বাংলাদেশ আজ একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতবাক। মিরপুরের একটি কেমিক্যাল কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, পরদিন চট্টগ্রাম ইপিজেডে ভয়াবহ আগুন এবং এর ঠিক একদিন পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডÑএ তিনটি ঘটনা সময়ের ব্যবধানে আলাদা হলেও এক অদ্ভুত মিল রেখে ঘটেছে। আগুন লেগেছে তিনটি কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানেÑশিল্পাঞ্চল, রপ্তানি কেন্দ্র এবং দেশের প্রধান বিমানবন্দর। প্রশ্ন উঠছেই: এগুলো কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত নাশকতা?

বাংলাদেশে আগুন নতুন নয়- পুরোনো ভবন, বৈদ্যুতিক ত্রুটি, নিরাপত্তাহীন গুদাম, এসব আমাদের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। কিন্তু এবার যে ধারাবাহিকতা ও লক্ষ্যবস্তুর নির্বাচন দেখা যাচ্ছে, তা নিছক কাকতালীয় বলা কঠিন। একদিকে পোশাক শিল্পের কেন্দ্র মিরপুর ও চট্টগ্রাম, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস; অন্যদিকে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ, যেখানে দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রাণস্রোত প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ, একে একে আগুন লেগেছে দেশের অর্থনীতির ধমনিতে।

ঘটনাগুলো ঘটছে এমন এক মুহূর্তে, যখন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উত্তেজনা তুঙ্গে, জুলাই সনদের পর নতুন রাজনৈতিক ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনী প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। এ পটভূমিতে এসব দুর্ঘটনা অনেকের চোখে “অ্যাকসিডেন্ট” নয়, বরং সম্ভাব্য স্যাবোটেজ বা পরিকল্পিত নাশকতা হিসেবে ধরা পড়ছে। বিশেষ করে শাহজালাল বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের মাত্র একদিন পর-যা অনেক বিশ্লেষকের মতে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা বহন করে।

অগ্নিকাণ্ডের ধরন ও স্থান নির্বাচন ইঙ্গিত দেয়, এগুলো কেবল নিরাপত্তাহীনতার ফল নয়, বরং একটি গভীর কৌশলের অংশও হতে পারে। উদ্দেশ্য হতে পারে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, অর্থনীতির গতি থামিয়ে দেয়া, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ানো, কিংবা আসন্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। কারণ, বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনাল কোনো সাধারণ জায়গা নয়Ñএটি দেশের অন্যতম সুরক্ষিত এলাকা, যেখানে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় রয়েছে। এমন স্থানে আগুন লাগা নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটির ফল, এটি মেনে নেয়া কঠিন।

তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশ পায়নি, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহÑশুধু বিমানবন্দরের ঘটনায় প্রায় দশ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি অনুমান করা হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার দলিল, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের কাঁচামাল, রপ্তানি পণ্য ও কাস্টমসের জব্দ মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, ফ্লাইট বাতিল ও রুট পরিবর্তনের কারণে বিমান চলাচলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ইপিজেডে আগুন দেশের রপ্তানি খাতের কর্মসংস্থান ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে এ ধারাবাহিক আগুনের ঘটনাগুলো অর্থনীতিকে নীরবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। একদিকে বিনিয়োগকারীর আস্থা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলোÑরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এখনো সেই আগের পুরনো দুর্বলতা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং অব্যবস্থাপনার চিত্রই স্পষ্ট।

প্রশ্ন একটাই: এত বড় বড় স্থাপনায় বারবার আগুন লাগছে কেন? আমাদের ফায়ার সেফটি আইন, বিল্ডিং কোড এবং শিল্পাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন প্রক্রিয়া কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ? নাকি এসব আগুনের আড়ালে আছে অদৃশ্য কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠীর হাত? রাষ্ট্র এখনই এ প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। জনগণ জানতে চায়Ñএগুলো দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত নাশকতা। এর জন্য জরুরি একটি প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, বৈদ্যুতিক সার্কিটের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে জনসম্মুখে, যাতে জনগণের আস্থা পুনর্গঠিত হয়।

তাছাড়া সরকারকে এখনই অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অবকাঠামোর সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। শিল্পাঞ্চল, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর ও কারখানাগুলোতে ফায়ার সেফটি প্রটোকল আধুনিকীকরণ ও ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতেও সচেতন থাকতে হবে, যেন কোনো পক্ষ এ দুর্যোগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। এখন সময় এসেছে দৃঢ়তা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সত্য খুঁজে বের করার। কারণ এ আগুন কেবল স্থাপনায় লাগেনিÑএটি জ্বলছে আমাদের আস্থার ভেতরেও।