সাকী মাহবুব
বাংলা অভিধানে যতগুলো ছোট শব্দ আছে, তারমধ্যে অন্যতম এবং বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ হলো ‘মা’। প্রকৃতপক্ষে শব্দটি যদিও ছোট কিন্তু এর ব্যাপকতা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। মা শব্দটার মাঝে লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ মধুময়তা। মা যেন ভালোবাসার এক বিশাল আকাশ, অথৈ সাগর। তাই সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই ‘মা’ সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রেমময়ী, যাদুময়ী এক নাম। যুগে যুগে, দেশে দেশে, কালে কালে এই শব্দটি দোলা দিয়েছে সবার মনের গহীন বনে। এই ক্ষেত্রে সচেতন গীতিকার ও শিল্পীরাও পিছিয়ে নেই কোনো অংশে। মা শব্দটি তাদের মনে দোলা দিয়েছে বারবার। মায়ের প্রতি রয়েছে তাদের নিঃসীম গভীর ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই মাকে নিয়ে সুরের ঝংকার তুলেছেন দারাজ কণ্ঠে।
পাশ্চাত্য সংগীতে মা-কে নিয়ে বিভিন্ন ঘরানার গান তৈরি হয়েছে। পপ, রক, ব্লুজ থেকে শুরু করে হিপ-হপ পর্যন্ত প্রতিটি ধারায় মা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পল ম্যাকার্টনির বিখ্যাত গান “Let It Be” তাঁর মা মেরিকে উৎসর্গ করে লেখা। এটি শান্তি এবং আশার এক বৈশ্বিক সংগীতে পরিণত হয়েছে। এলভিস প্রেসলি: কিং অফ রক অ্যান্ড রোল খ্যাত এলভিস তাঁর মা গ্ল্যাডিসকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাঁর গাওয়া “Mama
Liked the Roses” গানটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। আধুনিক পপ: সেলিন ডিয়ন-এর “A MotherÕs Prayer” বা স্পাইস গার্লস-এর “Mama” গানগুলো নব্বইয়ের দশকের তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় গান ছিল। র্যাপ ও হিপ-হপ: টুপাক শাকুরের “Dear Mama” গানটি র্যাপ মিউজিকের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত, যেখানে তিনি মায়ের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মাকে নিয়ে অত্যন্ত দরদী কণ্ঠে গেয়েছেন
“পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব
মাগো, বলো কবে শীতল হবো
কত দূর আর কত দূর ——-
বল মা?
আধাঁরের ভ্রুকুটিতে ভয় নাই,
মাগো তোমার চরণে জানি পাবো ঠাঁই।
যদি এ পথ চলিতে কাঁটা বেঁধে পায়
হাসিমুখে সে বেদনা সবো
কত দূর আর কত দূর —
বল মা—-
(কথা: গৌরি প্রসন্ন মজুমদার
সুর ও শিল্পী: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)
জনপ্রিয় শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্য মাকে গেয়েছেন
“ আমার সাধ না মিটিলো আশা না পুরিলো
সকলই ফুরায়ে যায়
জনমের শোধ ডাকি গো মা তরে
কোলে তুলে নিতে আয় মা
আমার সকলই ফুরায়ে যায় মা
—-
পৃথিবীর কেউ ভালো তো বাসে না
এ পৃথিবী ভালোবাসিতে জানে না
যেথা আছে শুধু ভালোবাসাবাসি
সেথা যেতে প্রাণ চায় মা।
(কথা ও সুরঃরামপ্রসাদ সেন
শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্য)
ভারতীয সংগীতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী, সুরসম্রাজ্ঞী লতা মুঙ্গেশকর মাকে নিয়ে গেয়েছেন
“একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি
হাসব হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।
(কথাও সুর: অজানা, শিল্পী: লতা মুঙ্গেশকর)
