জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত এবং জনমানুষের আকাক্সক্ষার সঙ্গে যারা বেইমানি করবে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জুলাই বিপ্লব পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন।
জামায়াত আমীর জানান, জনগণের মৌলিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই লড়াই অব্যাহত থাকবে। কোনও অপশক্তির কাছেই তারা নতি স্বীকার করবেন না। তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশের মানুষের মুক্তির সনদ। যারা এই আন্দোলনের চেতনাকে নস্যাৎ করতে চায় এবং শহীদদের রক্তের অবমাননা করে পর্দার আড়াল থেকে ষড়যন্ত্র করছে, তাদের চিহ্নিত করা হবে।
গণভোটের রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, ১১ দলীয় জোট যে লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ এবং সংসদ- উভয় জায়গাতেই তাদের সোচ্চার ভূমিকা থাকবে। তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ১১ দলের কোনও বিশ্রাম নেই। মূলত একটি বৈষম্যহীন এবং ইনসাফ কায়েমের লক্ষ্যেই এই বৃহত্তর ঐক্য কাজ করছে।
সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা জুলাই সনদের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দেন। তার মতে, এই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি ছাত্র-জনতার বিপ্লবের প্রতিফলন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এই গণসমাবেশে জোটের অন্যান্য শরিক দলের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে আসা হাজার হাজার কর্মীর উপস্থিতিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বক্তারা সবাই একযোগে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মৃতি রক্ষা এবং আহতদের পুনর্বাসনের দাবি জানান।
জামায়াত আমীর বলেন, এই মঞ্চে যারা বসে আছেন তারা প্রমাণ করেছেন জীবন দেব, তবু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না। আফসোস, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর যে খুনের রাজনীতি দিয়ে হাত রাঙিয়ে হাসিনার রাজনীতির উত্থান হয়েছিল, তাদের হাতে একসময় যারা সকলে মজলুম ছিলাম, রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, তাদেরই একটা অংশ আজকে সরকারে যাওয়ার পরে অতীতের সবকিছু ভুলে গিয়েছে।
বিএনপি নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ইঙ্গিত করে জামায়াত আমীর বলেন, গণভোটের প্রস্তাব তাদের একজন করেছিলেন। তাদের নেতা রংপুরে গিয়ে বলেছিলেন, দেশবাসী ভোট দিবেন দুইটা, একটা দিবেন আমাদের মার্কায় আর একটা গণভোটে হ্যাঁ বলবেন। এখন তারা গণভোটকে অবৈধ বলছেন। আমরা সংসদে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এটা কি নির্বাচনের পরে অবৈধ হলো, না আগেই অবৈধ ছিল? তারা বলেন, আমরা ৪টার মধ্যে সাড়ে তিনটা মানি। কোনো সময় বলেন, পুরোটাই অবৈধ। একই আদেশের দুইটা ভোট। গোস্ত হালাল, কিন্তু ঝোল হারাম। এ সুবিধাবাদী মানসিকতা।
জামায়াত আমীর আরও বলেন, ফ্যাসিবাদীরা বিভিন্ন ন্যারেটিভ, বয়ান তৈরী করে জাতিকে বিভক্ত করেছিল। আর উনারা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, আমরা নির্বাচনে জয়লাভ করলে সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করে দেশ চালাব। এখন আপনারা কি করছেন, এক দলকে পাঠাচ্ছেন পাকিস্তানে, আর একদলকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন পেশোয়ারে। আর একদলকে পাঠাচ্ছেন অন্য কোনো দেশে। আর নিজেরা এই দেশের জমিদারি দখল নিতে যাচ্ছেন। মনে রাখবেন, জুলাইয়ের দুইটা স্লোগান ছিল শক্তিশালী। একটা ছিল, উই ওয়ান্ট জাস্টিস, আর একটা ছিল ‘দেশটা কারও বাপের নয়’। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, যাদের হাতে পায়ে ধরে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় এসেছেন তাদের পরিণতি দেখে শিক্ষা নেন। মনে রাখবেন বিজয় জনগণেরই হবে।
এদিকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও চলমান বিভিন্ন সংকট নিরসনের দাবিতে ঢাকায় গণমিছিলসহ তিন মাসব্যাপী কর্মসূচি দিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে মে, জুন ও জুলাই মাসে জেলায় জেলায় নাগরিক সমাবেশ এবং ৫ আগস্ট ঢাকায় গণমিছিল।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, নায়েবে আমির ইউসুফ আশরাফ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আলী ওসমান, মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ (হানজালা), ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম, ইনকিলাব মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল জাবের প্রমুখ।