সাভার সংবাদদাতা : বাস্তবে প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা ১৭ থেকে ১৮ জন, অথচ বরাদ্দ ৩০ জনের। আবার যারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাদেরও দেয়া হচ্ছে না পূর্ণাঙ্গ সম্মানী ভাতা। এভাবেই সাভার উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের আওতাধীন মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে শুধুমাত্র একটি কোর্স থেকেই বছরে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে দেশব্যাপী মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক নেয়া বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার এই উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের জন্য। নিয়মিত নজরদারি না হওয়া এবং যথাযথ তদারকি না থাকার সুযোগ নিচ্ছেন কর্মকর্তারা। মূলত উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের অধীনে মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিভিন্ন নারীদের এসব প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়, যার ব্যত্যয় ঘটেনি সাভার উপজেলার ক্ষেত্রেও।

এসব কোর্সের মধ্যে একটি দর্জি বিজ্ঞান ও সেলাই প্রশিক্ষণ। ৩ মাস মেয়াদি এই কোর্সের প্রত্যেক ব্যাচে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা, যাদের প্রত্যেকে কোর্স শেষে পাবেন ৬ হাজার টাকা হারে সম্মানী ভাতা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাভার উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের আওতাধীন পরিচালিত এই কোর্সে কাগজে-কলমে ৩০ জন করে পূর্ণ ব্যাচ শিক্ষার্থী দেখানো হলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা থাকে বড়জোর ১৭ থেকে ১৮ জন। কিন্তু উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা কাজী ইসরাত জামান কাগজে-কলমে বাকি আসনগুলোতে ভুয়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে এর পুরো টাকাই নিজে আত্মসাৎ করেন; যার মাধ্যমে বছরে অন্তত এই একটি কোর্স থেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও সাংবাদিকের কাছে এই কর্মকর্তার দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেছে- এমন সন্দেহ থেকে কোর্সের একজন প্রশিক্ষককেও অব্যাহতি দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে কাজী ইসরাত জামান গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, কোর্স শিক্ষক জেসমিন, যাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে; তিনি একাধিকবার অনিয়ম করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। এই কর্মকর্তা এসময় উল্লেখ করেন, দেখা যায় আমরা যাদের নাম দিয়ে দেই, তাদের কেউ না আসলে তার স্থানে অপর একজনকে দেখিয়ে টাকা তুলে নেয় জেসমিন। এছাড়াও একজন সাংবাদিককে সে তথ্য দিচ্ছিল। পরে বিষয়গুলো হাতেনাতে ধরার পর আমি তাকে শুধরে দেই, এবং পরবর্তীতে মূল প্রশিক্ষক আসার পর তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। “আমাদের এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই। কোন ব্যাচেই ৩০ জন হয় না, কম হয়। সব হিসাব রয়েছে। যেটা হয় যারা অনুপস্থিত থাকে তার ওই দিনের হাজিরা কাটা হয় নিয়মানুযায়ী। কেউ যদি নিয়মিত সব কার্যদিবসে প্রশিক্ষণ নেয় তবে সে পূর্ণাঙ্গ টাকাটা পায়। দেখা যায় যে কিছু তদবির থাকে, তদবির থেকে শিক্ষার্থী নেয়ার পর তারা হয়তো আসে না। এর কারণে শিক্ষার্থী কমে আসে।”, যোগ করেন ইসরাত।

কর্মকর্তা কাজী ইসরাত জামান তার বিরুদ্ধে আনা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করলেও দুর্নীতির এসব অভিযোগ যাচাই করতে তথ্য অধিকার আইনে লিখিতভাবে তথ্য চাইলেও তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করেননি তিনি। উপরন্তু নিজের অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য ধামাচাপা দিতে রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে এই প্রতিবেদকের উপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছেন এই কর্মকর্তা।

দপ্তর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশিক্ষণ ছাড়াও দপ্তরের অন্যান্য বরাদ্ধের অর্থও বিভিন্নভাবে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে আত্মসাৎ করেন এই কর্মকর্তা। এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই এই প্রতিবেদককে তথ্য সরবরাহ করছেন না তিনি। রিমা আক্তার সোহানা নামে একজন প্রশিক্ষণার্থী বলেন, “কোনো কোর্সেই ৩০ জন থাকে না। শুরুতে ২০/২২ জন নিলেও শেষে গিয়ে ১০-১২ জন থাকে। এছাড়াও ৬ হাজার টাকা ভাতার কথা বলে আমাকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছিল। আমার এক বান্ধবীকে দিয়েছিল ৪ হাজার। অথচ আমরা পুরো কোর্সেই নিয়মিত হাজির ছিলাম।”

২০২৪ সালে কোর্সটিতে প্রশিক্ষণ নেয়া আরেক নারী মুসলেহা নামে শিক্ষার্থী বলেন, “আমি নিয়মিত কোর্স করলেও আমাকে ৬ হাজার টাকার স্থানে ৫ হাজার টাকা দিয়েছিল। এটা নিয়ে অভিযোগ দিয়েও কোনো সুরাহা পাইনি।” প্রশিক্ষণ নেয়া শারমিন আক্তার বলেন, আমি তিন মাস ট্রেনিং নিয়েছি হয়তো দুই এক দিন অনুপস্থিত ছিলাম এর জন্য আমাকে ৪ হাজার ৪০০ টাকা দিয়েছে। তবে আমি ৬ হাজার টাকার ঘরে স্বাক্ষর করেছি।

অন্যদিকে দর্জি বিজ্ঞান ও সেলাই প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রশিক্ষক জেসমিন আক্তার বলেন, আমি গত দুই বছর অস্থায়ী চুক্তিতে ছিলাম। “আমি যতগুলো কোর্স করিয়েছি কোনটিতেই ৩০ জন ছিল না। আমি মোট ৬টি ব্যাচ করিয়েছি। পরে আমি মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অনিয়মের বিরুদ্ধে সাংবাদিককে তথ্য দিয়েছিÑ এমন কথা বলে আমাকে কোর্স প্রশিক্ষক পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এর আগে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ইউএনও-র কাছে গিয়ে আমাকে নারী কেলেঙ্কারির মিথ্যা অভিযোগ দিতে চাপ দিয়েছিলেন কাজী ইসরাত জামান। কিন্তু তার কথায় রাজি না হওয়ায় আমাকে কোর্স থেকেই বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও আমাকে নেয়ার সময় ১২ হাজার টাকা দেয়ার কথা বলা হলেও আমাকে দেয়া হয়েছে ৬ হাজার টাকা করে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক কর্মচারী বলেন, “শুধু এই কোর্সই নয়, প্রতিটি কোর্সের ক্ষেত্রেই এমন ভুয়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন এই কর্মকর্তা। অফিসের কেউ যেন কোনো সাংবাদিকের সাথে কথা না বলে, সে বিষয়ে রয়েছে কড়া নির্দেশনা। কেউ কোনো সাংবাদিকের সাথে কথা বললে তাকে ব্যাপকভাবে হয়রানি করা হয়।” তিনি আরও বলেন, “বছরে সেলাইয়ের ৪টি ব্যাচের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যার ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীর নাম-পরিচয়ই ভুয়া।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের (ঢাকা জেলা) উপ-পরিচালক নাজনীন আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। এছাড়াও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কল রিসিভ না করায় অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) নাইমা হোসেনের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।