নচিকেতা ঘোষ বাংলা গানের নতুন ধারার প্রবর্তক, বাংলা চলচ্চিত্রের একজন কিংবদন্তি সুরকার, সংগীত পরিচালক, জনপ্রিয় গায়ক নচিকেতা ঘোষ মাকে নিয়ে গেয়েছেন জনপ্রিয় একগান
“ ছেলে আমার মস্ত মানুষ,
মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায়
না দেখা এপার ওপার।
নানা রকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী,
সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি।
ছেলে আমার
আমার প্রতি অগাধ সমভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।
(কথা, সুর ও শিল্পী: নচিকেতা)
প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর অত্যন্ত দরদী কন্ঠে মাকে নিয়ে গেয়েছেন এমনিভাবে
“মায়ের একধার দুধের দাম,
কাটিয়া গায়ের চাম,
পাপোষ বানাইলে ঋণের শোধ হবে না,
এমন দরদি ভবে, কেউ হবে না আমার মা আগো। “
(শিল্পী: ফকির আলমগীর)
মাহফুজ আনাম জেমস। তিনি বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তি রক সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও গিটারিস্ট। ‘নগর বাউল’ ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান মাকে নিয়ে গেয়েছেন
“দশমাস দশদিন ধরে গর্ভে ধারণ
কষ্টের তীব্রতায় করেছে আমায় লালন,
হঠাৎ কোথায় না বলে হারিয়ে গেলে
জন্মান্তরের বাঁধন কোথা হারালো।
সবাই বলে ঐ আকাশে লুকিয়ে আছে
খুঁজে দেখ পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে।
রাতের তারা বলতে পারিস
কোথায় আছে
কেমন আছে মা।
ওরে তারা রাতের তারা মা’কে জানিয়ে দিস
অনেক কেঁদেছি আর কাঁদতে পারি না।
(কথা: প্রিন্স মাহমুদ, শিল্পী :মাহফুজ আনাম জেমস)
খান আতাউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র জগতের এক অনন্য প্রতিভা। তিনি একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। মাকে নিয়ে লিখেছেন
“ মায়ের মতো আপন কেউ নাইরে,
মা জননী নাইরে যাহার
এই ভুবনে তাহার কেউ নাইরে।
আমি আঘাত পাইলে তোমার
চোখে নামে পানি ;
সেই চোখ মুছে মাগো
কোলেতে নাও টানি।
খ্যাতিমান কবি প্রণব রায়ের লেখা গান আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে —
“মধুর আমার মায়ের হাসি
চাঁদের মুখে ঝরে
মাকে মনে পড়ে আমার
মাকে মনে পড়ে।”
(কথা: প্রণব রায়,সুর সুধীরলাল চক্রবর্তী)
গানের পাখি খুরশীদ আলম মাকে নিয়ে সুরের ঝংকার তুলেছেন এভাবে —-
“মাগো মা ওগো মা
আমারে বানাইলি তুই দেওয়ানা—-
আমি দুনিয়া ছাড়ি যেতে পারি
তোকে আমি ছাড়বো না
ওমা তোকে আমি ছাড়বো না। “
(কথা: গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুর সত্য সাহা,শিল্পী খুরশীদ আলম)
নকুল কুমার বিশ্বাস বাংলাদেশের একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সঙ্গীতশিল্পী। তিনি শুধু গায়কই নন, একাধারে গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক মাকে নিয়ে লিখেছেন
যারা মাকে ভালোবাসো না তারা আমার গান শুন না
“যারা মাকে অবহেলা কর মায়ের কষ্ট বোঝ না
তারা আমার গান শুন না
মায়ের কটা নাড়ি ছিড়ে তুমি এই দুনিয়াতে এলে
একদিনও কি সখ করে দেখছো ছেলে
সেই মাকে যারা দাও না খেতে
একটু ভক্তি কর না
তারা আমার গান শুন না।”
বাংলা গানের ঝড়তোলা শিল্পী আসিফ আকবর মাকে নিয়ে গেয়েছেন এক হৃদয়কাড়া গান
“আমি আল্লাহ রসূল নবীর পরে করি যার প্রার্থনা
তার পায়ের নিচে আমার বেহেশতের ঠিকানা।
সে যে আমার মা জননী একটি প্রিয় নাম
কেমন করে শোধ করি মা তোর দুধের দাম
দ্বীন দুনিয়ার কিছু ঋণ শোধ হবে না
দোহাই মাগো আমায় আগে উড়াল মারিস না।”
বাংলা গানের সুরের যাদুকর শিল্পী মনির খানের মাকে নিয়ে গাওয়া জনপ্রিয় গান হলো—
“মা তুই যে বাড়িতে কাজের মানুষ
সে বাড়িতে একটা কুকুর পোষে
সেই কুকুরটা মা আমি হলে
সকল দুঃখ যেত চলে।
কত আদর যত্ন পেতাম তিনবেলা ভাত মাংস খেতাম
ঘর পাহারা দিতাম মাগো
তোর পায়ের কাছে বসে।”
(কথাও সুর আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, শিল্পী মনির খান)
সাবিনা ইয়াসমিন বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী, যিনি বাংলা চলচ্চিত্রের নেপথ্য সঙ্গীত জগতে এক অনন্য নাম। ‘সঙ্গীতের রানী ‘খ্যাত শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন মাকে নিয়ে গেয়েছেন
“জন্ম আমার ধন্য হলো মা’গো
এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাক।
তোমার কথায় হাসতে পারি
তোমার কথায় কাঁদতে পারি
মরতে পারি তোমার বুকে।
বুকেই যদি রাখো আমায়
বুকে যদি রাখো মাগো।”
(কথা: নয়ীম গওহর, সুর আজাদ রহমান, শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন)
বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লার মায়ের কাছে আবদার —
“আমার গেঁথে দাও না মাগো
একটা পলাশ ফুলের মালা
আমি জনম জনম রাখবো ধরে
ভাই হারানোর জ্বালা। “
(কথা: নজরুল ইসলাম বাবু,সুর: আলাউদ্দিন আলী, শিল্পী রুনা লায়লা)
শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু মাকে নিয়ে জনপ্রিয় গান হলো
“আম্মাজান আম্মাজান আপনি বড় মেহেরবান
জন্ম দিছেন আমার আপনার দুগ্ধ করছি পান
আম্মাজান আম্মাজান আপনি বড় মেহেরবান
সবার আগে আমি আমার আম্মাজানকে চিনিরে
আম্মাজানকে চিনি
সালাম তারে আম্মাজানকে গড়িয়াছেন যিনি
পাক পবিত্র মাটি দিয়ে গড়া দেহখান
আম্মাজান আম্মাজান, আপনি বড় মেহেরবান। “
বরেণ্য শিল্পী সাইফুল্লাহ মানসুরের গানে মায়ের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া যায় —
“আমারই মা -মা জননী আমারই সুখের ঠিকানা
কান্নাকে হায় আঁচলে লুকায় দুঃখে হায় শুধু ভুলে যায়
সাজাতে আমার আঙিনা
দিলাম আমি কি যে অসহায়
দিয়েছে ছায়া মাগো কত মমতায়
আমারই তরে তোমারি দান হয় না তার তুলনা।”
বাংলা ঈর্ষণীয় প্রতিভা, তরুণ শিল্পী আমিরুল মোমেনীন মানিক মাকে নিয়ে একটা চমৎকার গান গেয়েছেন —
“মায়ে দশমাস দশদিন গর্ভে ধরিয়া
করেছেন আমাদের ধনী
গায়েরও চামড়া কাটিয়া দিলেও
সেই ঋণ শোধ হবে না জানি।
কতদিন দেখিনা মায়ের ঐ চাঁদ মুখ
কষ্টে হৃদয় পোড়ে,
পিঠাপুলি বানাইয়া পায়েসও বান্ধিয়া
মা অপেক্ষা করে
হাজারো ব্যস্ততার অবসর পাই কোথায়
তাইতো হয় না যাওয়া মায়ের বাড়িতে। “
(কথা, সুর,শিল্পী : আমিরুল মোমেনীন মানিক)
এমনিভাবে বিশ্বের অনেক নামি-দামি খ্যাতিমান তারকা শিল্পীগণ মাকে নিয়ে মনের মাধুরি আর ভালোবাসা মিশিয়ে গেয়েছেন মনকাড়া আর হৃদয়ে তোলপাড় করা গান। মাকে কেন্দ্র করে গাওয়া সেই সব গান বিশ্ব সংগীত মায়ের গানকে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধ করেছে। সচেতন শিল্পী মহল এগিয়ে আসলে অনাগত ভবিষ্যতে মাকে নিয়ে বিশ্ব সংগীতের ভুবন যে আরো মোহনীয় হয়ে উঠবে এর মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই।