মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন অনেক কবি রয়েছেন, যারা কেবল নিভৃত প্রকোষ্ঠে বসে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে শিল্পের আরাধনা করেননি; বরং জাতীয় জীবনের চরম ক্রান্তিলগ্নে কলমকে রূপান্তরিত করেছেন শাণিত অস্ত্রে। তারা রাজপথের ধুলো মেখেছেন, বারুদের গন্ধ বুকে ধারণ করেছেন এবং জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেছেন মুক্তির অমোঘ মন্ত্র। বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি আল মুজাহিদী ছিলেন ঠিক তেমনই একজন অবিসংবাদিত ‘শব্দসৈনিক’। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি কেবল একজন নীরব দর্শক ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এবং চেতনার বাতিঘর। তার কবিতা কেবল শিল্পের দায় মেটায় না, তা একই সঙ্গে একটি জাতির রাজনৈতিক উত্থান-পতন, সংগ্রাম, রক্তপাত এবং মুক্তির আকাক্সক্ষার এক অনবদ্য দলিল হিসেবে কাজ করে। একজন প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রণাঙ্গনের যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা তার কবিতায় এমন এক প্রমত্ত শক্তির সঞ্চার করেছিল, যা পরবর্তী সময়ের যেকোনো অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক আস্ফালনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। বর্তমান প্রবন্ধে আল মুজাহিদীর কবিতায় বিধৃত মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম এবং গণতান্ত্রিক চেতনার স্বরূপ তার স্বরচিত পঙক্তিমালা বিশ্লেষণের মাধ্যমে উন্মোচনের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।
১৯৭১ সাল বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তস্নাত অথচ গৌরবময় অধ্যায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে যখন সমগ্র জাতি দিশেহারা, তখন যে গুটিকয়েক তরুণ বুদ্ধিজীবী ও কবি হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন, আল মুজাহিদী তাদের মধ্যে অন্যতম। একজন শব্দসৈনিক হিসেবে তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল সামরিক যুদ্ধ দিয়ে এই বিশাল শত্রুবাহিনীর মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জাগরণ। আর এই জাগরণের কাজটি তিনি করেছিলেন তার জ্বলন্ত কবিতার মাধ্যমে। তার কবিতায় বাংলার চিরায়ত শান্ত নিসর্গ হঠাৎ করেই যেন এক রণমূর্তিতে আবির্ভূত হয়। বাংলার প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি নদীর ঢেউ এবং প্রতিটি বৃক্ষ যেন একেকজন মুক্তিযোদ্ধায় রূপান্তরিত হয় তার কলমের জাদুতে।
যুদ্ধের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে রচিত তার কবিতায় আমরা দেখতে পাই পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক তীব্র আকুতি। তিনি তার কবিতায় উচ্চারণ করেছেন:
রক্তের অক্ষরে আজ লেখা হোক মুক্তির ইশতেহার,
বাংলার প্রতিটি মাটি আজ হোক বারুদের স্তূপ;
যেখানে শোষকের বুট পড়ে, সেখানেই জ্বলে উঠুক
আমাদের অদম্য ক্ষোভ, আমাদের পবিত্র দ্রোহ।
এই পঙক্তিগুলো কেবল কিছু শব্দের গাঁথুনি নয়, এটি তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বুকের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক আগ্নেয়গিরি। এখানে ‘রক্তের অক্ষর’ বলতে তিনি সেই লাখো শহীদের আত্মত্যাগকে বুঝিয়েছেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে রচিত হয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র। কবি এখানে মাটিকে কেবল কৃষিকাজের অনুষঙ্গ হিসেবে দেখেননি, তিনি মাটিকে ‘বারুদের স্তূপ’ হিসেবে কল্পনা করেছেন। অর্থাৎ, বাংলার মাটি তার সন্তানদের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত। এই যে লেখনীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা জোগানো, এটিই একজন শব্দসৈনিকের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। তার এই কবিতাগুলো যখন অবরুদ্ধ বাংলায় বা রণাঙ্গনের পরিখায় মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে মুখে উচ্চারিত হতো, তখন তা তাদের বুকে হাজারো রাইফেলের চেয়েও বেশি শক্তি জোগাত।
মুক্তিযুদ্ধ কেবল বীরত্বের গল্প নয়, এটি একই সঙ্গে গভীর ক্ষত ও অপরিসীম বেদনারও ইতিহাস। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও লুণ্ঠন চালিয়েছিল, একজন সংবেদনশীল কবি হিসেবে আল মুজাহিদী তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তার কবিতায় এই ট্রমা বা মানসিক আঘাতের চিত্র অত্যন্ত করুণ অথচ শৈল্পিকভাবে ফুটে উঠেছে। তবে তিনি এই বেদনাকে কেবল শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি শোককে পরিণত করেছেন শক্তিতে। তার কাছে শহীদদের রক্ত কোনো বৃথা যাওয়া জল নয়, বরং তা আগামী দিনের স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পূর্বাভাস।
তার কবিতায় অবরুদ্ধ স্বদেশের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা পাঠককে এক মুহূর্তের জন্য হলেও সেই ১৯৭১ সালের ভয়াল দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি লিখেছেন:
পোড়া গ্রামের গন্ধ আর ধর্ষিতা বোনের আর্তনাদে
আকাশ যখন ভারী হয়ে আসে,
তখন আমার কলম আর স্থির থাকতে পারে না;
প্রতিটি শব্দ তখন হয়ে ওঠে একেকটি স্টেনগান,
যাদের নিশানা কেবল ওই হায়েনাদের বক্ষদেশ।
এখানে আল মুজাহিদী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। যখন চারদিকে মৃত্যু ও ধ্বংসলীলা, তখন একজন কবির দায়বদ্ধতা কী হওয়া উচিত, তা তিনি এই পঙক্তিগুলোর মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তার ‘কলম’ এখানে কোনো বিমূর্ত কল্পনার বাহন নয়, তা সরাসরি ‘স্টেনগান’-এ রূপান্তরিত হয়েছে। এই উপমাটি প্রমাণ করে যে, তিনি সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বকে মুক্তিযুদ্ধের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে একীভূত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে কবিতা মানুষের ক্রান্তিলগ্নে তার পাশে দাঁড়াতে পারে না, যে কবিতা অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পারে না, তা কোনো কবিতাই নয়। তার এই প্রতিরোধের নান্দনিকতা তাকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সেখানেই থেমে থাকেনি। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রের কালো ছায়া গ্রাস করে দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে যখন সামরিক স্বৈরাচার জেঁকে বসেছিল, তখন রাজপথের আন্দোলনে যে কজন কবি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আল মুজাহিদী ছিলেন তাদের অগ্রভাগে। রণাঙ্গনের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি যে, লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন দেশে মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হবে, বুটের তলায় পিষ্ট হবে গণতন্ত্র।
এই সময়কালে রচিত তার কবিতাগুলো হয়ে ওঠে স্বৈরাচার পতনের এক একটি ধারালো স্লোগান। তিনি রূপক ও প্রতীকের আশ্রয়ে শাসকের রক্তচক্ষুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেন। তার কবিতায় বারবার ফিরে আসে রাজপথ, মিছিল, টিয়ারগ্যাস এবং জনতার অধিকার আদায়ের কথা। তিনি তীব্র শ্লেষ ও ক্ষোভের সঙ্গে উচ্চারণ করেন:
যে বুকে ধারণ করেছি একাত্তরের রৌদ্রদগ্ধ দিন,
সে বুকে আজ স্বৈরাচারের বেয়নেট কেন?
শৃঙ্খল ভাঙার গান আমরা তো আগেই শিখেছি,
নতুন করে আমাদের আর কারাগারের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই;
রাজপথের প্রতিটি পাথর আজ আমাদের পক্ষে সাক্ষী দেবে।
এই কবিতাংশে আল মুজাহিদী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সমসাময়িক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য সেতুবন্ধন রচনা করেছেন। তিনি স্বৈরশাসকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, যে জাতি ১৯৭১ সালে পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর একটি সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে, সে জাতিকে নতুন করে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ‘রাজপথের পাথর সাক্ষী দেবে’Ñএই কথার মাধ্যমে তিনি জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার এই কবিতাগুলো ছাত্র-জনতার মুখে মুখে উচ্চারিত হতো এবং মিছিলের গতিকে আরও তীব্রতর করত। একজন শব্দসৈনিক হিসেবে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, অস্ত্র জমা দিলেও তিনি তার চেতনাকে কখনো জমা দেননি।
আল মুজাহিদীর গণতান্ত্রিক চেতনার একটি বড় দিক হলো, তিনি গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করতেন না। তার কাছে গণতন্ত্র মানে হলো অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক সাম্য এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। তিনি খুব কাছ থেকে বাংলার কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রাম দেখেছেন। ফলে তার কবিতায় বারবার শোষিত শ্রেণির কথা উঠে এসেছে। তিনি মনে করতেন, যে দেশে কৃষকের পেটে ভাত নেই, শ্রমিকের ঘামের ন্যায্য মূল্য নেই, সে দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র কখনোই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা এবং নব্য শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে তার কলম ছিল সর্বদা সোচ্চার। তিনি তার কবিতায় মাটির প্রকৃত মালিক হিসেবে মেহনতি মানুষকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার ভাষায়:
এই মাটির আসল মালিক তো সেই রোদ-পোড়া কৃষক,
যার ঘামে ভিজে ওঠে বিস্তীর্ণ শস্যের মাঠ।
অথচ ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা শকুনেরা
তার মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে চায়;
আমাদের লড়াই আজ সেইসব নব্য বর্গিদের বিরুদ্ধে,
যারা গণতন্ত্রের নামে শোষণ করে জনতার রক্ত।
এই পঙক্তিগুলোতে আল মুজাহিদীর মার্কসীয় মানবতাবাদী ও সাম্যবাদী চেতনার স্ফুরণ ঘটেছে। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ‘ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা শকুন’ বা ‘নব্য বর্গি’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন, যা দ্বারা স্বাধীন দেশের সেইসব দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে শোষণ করে। তার এই স্পষ্টবাদিতা ও নির্ভীক উচ্চারণ তাকে গণমানুষের কবিতে পরিণত করেছে। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে বারবার সাধারণ মানুষকে তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছেন।
একজন কবির শব্দ যখন ব্যারিকেড বা প্রতিবন্ধকতায় রূপান্তরিত হয়, তখন কোনো স্বৈরাচারী শক্তিই আর সামনে এগোতে পারে না। আল মুজাহিদী তার সমগ্র জীবনে এই শব্দের ব্যারিকেডই তৈরি করে গেছেন। তার কবিতায় শব্দের বুনন এতটাই শক্তিশালী যে, তা সরাসরি পাঠকের মস্তিষ্কে আঘাত করে এবং তাকে চিন্তার জগতে আলোড়িত করে। তিনি কেবল স্লোগানসর্বস্ব কবিতা লেখেননি; তার কবিতায় রয়েছে গভীর দার্শনিক প্রজ্ঞা, লোকজ উপাদানের সার্থক ব্যবহার এবং আধুনিক মননশীলতা। কিন্তু এই সবকিছুকে ছাপিয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তা হলো তার অবিচল দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।
তার একটি কবিতায় তিনি নিজের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি তার নির্দেশনার কথা ব্যক্ত করেছেন এভাবে:
আমি হয়তো থাকব না, কিন্তু আমার এই অক্ষরগুলো
জেগে থাকবে পাহারাদারের মতো;
যখনই স্বদেশের আকাশে জমবে অগণতান্ত্রিক কালো মেঘ,
আমার কবিতাগুলো তখন বজ্র হয়ে ঝরে পড়বে।
তোমরা কেবল কান পেতে শুনো, মৃত্তিকার ভেতর থেকে
কেমন করে উঠে আসে প্রতিবাদের আদিম হুংকার।
এই পঙক্তিগুলো যেন আল মুজাহিদীর নিজস্ব কাব্যিক উইল বা শেষ ইচ্ছা। তিনি জানতেন যে মানুষের জীবন নশ্বর, কিন্তু শিল্পের মৃত্যু নেই। তিনি তার কবিতাকে পাহারাদারের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা যুগে যুগে দেশের যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে, যেকোনো গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মানুষকে পথ দেখাবে। তার এই আত্মবিশ্বাস অমূলক নয়। বাংলা সাহিত্যের রাজনৈতিক ও দ্রোহের কবিতার ধারায় তার সৃষ্টি সত্যিই এক চিরন্তন পাহারাদার হিসেবে কাজ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, কবি আল মুজাহিদী কেবল একজন রোমান্টিক বা নিসর্গের কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজপথের অকুতোভয় শব্দসৈনিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি যেভাবে কলমকে অস্ত্র বানিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, ঠিক একইভাবে স্বাধীন দেশে সামরিক স্বৈরাচার ও অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে তিনি শব্দের ব্যারিকেড গড়ে তুলেছেন। তার কবিতায় বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, মাটি, মানুষ এবং গণতন্ত্র এক অভিন্ন সত্তায় মিশে গেছে।
তিনি তার দীর্ঘ কাব্যিক যাত্রায় বারবার প্রমাণ করেছেন যে, সাহিত্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের এবং মানুষের অধিকার আদায়ের এক মোক্ষম হাতিয়ার। আল মুজাহিদীর কবিতা পাঠ করা মানে হলো বাংলাদেশের জন্মইতিহাস ও তার রাজনৈতিক বিবর্তনের রক্তাক্ত অধ্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে পরিভ্রমণ করা। যতদিন পৃথিবীতে শোষণ, বঞ্চনা ও স্বৈরতন্ত্র থাকবে, ততদিন আল মুজাহিদীর দ্রোহের কবিতাগুলো মেহনতি ও মুক্তিকামী মানুষের মিছিলে স্লোগান হয়ে ধ্বনিত হবে। তার এই ‘শব্দসৈনিক’-এর ভূমিকা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাকে এক অমরত্ব প্রদান করেছে, যা কালের সীমানা পেরিয়ে অনন্তকাল ধরে
আলো ছড়াবে।