দু’বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবতার রূঢ় ও নিষ্ঠুর চিত্রের দিকে তাকালে বুকটা কেঁপে ওঠে। সেই স্বপ্ন আর আকাঙ্খা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। প্রতিনিয়ত খবরে কাগজ খুললেই সড়ক দুর্ঘটনা, লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড, পাশবিক ধর্ষণ আর নির্মম খুনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। অপরাধীরা অবলীলায় নৃশংস সব অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতা আর পচনশীল সামাজিক অবক্ষয়ের এক জ¦লন্ত ট্র্যাজেডি মঞ্চস্থ হলো গত ২৫ জুন বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের একটি নিভৃত ভাড়া বাসায়। খোদ দিনদুপুরে ঘাতকের পৈশাচিক আঘাতে খুন হলেন সিফাতের মা শাহিনুর বেগম এবং তার তিন বোন-সায়মা আক্তার, নাফিসা আক্তার ইকরা ও ফাতেমা আক্তার শিফা। সাত বছর আগে বাবা কামাল হোসেন আকস্মিকভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। সন্তানের কাঁধে বাবার লাশ কত ভারী হয় তা একমাত্র বাবা হারা সন্তানেরা অনুধাবন করতে পারেন। বাবা হারানোর বেদনা তখন থেকেই অবুঝ সিফাতকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, বাবার সেই শোকের ক্ষত শুকানোর আগেই মাথার ওপর থাকা ছায়াটিও সিফাতের জীবন থেকে সরে গেল। একসাথে পরিবারের চার চারটি তাজা প্রাণকে হারিয়ে তার জীবনে অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এলো। নিষ্ঠুর এই হত্যার খবর যখন ছড়িয়ে পড়ল তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভে ঘাতক অন্তর মজুমদার গণপিটুনির শিকার হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। এই লোমহর্ষক ঘটনাটি আমাদের চারপাশের অপরাধের চরম ভয়াবহতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
এরকম নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক ঘটনা শুধু লক্ষ্মীপুরের রায়পুরেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে ১৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে খুলনার লবণচরা থানার কৃষ্ণনগর ঠিকরাবাদ এলাকায় বিয়ে নিয়ে বিরোধও পরকীয়ার জেরে ঘরে ঢুকে একই পরিবারের চারজনকে গুলী করার রেশ কাটতে না কাটতে ২০ এপ্রিল ২০২৬ রাতে নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ এবং সম্পদের লোভে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আপন ভগ্নিপতি ও ভাগ্নেদের নির্মম আক্রোশের শিকার হয় একটি নিরীহ পরিবার।
ঘাতকেরা অত্যত বর্বর উপায়ে ওই পরিবারের গৃহকর্তা হাবিবুর রহমান, তাঁর স্ত্রী পপি খাতুন এবং তাঁদের দুই অবুঝ শিশুসন্তান পারভেজ ও সাদিয়াসহ একই পরিবারের ৪ জনকে গলা কেটে হত্যা করে। ২০২৬ সালের ৯ মে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা সদরের রাউতকোনা গ্রামে ঘটে যায় এক গা শিউরে ওঠার মতো লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড। কোনো পেশাদার খুনি নয়; বরং নিজের পরিবার ও কলিজার টুকরা সন্তানদের ওপর এই নির্মম বর্বরতা চালিয়েছেন স্বয়ং বাবা ফোরকান মিয়া। পাষণ্ড এই বাবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের স্ত্রী, তিন সন্তান এবং শ্যালকসহ একই পরিবারের ৫ জনকে গলা কেটে হত্যা করেন। হত্যার পর তাঁর ভাইকে ফোনে অবলীলায় জানান, সবাইকে শেষ করে দিয়েছি, আমাকে আর খুঁজে পাবে না। অথচ হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগের রাতেই তিনি তাঁর সন্তানদের জন্য পরম স্নেহে চিপস-চকলেট কিনে বাড়ি ফিরেছিলেন। বাবার এই চরম বৈপরীত্য ও নিষ্ঠুরতা জনমনে প্রশ্ন ও ক্ষোভের জম্ম দিয়েছে-একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানদের এভাবে গলা কেটে হত্যা করতে পারেন?
একটি নিরাপদ জীবন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জানমালের নিরাপত্তার চরম প্রত্যাশা নিয়েই একটি গণতান্ত্রিক দেশের সাধারণ মানুষ বর্তমান সরকারকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছিল। কিন্তু আজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন-সাধারণ মানুষের সেই মৌলিক আকাক্সক্ষা কতটুকু পূরণ হচ্ছে? ইতিহাস সাক্ষী, চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, কাল তারা নাও থাকতে পারেন। রাজনীতিতে কোনো ক্ষমতাই স্থায়ী নয়। বাংলাদেশের জনগণ ১৫ বছরের ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রীকেও গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের চূড়ান্ত ব্যবহার কিংবা পুলিশের গুলীও সেই গণজোয়ারকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। কারণ যখন সাধারণ জনগণের বুকে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয় তখন সেই সম্মিলিত জনরোষ দুনিয়ার যেকোনো মারণাস্ত্রের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই চিরন্তন সত্যটি ভুলে যাওয়া কোনো শাসকের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে যেকোনো শক্তিশালী নির্বাচিত সরকারের বিদায় ঘন্টাও যেকোন মুহূর্তের মধ্যে বেজে উঠতে পারে। একটি স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে নতুন বাংলাদেশ।
অথচ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)র সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সরকারের ১০০ দিনে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং ৩৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যা জাতীয় সংসদেও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ টিআইবির এই প্রতিবেদনকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছেন যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো আছে। ক্ষমতার এই অস্বীকারের ভাষা আমাদের ফ্যাসিস্ট আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যারা গুম-খুনকে সবসময় প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দিতেন। অতীতে সেই অন্ধকার অধ্যায়ে রাষ্ট্রীয় মদদে যারা গুম, খুন, ক্রসফায়ার কিংবা বছরের পর বছর আয়নাঘরে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের মা-বোনদের বুকের ভেতরের কান্না একত্র করলে বুড়িগঙ্গার পানির চেয়েও বেশি অশ্রু জমা হতো। কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজ নিজের নাগরিকদের ওপর এমন নিষ্ঠুরতা চালাতে পারে না। আজকে সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলো-পরিসখ্যানকে অস্বীকার না করে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি সত্যিকারের নিরাপদ রাষ্ট্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার গড়ে তোলা প্রয়োজন। অন্যথায়, ভুক্তভোগীদের বুকফাটা আর্তনাদের অভিশাপ থেকে এই সমাজ ও রাষ্ট্র কখনো মুক্তি পাবে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক।