২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের প্রধান অগ্রাধিকার হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ চাঙ্গা করা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।

বাংলাদেশের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের প্রধান অগ্রাধিকার হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ চাঙ্গা করা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রথম এবং দেশের ৫৫তম এই বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ। দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুনর্গঠন এবং টেকসই জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বাজেট পেশ করেছেন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. সামষ্টিক অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীলতা: গত কয়েক বছর ধরে চলমান জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট দূর করতে মে মাসের ৯.৪২% মূল্যস্ফীতিকে ৭.৫%-এ নামিয়ে আনাকে প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজার মনিটরিং ও শুল্ক ছাড়: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি শুল্ক হ্রাস এবং বাজার তদারকি জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: দেশের অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছরে ৬.৫% জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

২. মানবসম্পদ উন্নয়ন (শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত)

শিক্ষা ও গবেষণায় বড় বরাদ্দ: দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে।স্বাস্থ্য ও ই-হেলথ কার্ড: তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করা হচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে ৫টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ই-হেলথ কার্ড চালু করা হবে।

৩. বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিবিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: গত দেড় দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ব্যবসায়িক নীতি সহজীকরণ ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।ক্রিয়েটিভ ইকোনমি তহবিল: তরুণদের মাদক ও উগ্রবাদ থেকে দূরে রেখে স্বাবলম্বী করতে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে ৩,০০০ কোটি টাকার 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি' বা সৃজনশীল অর্থনীতি তহবিল গঠন করা হচ্ছে।ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME): এসএমই খাতের বিকাশে ২,০০০ কোটি টাকা এবং স্টার্ট-আপের জন্য ২২৫ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

৪. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও কৃষি খাত

ফ্যামিলি ও ফার্মার কার্ড: নিম্নআয়ের মানুষ এবং প্রান্তিক কৃষকদের সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নতুন 'ফ্যামিলি কার্ড' এবং কৃষকদের জন্য 'ফার্মার কার্ড' চালু করে সরাসরি প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।খাদ্য নিরাপত্তা: দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে কৃষি, সেচ, সার এবং খাদ্য গুদামজাতকরণ লজিস্টিকসে বিশেষ ভর্তুকি ও বরাদ্দ বজায় রাখা হচ্ছে।

৫. জ্বালানি ও অবকাঠামো সংস্কার

শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি: শিল্প ও কলকারখানার চাকা সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও টেকসই জ্বালানি সরবরাহে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP): প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়নে কম গুরুত্বপূর্ণ বা ধীরগতির প্রকল্প বাদ দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরিকারী ও উৎপাদনশীল প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বাজেট অর্থায়নের বড় চ্যালেঞ্জসমূহ

এই উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়নে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটানো। অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমাতে সরকার এবার দেশীয় উৎসের চেয়ে বৈদেশিক ঋণ ও বাজেট সহায়তার ওপর বেশি নির্ভর করার কৌশল নিয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা অর্জনে কর ফাঁকি রোধ ও করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।