মোঃ রফিকুল ইসলাম, কালিগঞ্জ সাতক্ষীরাঃ দক্ষিণে সাগর। সাগর পাড়ে সুন্দরবন। অসংখ্য নদী সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহমান। যা সাগর থেকে উৎপত্তি এবং সুন্দরবন সংলগ্ন। এ নদীসমূহ উত্তর মুখে সাগরের জোয়ারের বর্ধিত পানি নিয়ে ধাবিত হয়েছে। আবার সাগরের ভাটার টানে উপরের সকল পানি নিয়ে সাগরের বুকে ফিরে এসেছে। এটাই এলাকার নদী সমূহের বৈশিষ্ট্য।উত্তরে হিমালয় পর্বত। হিমালয়ের বরফগলা পানি নীচের দিকে নেমে দক্ষিণ দিকে ধাবিত হয়েছে। নানান বাক নিয়ে বাধা পেরিয়ে দক্ষিণের সাগরের স্রোতধারার সাথে মিলিত হয়েছে। দক্ষিণ-উত্তর এ দু’ধারার মিলনের গতিপ্রগতিতে সৃষ্ট হয়েছে অসংখ্য নদী, খাল, ভূমি, জনপদ আর সভ্যতা। বাংলাদেশ এ দু’ধারার মধ্যবর্তী।

বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল গড়ে উঠেছে সাগর-পর্বতে অপূর্ব জলকেলির মধ্য দিয়ে।হিমালয় পর্বত থেকে নেমে আসা প্রধান জলধারাটি গঙ্গা। গঙ্গার প্রধান শাখা ভাগিরথি নদী। ভাগিরথির প্রধান ধারা নানান বাঁক ও স্থান ঘুরে শ্যামনগরের (সাতক্ষীরা) মধ্যদিয়ে সাগরের সাথে মিলেছে। আর এই যাত্রা পথে কখনও যমুনা, কখনও ইছামতি, কখনও আদি যমুনা হয়ে ছুটেছে সাগরের দিকে। ভাগিরথির এ চলার পথে গড়ে উঠেছে নানান সভ্যতা, জনপদ ও ঐতিহ্য। গঙ্গা-ভাগিরথির প্রধান ধারা সাতক্ষীরার আদি যমুনা নদী।

ফলে কালিগঞ্জ হয়ে শ্যামনগরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদী হচ্ছে গঙ্গা-ভাগিরথির সাগর সংগমের শেষ প্রান্ত। অনেকের মধ্যে সংশয় আছে যমুনা নদী নিয়ে। মূলত; সিরাজগঞ্জের পার্শ্বদিয়ে প্রবাহিত বিশাল ও প্রবাহময় যমুনা উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। যমুনা ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। হিমালয় থেকে উৎপন্ন গঙ্গার সাথে উত্তরবঙ্গের বঙ্গবন্ধু সেতুর যমুনার কোন সম্পর্ক নেই। ইতিহাস বলে সিরাজগঞ্জ সংলগ্ন যমুনার উৎপত্তি সাতক্ষীরার যমুনার অনেক পরে। সে কারণে বর্তমানে সাতক্ষীরার যমুনাকে আদি যমুনা বলা হয়। আজ অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় অস্তিত্ব সংকটে আদি যমুনা। অবশ্য এলাকাবাসীর আন্দোলনের ফলে কিছুটা হলেও প্রাণ ফিরে পেয়েছে আদি যমুনা। মোদ্দা কথা ইছামতি, কালিন্দী ও যমুনা নদী সাতক্ষীরা জেলা সহ অন্য অন্য জেলার নদী গুলোর সাথে মিশে আছে।

সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জের আদি যমুনা নদী পরিচয় তুলে ধরতে এ অঞ্চলের প্রথম ঐতিহাসিক সতীষ চন্দ্র মিত্র তাঁর যশোর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে এভাবে বর্ণনা করেছেন:“এ যমুনা সেই যমুনা। যে যমুনা তটে ইন্দ্রপুরিতুল্য রাজপাট বসাইয়া কুরুপাবে ইন্দ্রপ্রস্তহস্তিনাপুরে রাজুসুয়া যজ্ঞ সুসম্পন্ন করিয়াছিলেন যে কালিন্দীতটে বংশীবটে শ্রীকৃষ্ণের প্রেমধর্ম্মের অপূর্ব্ব লীলাভিনয়হইয়াছিল, যে যমুনা তীরে দিল্লী-আগ্রায় মথুরা-প্রয়াগে হিন্দু-মুসলমান, বৌধ্য-খৃষ্টান, মোঘল-ইংরেজশত শত রাজরাজেস্বর সমগ্র ভারতেররাজদণ্ড পরিচালনা করিতেন,এ সেই একই যমুনা। সেই তমালকদম্ব পরিশোভিত, ককিল-কুজন-মুখরিত,নির্মল সলিলে প্রবাহিততটশালিনী সুন্দর যমুনা।”

গঙ্গা, ভাগিরথি নামে সপ্তগ্রাম (পশ্চিমবাংলা) পর্যন্ত আসে। এখান হতে যমুনা নামে প্রথমে চব্বিশপরগানা ও নদীয়া এবং পরে চব্বিশ পরগানা ও যশোরের সীমানার মধ্যবর্তী দিয়ে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়। যমুনা ক্রমে চৌবাড়িয়া, জলেশ্বর, ইছাপুর ও গোবরডাঙ্গা ঘুরে চারঘাটের কাছে টিপির মোহনায় এসে ইছামতি নাম ধারণ করে। ইছামতি সোজা দক্ষিণ দিক দিয়ে যাত্রা শুরু করে বশিরহাট, টাকি হয়ে বাংলাদেশের দেবহাটার ধার দিয়ে কালিগঞ্জের বসন্তপুর-দমদমের মধ্য দিয়ে নাজিমগঞ্জের পূর্বধার হয়ে শ্যামনগরে ভুরুলিয়া দিয়ে শ্যামনগরে প্রবেশ করে। এখান থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে বংশীপুর (যেখানে বারুণের-ন হয়) যেয়ে দু’ভাগ হয়ে যমুনা নামে ডানমুখো হয়ে রমজাননগরের সোনাখালী ও শ্যামনগরের চিংড়ীখালির মধ্য দিয়ে মাদার নদীর সাথে মেলে। বংশীপুরে যমুনার অপর এক অংশ ইছামতি নাম নিয়ে বাম দিয়ে কদমতলী হয়ে মালঞ্চ হয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে। সুন্দরবনে প্রবেশ করা দু’ধারাই মালঞ্চ নামে আড়পাংশিয়া নদী হয়ে সাগর সংগমের প্রাক্কালে আবার যমুনা নাম ধারণ করে।