মোঃ একরামুল হক, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) : একসময় গ্রামীণ জীবনের প্রাণকেন্দ্র ছিল উঠান। বাংলার বাড়িঘর মানেই মাঝখানে খোলা উঠান, চারপাশে বসতঘর। সেখানে শিশুদের খেলাধুলা, নারীদের গল্পগুজব, প্রবীণদের আড্ডা, এমনকি সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক উঠান বৈঠক—সবই সম্পন্ন হতো। কিন্তু হাটহাজারীসহ চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে সেই উঠান আজ বিলুপ্তির পথে।

উঠান শুধু খালি জায়গা নয়, ছিল সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। বিয়ের আয়োজন, গ্রামীণ মেজবান, ঈদ-পূজা কিংবা অন্য কোনো উৎসবে উঠান ভরে উঠত অতিথি-আত্মীয়ের কোলাহলে। স্থানীয় শালিশ বৈঠক কিংবা রাজনৈতিক আলোচনা হতো উঠান ঘিরেই। গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির জায়গা ছিল এই উঠান।

শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে উঠানের সঙ্গে। শিশুদের লুকোচুরি, কানামাছি, কাবাডি কিংবা কাঁচগোল্লা খেলার স্থান ছিল এটি। সন্ধ্যার পর দাদী-নানীর মুখে গল্প শোনার আসরও বসত উঠানে। আজ সেই উঠান নেই—শিশুরা বন্দি হয়ে পড়ছে চার দেয়ালের ভেতর কিংবা মোবাইল-নির্ভর জীবনে।

বর্তমানে জমির মূল্যবৃদ্ধি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে হাটহাজারীর গ্রামগুলোতে নতুন ঘর ও ভাড়াবাড়ি তৈরির ধুম চলছে। খোলা আকাশের নিচে মিলনমেলার কেন্দ্র যে উঠান, তা জায়গা করে দিচ্ছে কংক্রিটের দেওয়াল ও টাইলসের মেঝেকে। ফলে ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা উঠান কেবল স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

তবে এখনও কিছু পরিবার ছোট উঠান ধরে রেখেছে। সেসব উঠানে সামাজিক আড্ডা না হলেও সবজি চাষ, ফুল ও ফলের গাছ লাগানো হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও ঐতিহ্যগত সামাজিক ভূমিকা আর পালন করছে না এসব উঠান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডীন প্রফেসর ড. আলাউদ্দিন মজুমদার বলেন, “উঠান সমাজের মানুষদের মাঝে যোগাযোগকে সহজ ও প্রাণবন্ত করে তোলে। পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার সামর্থ্য বাড়ায়। একই সঙ্গে উঠান স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং মানুষকে উন্মুক্ত জায়গার স্বাদ দেয়। উঠান বিলুপ্ত হলে সমাজ এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে, যা মানুষের শরীর ও মনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

হাটহাজারীর প্রবীণ বাসিন্দা মোহাম্মদ নুরুল আমিন মেম্বার বলেন, “আগে উঠানে মেজবান হতো, শালিশ বসত, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা চলত। এখন উঠান নেই, সবাই দেয়াল ঘেরা ঘরে বন্দি। গ্রামের সেই আনন্দ আর খুঁজে পাওয়া যায় না।”

গবেষক ও সমাজকর্মীদের মতে, ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে আধুনিক বাড়িঘরের নকশায় খোলা উঠান রাখা জরুরি। ছোট হলেও একটি খোলা উঠান শুধু পরিবারের জন্য নয়, পরিবেশ ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্যও প্রয়োজনীয়।

হাটহাজারীর গ্রামীণ সমাজে উঠান একসময় ছিল সামাজিক সম্পর্ক, আনন্দ-আয়োজন ও সংস্কৃতির প্রতীক। আজ তা বিলুপ্তির পথে। অথচ এই ঐতিহ্য রক্ষা করা গেলে গ্রামীণ জীবনযাত্রা নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।