সংগ্রাম ডেস্ক

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মাঝে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত রোববার ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা (এইওআই) এক বিবৃতিতে পারমাণবিক বিদুৎকেন্দ্রে মার্কিন হামলার এই তথ্য জানিয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে প্রচারিত বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অত্যন্ত বর্বর ও আগ্রাসী এক পদক্ষেপের মাধ্যমে রোববার নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে মার্কিন বাহিনী। এএফপি, আনাদোলু, আল জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স, মিডল ইস্ট মনিটর।

দেশটির পরমাণু শক্তি সংস্থা বলেছে, খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এই বিষয়ে জানতে বিস্তারিত পর্যালোচনা চলছে।

সংস্থাটি বলছে, স্থানীয় সময় রোববার ভোর ৩টা ৩৯ মিনিটের দিকে ওই পারমাণবিক বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এইওআই। ইরানে ২০২২ সালে ওই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল।

যুদ্ধ শুরুর পর ৩০টি এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।

আইআরজিসির দাবি, সর্বশেষ ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আহভাজ শহরের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। ইরানী কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত আটদিনে চারটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন তারা গুলী করে ভূপাতিত করেছে।

ইরানের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০টির বেশি ড্রোন ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি ছিল এমকিউ-৯ রিপার।

এমকিউ-৯ রিপার যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ড্রোনগুলোর একটি। নজরদারি ও হামলা-উভয় ধরনের অভিযানে এটি ব্যবহার করা হয়। এসব ড্রোনকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যও শনাক্ত করা কঠিন বলে মনে করা হয়।

গত মার্চের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ইরানের আকাশসীমার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে ইরানের দাবি, তারা নতুন ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

২০২৪ সালের হিসাবে একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের মূল্য প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। সে হিসাবে ইরানের দাবি অনুযায়ী ৩০টি ড্রোন হারানোর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি।

তবে ইরানের এই দাবির স্বাধীনভাবে কোনো যাচাই সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রও এখন পর্যন্ত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারানোর দাবি নিশ্চিত করেনি।

মধ্যপ্রাচ্যে এফ-৩৫সহ বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে ইসরাইলে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান ও মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরার রিফুয়েলিং বিমান আনতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন, কঠোর ভ্রমণ সতর্কতা, সামরিক কৌশলে পরিবর্তন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন অভিযানের প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন আবারও সংঘাতের মাত্রা বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে।

আরেক দফা উত্তেজনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলে রিফুয়েলিং বিমান এবং যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে। মার্কিন পাইলট ও ক্রুরা শুরুতে তেল আবিবের কাছাকাছি অবস্থান, সমুদ্র উপকূল এবং রাতের জীবনযাত্রার সুবিধার কারণে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে অবস্থান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইসরাইলী প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, ট্যাংকার বিমানগুলো শেষ পর্যন্ত ইসরাইলী বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতেই মোতায়েন করা হবে।

ক্রুদের অবসর সময়ে দক্ষিণ ইসরাইলের ঘাঁটি থেকে তেল আবিবে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পৌঁছে যাওয়া কয়েক ডজন রিফুয়েলিং বিমানের পাশাপাশি যুদ্ধবিমানও ইসরাইলে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির স্পাংডাহলেম বিমানঘাঁটি থেকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিটেন থেকে অত্যাধুনিক স্টেলথ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও এই অঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব যুদ্ধবিমান অন্যান্য মিশনের পাশাপাশি ইরানের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে সহায়তা করা রাডার ধ্বংসের কাজেও ব্যবহার করা হতে পারে।

পাল্টাপাল্টি হামলা

জর্ডানে দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। শনিবার রাতে ইরানের উপকূলীয় নজরদারি ও আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে কুয়েতে থাকা দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। এ ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, জর্ডানে শুক্রবার মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার জন্য দায়ী ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত কেশম দ্বীপে থাকা উপকূলীয় নজরদারি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানা হয়।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কুয়েতে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে বাহরাইন জানিয়েছে, তারা নিজেদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা কয়েকটি আকাশীয় হামলা প্রতিহত করেছে।

গত কয়েকদিনে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রা বেড়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার অভিযোগ তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বন্দর অবরোধ কার্যকর করেছে। অন্যদিকে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে গত জুনে হওয়া প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে।

রোববার আইআরজিসি দাবি করেছে, তাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করায় দুটি জাহাজ ‘দুর্ঘটনার’ শিকার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন এবং ‘অনিরাপদ নৌপথ’ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোও একই ধরনের পরিণতির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।

এদিকে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, ‘নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হুমকির’ কারণে দেশটির কর্তৃপক্ষ আকাবা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর খালি করেছে। একই সঙ্গে মার্কিন নাগরিকদের ওই এলাকায় ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

হামলায় কুয়েতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি শোধনাগারে আগুন

ইরানের হামলায় কুয়েতে একটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ও সমুদ্রের পানি শোধনাগারের একটি অংশে আগুন লেগেছে। আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মী ও এক বেসামরিক শ্রমিক আহত হয়েছেন।

গত শনিবার কুয়েতের ফায়ার সার্ভিস এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনার (কেইউএনএ) খবরে বলা হয়, ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া দুটি স্থানে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে প্রথম ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মী ও এক বেসামরিক শ্রমিক আহত হন। পরে তাঁদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এর আগে কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, গতকাল ভোরে ইরানের হামলার পর একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সমুদ্রের পানি শোধনাগারের একটি অংশে আগুন লাগে।

ঘটনাটি এমন সময় ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে। গত জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে।

১০ হাজার মানুষ পানিসংকটে

এদিকে ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের হরমুজগান প্রদেশের উপকূলীয় বুনজি গ্রামের একটি সমুদ্রের পানি শোধনাগারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ সুপেয় পানির সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।

ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের বরাতে হরমুজগান পানি ও পয়োনিষ্কাশন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, হামলায় শোধনাগারটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এলাকাগুলোতে তীব্র পানিসংকট দেখা দিয়েছে।