মোংলা থেকে: বঙ্গোপসাগরের তীরে সুন্দরবনের দুবলার চরে শুরু হচ্ছে বার্ষিক শুঁটকি মাছ উৎপাদনের মৌসুম। মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের জাতীয় নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার সমুদ্রে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। ফলে একই সঙ্গে শুরু হচ্ছে শুঁটকি মৌসুম ও বাণিজ্যিক মাছ ধরার কার্যক্রম। এ মৌসুমকে ঘিরে বাগেরহাটের মোংলা উপকূলজুড়ে এখন জমে উঠেছে জেলেদের প্রস্তুতির হাট। শত শত মাছ ধরার ট্রলার ইতোমধ্যে নদ-নদীতে নোঙর করেছে, জেলেরা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, খাদ্যদ্রব্য ও নৌযানের যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিচ্ছেন। বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে তারা শনিবার মধ্যরাত থেকে সাগরে পাড়ি জমাবেন।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে শুঁটকি মৌসুম। প্রায় চার মাসের এই সময়ে জেলেরা দুবলার আলোরকোল, অফিসকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলার চরে অবস্থান করবেন। তাদের থাকার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৯০০টি ঘর, আর স্থানীয় চাহিদা মেটাতে গড়ে উঠবে ৮০টি দোকান, যার মধ্যে রয়েছে মুদি, তেল, ওষুধ, সেলুন ও খাবারের হোটেল। পাশাপাশি ১০০টি মাছ বেচাকেনার ডিপো চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার জেলে ও মহাজন সেখানে সমবেত হবেন।
বনবিধি অনুযায়ী, জেলেরা সুন্দরবনের কোনো গাছপালা কাটতে বা ব্যবহার করতে পারবেন না। তাই তারা আগেই নিজেদের সঙ্গে কাঠ, বাঁশ, চটকি ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ নিষেধ অমান্য করলে বনবিভাগ কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে মৌসুম শুরু হলেও জলদস্যু ও বনদস্যুর হুমকি এখনো জেলেদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। গত মৌসুমেও কয়েকটি মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলে কালাম শেখ বলেন, “কয়েক বছর শান্ত থাকলেও এখন আবার জলদস্যুতা বেড়েছে। গত বছর আমার জেলেদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছিল। তাই আমরা চাই প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, যেন নিরাপদে মাছ ধরতে পারি।” ফলে চলতি মৌসুমে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরদার হয়েছে।
অন্যদিকে, ঝড়–জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ মৌসুমে জেলেদের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আকস্মিক ঝড় বা ভারী বৃষ্টিতে অনেক সময় ট্রলার ডুবে যায় এবং চাতালে শুকানোর অপেক্ষায় থাকা মাছ নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয় মহাজন কালাম ব্যাপারী ও লতিফ হাওলাদার বলেন, “ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কারণে আমাদের মাছ ধরা ও শুকানোর কাজে বড় বাধা পড়ে। কখনো ট্রলার ডুবে যায়, আবার বৃষ্টিতে মাছ পঁচে যায়। তাই প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়।” সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন—বিশেষ করে উপকূলে নি¤œচাপ বা ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া মাত্রই যাত্রা ও চাতাল ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে এ মৌসুমটি দেশের উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত মৌসুমে শুঁটকি উৎপাদন থেকে বনবিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় ৬ কোটি টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭–৮ কোটি টাকা। বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে রাজস্ব বাড়বে বলে আশা করছি। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বনবিভাগের পাশাপাশি কোস্টগার্ডও দায়িত্ব পালন করবে।”
এদিকে, অনেক জেলে ঋণ ও অগ্রিমের বোঝা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্রযাত্রা শুরু করছেন। মহাজন মোস্তফা সানা বলেন, “একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে প্রায় ২০–২৫ লাখ টাকার প্রয়োজন হয়। এত টাকার যোগান আমাদের নেই, তাই ধারকর্জ করে নৌকা, জাল ও বসতঘরের মালামাল নিয়ে সাগরে যাচ্ছি। আবহাওয়া ভালো থাকলে লাভ হবে, না হলে লোকসান দিয়ে ঘরে ফিরতে হবে।”
প্রতিবছরের মতো এবারও দুবলার চর ও আশপাশে গড়ে উঠছে অস্থায়ী জেলে-গ্রাম, যেখানে মাছ শুকানো, সংরক্ষণ ও বিপণনের কাজে যুক্ত হচ্ছেন হাজারো শ্রমজীবী মানুষ। এই মৌসুমে শুধু জেলেদের জীবিকা নয়, স্থানীয় অর্থনীতিও প্রাণ ফিরে পায় শুঁটকি বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে।