শাহজাহান, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) : বন্যার পানি কমার সাথে সাথে মৎস্য ভান্ডার খ্যাত চলনবিল এলাকার তাড়াশ ও উল্লাপাড়াতে শুঁটকি তৈরির ধুম পড়ে গেছে। শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষে এ অঞ্চলের ৩ শতাধিক শুঁটকি চাঁতালে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। এই চলনবিল এলাকায় প্রতিবছরের ন্যায় এবারও শুরু হয়েছে দেশীয় জাতের মাছের শুঁটকি উৎপাদন প্রক্রিয়া।
এবছর ২৭৫.৮০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিস্ট বিভাগের কর্মকর্তা গণ। শুঁটকি ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে প্রতিমণ কাঁচা মাছ ৪ হাজার’ থেকে ১০ হাজার টাকা দরে কেনা হয়। তাড়াশের শুঁটকি ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যায় প্রতি ৩ কেজি কাঁচা মাছ থেকে ১ কেজি শুঁটকি তৈরি করা হয়।
এসব শুঁটকি মাছ প্রকারভেদে ১২ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা মণ দরে পাইকারি বিক্রি করেন তারা। শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, বর্ষা মৌসুমে চলনবিলে প্রচুর পরিমাণে মাছ ধরা পরে। সকালে কিংবা বিকেলে এসব মাছ স্থানীয় আড়ত থেকে কিনে আনেন তারা। পরে চাঁতালে নিয়ে শুকিয়ে শুঁটকি করেন। জানা যায়, চলতি বছর অক্টেবরের মাঝামাঝি থেকে শুঁটকি ব্যবসা শুরু হয়েছে। এ অঞ্চলের শুঁটকি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন মাছের আড়তের আশপাশে চাঁতাল তৈরি করে এসব শুঁটকি উৎপাদন করেন। প্রতি চাঁতালে নারী পুরুষ মিলে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক শূটকির নিয়োজিত রয়েছেন। তবে একাজে নারী শ্রমিকই বেশি দক্ষ বলে জানা গেছে।
চলনবিলে শুঁটকি তৈরি শুরু হলেও তা বাজারজাত করতে আরও মাসখানেক সময় লাগবে। এখন শুঁটকি তৈরী করার পর শুস্ক মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে থাকেন। শুঁটকি ব্যবসায়ীগন জানান তৈরী শুঁটকি দেশে বিভিন্নএলাকা থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যায়। তবে এখানকার শুঁটকির সিংহ ভাগই যায় সৈয়দপুর আড়তে।
মৎস্য ভান্ডারখ্যাত চলনবিলের তাড়াশ এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম ও মোফাজ্জল হোসেন জানান, এবছর শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলনবিলে যত্রতত্র পুকুর খনন এবং বন্যা কম হওয়ায় শুঁটকির জন্য প্রচুর মাছ পাওয়া যায়নি। দুদিন আগে থেকে মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পুনরায় বৈরী আবহাওয়ায় শুঁটকি তৈরীর কাজ বন্ধ রয়েছে। গত বছর তারা ৩০/৩২ মেট্রিকটন শুঁটকি তৈরি করেছে। এবার ১০/১২ মেট্রিকটনের বেশি শুঁটকি তৈরির করা যাবে না বলে তারা জানান।
শুঁটকি তৈরির চাতালে নারীরা চরম মজুরি বৈষম্যের শিকার। নারীরা পায় ২৫০ টাকা। পুরুষরা পায় ৫০০ টাকা। এছাড়া পুরুষ শ্রমিকদের দুপুরে খাবার দেয়া হয়। নারী শ্রমিকদের খাবার দেয়া হয় না।
উল্লাপাড়া উপজেলার বড়পাঙ্গাসী হাছেন আলী জানান, বর্ষাকালে মাছের আমদানি বেশি হয়। এলাকার হাট বাজারগুলো থেকে মাছ কিনে এনে শুঁটকি করেন। এখানকার শুঁটকি মাছ উত্তরাঞ্চলের সৈয়দপুর, জয়পুরহাট, রংপুরসহ আরো বিভিন্ন মোকাম বাজারে পাঠানো ও সেখানে পাইকারী বিক্রি হয়।
নারী শ্রমিক হাফিজা, শাহিনুররা বলেন সংসারের বাড়তি আয়ে তারা সবাই মাছ বাছাইয়ের কাজ করেন। শুঁটকি মাছ বাছাই বলতে বড় ছোট এবং মাছের জাত বাছাই করেন। তারা দিনের ছয় থেকে সাত ঘণ্টা কাজে মজুরী বাবদ আড়াইশো থেকে তিনশো টাকা পান।
তাড়াশ উপজেলা মৎস্য অফিসার মোঃ মোকারম হোসেন বলেন, ইতিমধ্যেই শুঁটকি উৎপাদন শুরু হয়েছে। তবে এবছর মাছের সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় কিছুটা হলেও কম। এ বছর এই এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লাপাড়া উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান বলেন, উল্লাপাড়া উপজেলার চলনবিল এলাকায় শুঁটকি উৎপাদন শুরু হয়েছে। এখানে ৩০/৩৫টি চাতালে শুঁটকি করা হচ্ছে। এই উপজেলায় বাৎসরিক উৎপাদন ৮০ থেকে ১শত মেট্রিক টন। দেশের বিভিন্ন মোকাম বাজারে এখানকার শুঁটকি মাছের বেশ চাহিদা রয়েছে। এখানকার উৎপাদিত শুঁটকি ঢাকা ও নিলফামারিতে পাঠানো হয়। স্থানীয় মৎস্য বিভাগ থেকে এই শুঁটকি গুলি স্বাস্থ্য সম্মতভাবে উৎপন্ন হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে মনেটরিং করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মাহবুবুর রহমান জানান, এখানে নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া ছাড়াও নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। সিরাজগঞ্জে নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদনের জন্য এর চাহিদা রয়েছে দেশব্যাপী। এছাড়া বিদেশেও যাচ্ছে এখানকার শুঁটকি। তিনি জানান এখানে উৎপাদিত শুঁটকি নিলফামারী আড়তে যায় সেখান থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারত ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়।