ফজলুর রহমান, বাগাতিপাড়া (নাটোর) : নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার সান্যালপাড়া গ্রামে টিনের ছাউনির এক ছোট্ট ঘর। কর্দমাক্ত উঠোন পেরিয়ে যে ঘরের ভেতরে যাওয়াই দায়, কে জানত অজপাড়া গাঁয়ের এই ঘর থেকেই একদিন উঠে আসবে হকিতে দেশের উজ্জ্বল মুখ কনা আক্তার। অভাব, কষ্ট আর সমাজের কটু কথা পেরিয়ে যে কনা আজ সংগ্রাম, সাহস আর গর্বের নাম।

কনার বাবা আবু বক্কর পেশায় দিনমজুর। তার প্রতিদিনের কষ্টের আয়ে চলে ৬ সদস্যের সংসার। মা চামেলী বেগমও হাঁপিয়ে উঠেছেন সংসারের দুশ্চিন্তায়। স্বল্প আয়ে সংসারের ব্যয় মেটানই যেখানে কঠিন সেই পরিবারে খেলাধুলা মানেই এক বাড়তি বোঝা।

কনার মেজো বোন বিনা অসাধারণ ফুটবল খেলতো। স্কুল জীবনেই জেলা পেরিয়ে বিভাগীয় পর্যায়েও বেশ কয়েকটি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে। কিন্তু বেশিদিন টিকতে পারেনি। আর্থিক টানাপোড়েন ও সামাজিক চাপ তাকে ৮ম শ্রেণিতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসায়। থেমে যায় তার খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন।

২০২১ সালে শিক্ষক কামরুল হাসানের উদ্যোগে রাজশাহীতে বিকেএসপির (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) ট্রায়ালে অংশ নেয় কনা। বাড়ি থেকে ধার করা এক হাজার টাকা নিয়ে সেখানে গিয়ে হকি,জিমন্যাস্টিকস ও ফুটবলে অংশ নেয় এবং একসঙ্গে তিনটি খেলাতেই নির্বাচিত হয়। হকি এবং জিমন্যাস্টিকস এ প্রথম হয় এবং ফুটবলে হয় ২৩ তম। কামরুল স্যারের পরামর্শে বেছে নেয় হকি। শুরু হয় কনার নতুন সংগ্রাম। এদিকে মেয়ের বিকেএসপিতে সুযোগের খবরে একদিকে যেমন পরিবার খুশি হয় সেই সাথে পরে দুশ্চিন্তায়। কারণ ,ভর্তির জন্য প্রয়োজন ৩৫ হাজার টাকা। কনার পরিবারের জন্য এত টাকা যোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। কামরুল স্যারের সহায়তা, পরিবারের শেষ সম্বল ছাগল ও হাঁস বিক্রি করে কনা ভর্তি হয় বিকেএসপিতে। সেই ছোট্ট গ্রাম থেকে পা রাখে ক্রীড়া শিক্ষার মূল স্রোতে।

২০২১ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার দুইবছর পরই অনূর্ধ্ব ২১ দলের হয়ে এশিয়ান হকি ফেডারেশন (এএইচএফ) কাপ জুনিয়র টুর্নামেন্ট খেলতে দেশের বাইরে যায় কনা। এরপর ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুর ও ওমানে গিয়ে আরও দুইবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। সবশেষ ২০২৫ সালে চীনের দাজহুতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপ হকিতে অংশ নেয় বাংলাদেশ। কনাও দলে জায়গা করে নেয়। ৭ টি ম্যাচে অংশ নিয়ে ২ টিতে ম্যান অফ দ্যা প্লেয়ার নির্বাচিত হয় দলের সর্বকনিষ্ঠ প্রতিভাবান এই খেলোয়াড়।