দাউদকান্দি (কুমিল্লা): শিশুরা স্কুলে যাবে, খেলা-ধুলায় মেতে উঠবে -এটাই স্বাভাবিক কিন্তু আজ এক জায়গায় দুপুর বেলায় দাওয়াত খেতে এসে দেখা হয়ে যায় ছোট বাচ্চা ইয়াসিনের সাথে। সে নাকি এখানে জানালার গ্রিল ফিটিং করতে আসছে এ বাসায়। তার সাথে কথোপকথনের এক ফাকে তার সম্বন্ধে সব কিছু জানলাম উঠানের এক কোণে দোলনায় বসে। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার এক শিশু ইয়াসিনের জীবনে সেই স্বাভাবিকতা নেই। বয়স মাত্র ১২, পড়াশোনা থেমে গেছে মাঝপথেই। এখন প্রতিদিন তাকে পাওয়া যায় স্থানীয় একটি ওয়ার্কশপে কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে।মো. ইয়াসিন কওমী মাদরাসায় নাজেরা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে কিন্তু সংসারের টানাপোড়েন ও পরিবারের অযতœ-অবহেলায় বইয়ের বদলে লোহা-লোহার শব্দই হয়ে গেছে তার নিত্যসঙ্গী। বাবা পেশায় সিএনজি চালক, মা গৃহিণী। তিন ভাইয়ের মধ্যে ইয়াসিন দ্বিতীয়। বড় ভাই জাহাজ তৈরির ডকে দিনমজুরির কাজ করেন, আর সবার ছোট ভাইয়ের বয়স মাত্র তিন বছর। ইয়াসিনরা একসময় দাউদকান্দি উপজেলার বানিয়াপাড়া দরবার শরীফ সংলগ্ন ছানড়া গ্রামে পৈত্রিক ভিটায় বসবাস করত। কিন্তু দুর্ভাগ্য নেমে আসে হঠাৎ করে। ইয়াসিনের বাবা ও দাদা একসঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে বাধ্য হন। চিকিৎসার ব্যয়ভার সামলাতে গিয়ে শেষমেশ বিক্রি হয়ে যায় তাদের সেই দাদাবাড়ি। পরবর্তীতে নানা কষ্ট সয়ে পরিবারটি এখন দাউদকান্দি পৌরসভার দোনারচরে সরকার প্রদত্ত একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। যেখানে আইন অনুযায়ী শিশুশ্রম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, বাস্তবে বাংলাদেশজুড়ে দোকানপাট, ওয়ার্কশপ, কারখানা কিংবা হোটেলে ছোট ছোট শিশুদের শ্রম দিতে দেখা যায় প্রতিনিয়ত। ইয়াসিনও তাদেরই একজন, যে বয়সে খেলনা হাতে থাকার কথা, সে বয়সে জীবনের দায়ে হাতে নিয়েছে কাজের সরঞ্জাম। এ প্রসঙ্গে সমাজকর্মী সোহেল মোল্লা বলেন, “আমরা যদি শিশুদের জন্য একটি বাসযোগ্য নগরী ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে যেতে না পারি, তাহলে হয়তো আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমরা একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেলাম। দাউদকান্দি বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাহবুব রনি বলেন, শিশুশ্রম শুধু মানবিক দিক থেকেই দৃষ্টিকটু নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের জন্যও বড় হুমকি হয়ে থাকবে। ”ইয়াসিনের মতো হাজারও শিশু প্রতিদিন শৈশব হারাচ্ছে কাজের চাপে। সমাজের দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় নজরদারি বাড়ানো না গেলে তাদের জীবনের রঙিন দিনগুলো ফেরানো যাবে না কখনোই।