মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান): বান্দরবানের আলীকদমের পাহাড়ি পর্যটন খাত বর্তমানে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন ট্যুর গ্রুপের কারণে গভীর সংকটে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ইতোমধ্যে দুই পর্যটকের প্রাণহানি ঘটেছে এবং একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। এই ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা না দেখে, বরং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চূড়ান্ত মূল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

আলীকদম ট্র্যাজেডি

জানা যায়, ‘ট্যুর এক্সপার্ট’ নামক ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন বর্ষা ইসলাম বিভিন্ন ট্যুরের আয়োজন করতেন। তার “ক্রিসতং রুংরাং সামিট (৩০ তম)” ইভেন্টে অংশ নিতে গিয়ে স্মৃতি আক্তার গত ৮ জুন আলীকদমের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ৯ জুন তারা দুর্গম রুংরাং-ক্রিসতং এলাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। ১০ জুন বর্ষা ১২ জন ও গাইডকে নিয়ে খেমচং পাড়া থেকে আন্ধারমানিক ট্রেইলের উদ্দেশ্যে যান। বাকি ২২ জন পর্যটকের, যাদের মধ্যে নিহত জুবাইরুল ইসলাম ও স্মৃতি আক্তারও ছিলেন, সাথে কোনো গাইড ছিল না। বর্ষার দাবি, এই টিমে কো-হোস্ট ছিলেন মোঃ হাসান চৌধুরী শুভ।

১১ জুন বিকালে শামুক ঝর্ণা এলাকায় আসার পর এই ২২ জনের দল থেকে স্মৃতি আক্তার, মোঃ হাসান চৌধুরী শুভ এবং শেখ জুবাইরুল ইসলাম নিখোঁজ হন। ১২ জুন শেখ জুবাইরুলের লাশ এবং ১৩ জুন স্মৃতি আক্তারের লাশ উদ্ধার করা হয়। মোঃ হাসান চৌধুরী শুভ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। বাকি সদস্যরা জীবন বাঁচাতে সারা রাত গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নেন। আলীকদম প্রশাসন ও গাইড সমিতির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ১২ জন পর্যটকের জন্য একজন গাইড বাধ্যতামূলক হলেও এই বিশাল গ্রুপটি একজন মাত্র গাইডের সহায়তায় রাতে বিপদজনক পথ বেছে নিয়েছিল।

একই গ্রুপের পুনরাবৃত্তি:

উদ্বেগের বিষয় হলো, ‘ট্যুর এক্সপার্ট’ গ্রুপের অ্যাডমিন বর্ষা ইসলামের সাথে পর্যটক মৃত্যুর ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০২৩ সালের ১২ আগস্ট, ভয়াবহ বন্যায় পার্বত্য এলাকার সাঙ্গু ও মাতামুহুরি নদী প্লাবিত হওয়া এবং পাহাড় ধসের সময়ও বর্ষা ইসলামের স্বামী, ট্যুর অপারেটর রাফি ইসলাম সাইংপ্রা নামক ঝর্নায় গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বারবার এমন বেপরোয়া আচরণ তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অনলাইন গ্রুপের অনিয়ম

শুধু ‘ট্যুর এক্সপার্ট’ নয়, আরও বেশ কিছু অনলাইন ভিত্তিক গ্রুপ আলীকদম প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে গাইডবিহীন বিশাল দল নিয়ে পাহাড়ের গভীরে প্রবেশ করে। বেশিরভাগ গ্রুপ ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত হয়। অনভিজ্ঞ ২-৪টি পাহাড় ট্যুর দিয়ে দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে রাতারাতি তারা ট্যুর অপারেটর বা হোস্ট হয়ে যাচ্ছে। সমতলের মানুষ হিসেবে পাহাড়ের বিপদসংকুল পথে হাঁটার অভিজ্ঞতা, শারীরিক সক্ষমতা, টিম পরিচালনার জ্ঞান এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেকেরই নেই।

এছাড়াও, কিছু ট্যুর গ্রুপের কর্ণধারের বিরুদ্ধে পাহাড়ের নাচ-গান, উচ্চস্বরে বক্স বাজানো এবং পাহাড়ি পাড়ায় অশ্লীলতা ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আলীকদম গাইড ও বিভিন্ন ট্যুর হোস্ট এসব বিষয়ে অবগত থাকলেও নিরুপায়। কটেজ নির্মাণের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং জুমের চাল ও মুরগি নিয়ে নামমাত্র মূল্য বা মূল্য পরিশোধ না করার অভিযোগও আছে।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

এই ধরনের অনিয়ম ও প্রাণহানি রোধে প্রশাসনের সুদৃষ্টি এবং কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। স্থানীয় গাইড ও অন্যান্য ট্যুর অপারেটরসহ সাধারণ মানুষ পাহাড়ে সুশৃঙ্খলভাবে ট্যুর পরিচালনা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের পাহাড়ি পর্যটন খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যা অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি রাখে।

এদিকে, আলীকদমে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি রোধে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল্লাহ আল মুমিন একটি সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছেন। এই সভা আগামীকাল সোমবার (১৬ জুন) বেলা এগারোটায় উপজেলা পরিষদ হলরুমে অনুষ্ঠিত হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সংশ্লিষ্ট সকলকে সভায় উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন।