মনিরামপুর (যশোর) থেকে সংবাদাতা: যশোর জেলার ভবদহ অঞ্চল, যা একসময় উর্বর ফসলি জমি আর প্রাণবন্ত জনবসতির জন্য পরিচিত ছিল, বর্তমানে পরিণত হয়েছে এক বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে। গত এক দশকের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি আর অপরিকল্পিত নীতির কারণে এই অঞ্চল এখন প্রতি বছরই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। সর্বশেষ জুন ও জুলাই মাসের টানা বৃষ্টিপাত এবং নদ-নালার ভয়াবহ নাব্যতা হ্রাসের কারণে ভবদহের ৫২টি বিল প্লাবিত হয়ে অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার প্রায় দেড় শতাধিক গ্রাম এখন সম্পূর্ণ পানিবন্দি। ফসল, বসতবাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সবকিছুই পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যার ফলে প্রায় কয়েক লক্ষ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি” এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছে এবং গত ৭ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কাছে ৬ দফা দাবি পেশ করেছে, যার মধ্যে স্লুইসগেটের সবগুলো ভেন্ট খুলে দেওয়া, আমডাঙ্গা খালের জমি অধিগ্রহণ এবং ৮১ কিলোমিটার নদীখনন প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নের মতো বিষয়গুলো বর্তমানে স্লুইসগেটের ২১টি ভেন্টের মধ্যে মাত্র ৮টি খোলা রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে, সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, গত এক দশকে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে পাঁচটি ভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ১২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, কিন্তু কার্যত কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। এলাকাবাসী এবং পরিবেশকর্মীরা এই বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। তাদের মতে, শুধু অর্থ বরাদ্দ করে লাভ নেই, যদি সেই অর্থ সঠিকভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহার না হয়। চীনা বিশেষজ্ঞ দল সম্প্রতি ভবদহ স্লুইসগেট পরিদর্শন করে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের আশ্বাস দিলেও, স্থানীয়দের মনে এখন বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারবার প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি আর প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে।
টিআরএম পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, যারা টি আর এম পদ্ধতিকে এই সমস্যার একমাত্র টেকসই সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই পদ্ধতিতে জোয়ারের পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে নদীর তলদেশের পলি সরিয়ে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অতীতে এই অঞ্চলে টিআরএম এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ সফল হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে এই পদ্ধতিই ভবদহের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় কমিটিও তাদের দাবিনামায় টিআরএম পদ্ধতির অবিলম্বে প্রয়োগের উপর জোর দিয়েছে।
বর্তমানে ভবদহের লাখ লাখ মানুষ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একমাত্র প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে। শুধু প্রকল্প আর প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে একটি টেকসই সমাধান বাস্তবায়নই পারে ভবদহকে তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে।
ভবদহের এই দুরবস্থার মূলে রয়েছে মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথকে বাধাগ্রস্ত করা। একসময় এই অঞ্চলের নদ-নদীগুলো জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহের মাধ্যমে নিজেদের পলি পরিষ্কার করে নাব্যতা বজায় রাখতো। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত উপকূলীয় পোল্ডার ব্যবস্থা এবং পরবর্তীতে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট ও বাঁধ নির্মাণ সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়েছে। এর ফলে নদীর তলদেশে পলি জমে উঁচু হয়ে গেছে এবং বর্ষার পানি সরতে না পেরে বিলগুলোতে আটকা পড়ছে।