মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে : সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্যপ্রাণী বারবার লোকালয়ে প্রবেশ করছে। হরিণ, বানর, এমনকি বিশাল আকারের অজগর সাপও দেখা যাচ্ছে গ্রামগঞ্জে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রজনন, খাবারের ঘাটতি, এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থলের পরিবর্তনসহ নানা কারণে এই প্রাণীগুলো লোকালয়ের দিকে

ছুটে আসছে।

সম্প্রতি পূর্ব সুন্দরবনের হারবাড়িয়া পর্যটনকেন্দ্রে কাঠের তৈরি হাঁটার পথে উঠে আসে একটি বয়স্ক বাঘ। পর্যটক ও স্থানীয়দের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর মোংলা উপজেলার বৌদ্ধমারী এলাকায় সুন্দরবন থেকে ছুটে আসা দুটি হরিণ উদ্ধার করে স্থানীয়রা বন বিভাগে হস্তান্তর করেন। বিভিন্ন সময় মুরগির খামার বা বসতবাড়ি থেকে অজগর সাপও উদ্ধার করা হয়েছে এবং পরে সেগুলোকে বনে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া লোকালয়ে বানরের আনাগোনা এখন যেন প্রায় নিয়মিত দৃশ্য। এসব ঘটনার কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে।

স্থানীয়দের অনেকে জানান, বানরগুলো এখন মানুষের হাতে থাকা খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার মতো আচরণ করছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, এই প্রাণীগুলো মাঝে মাঝে বাড়িঘর বা দোকান থেকে ফলমূল, এমনকি অন্যান্য জিনিসও নিয়ে যায়। এতে ছোট শিশু ও বয়স্কদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

একজন স্থানীয় বলেন, “আমরা ভয় পাই — কখন না আমাদের বাচ্চা বা গৃহপালিত প্রাণীর ক্ষতি হয়ে যায়।” করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, সম্প্রতি সুন্দরবনের ভেতরে এক ধরনের বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, “বিশেষ করে চৈত্র মাসের শেষের দিকে ‘কাটটাস মাছি’ নামের এক ধরনের ছোট বিষাক্ত মাছি লক্ষ লক্ষ সংখ্যায় একসঙ্গে দেখা যায়। এই মাছির কামড়ে বন্যপ্রাণীরা অস্বস্তিতে পড়ে এবং অনেক সময় খালপাড় দিয়ে লোকালয়ের দিকে চলে আসে।”

পরিবেশবিদরা মনে করছেন, মানুষের অনুপ্রবেশ, বন ধ্বংস ও অবৈধ শিকার বন্ধ না করলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল আরও সংকুচিত হবে। এর ফলে মানুষ ও প্রাণীর সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে, যা পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য গুরুতর হুমকি। সুন্দরবন রক্ষায় সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর সমন্বয়কারী নূর আলম শেখ বলেন, “সুন্দরবনে যদি অবৈধ প্রবেশ, বন ধ্বংস ও চোরাচালান বন্ধ করা না যায়, তবে বন্যপ্রাণীরা সেখানে টিকে থাকতে পারবে না। সুন্দরবনকে সুরক্ষিত রাখাই একমাত্র উপায়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বনাঞ্চলে মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক খাদ্যসংস্থানের পুনরুদ্ধার ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। প্রশাসন ও বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও এ বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি, যাতে মানুষ ও বন্যপ্রাণী উভয়েই নিরাপদে সহাবস্থান করতে পারে।