গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা : চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত তোয়াহা খানার কূপ একটি ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার অনন্য সমন্বয়। শতাব্দী প্রাচীন এই স্থাপনা কেবল একটি ধর্মীয় কেন্দ্র নয়; এটি বাংলার মুসলিম স্থাপত্য ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতীক এবং স্থানীয় সংস্কৃতির এক জীবন্ত নিদর্শন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে অবস্থিত তোয়াহা খানার কূপ। স্থানীয়ভাবে এটি ‘ তোহা খানার মাজার’ নামেও পরিচিত। ঢাকা থেকে সড়কপথে রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসে স্থানীয় যানবাহনে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। শিবগঞ্জ বাজার থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরেই ঐতিহাসিক এই স্থাপনার অবস্থান।

ইতিহাসবিদদের ধারণা, হোসেন শাহী আমলে সুফি সাধক শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহ (রহ.) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে আগমন করেন। তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠে এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। ‘ তোয়াহা খানা’ শব্দটি আরবি ‘তাওয়াহা’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ “শান্তি” বা “আশ্রয়স্থল”। ধারণা করা হয়, প্রাথমিকভাবে এটি সুফি দরবেশদের ধ্যান ও তপস্যার কেন্দ্র ছিল। কালের পরিক্রমায় এ স্থানটি মুসলিম স্থাপত্য, ধর্মীয় চেতনা ও লোকবিশ্বাসের এক মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে।

তোয়াহা খানার কুফের স্থাপত্যে হোসেন শাহী যুগের স্পষ্ট ছোঁয়া বিদ্যমান। মসজিদের চার কোণায় ছোট ছোট মিনার, মাঝখানে গম্বুজযুক্ত ছাদ এবং দেয়ালে ফুল-লতা ও জ্যামিতিক নকশা একে করেছে মনোমুগ্ধকর। প্রবেশদ্বারে আরবি ক্যালিগ্রাফি খচিত শিলালিপিতে নির্মাতার নাম ও সাল উৎকীর্ণ রয়েছে। মাজারের নিচে একটি ‘কুফ’ বা ভূগর্ভস্থ ঘর রয়েছে, যা কিংবদন্তি অনুসারে ধ্যান ও আধ্যাত্মিক সাধনার স্থান ছিল। এখনও ভক্তরা সেখানে প্রদীপ জ্বালিয়ে দোয়া করেন—যেন সময়ের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার যোগসূত্র অটুট থাকে।

প্রতিদিনই শত শত ভক্ত ও দর্শনার্থী এখানে আগমন করেন। বিশেষ করে চাঁদরাত, ঈদ ও ওরস শরীফ উপলক্ষে পুরো এলাকা পরিণত হয় উৎসবমুখর পরিবেশে। এ স্থানটি এখন কেবল ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস—তোয়াহা খানার কুফ হলো বরকতের স্থান, যেখানে আগত ভক্তদের দোয়া কবুল হয়।

যদিও প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে এ স্থান, কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটির কিছু অংশ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের যৌথ প্রচেষ্টায় সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি যদি পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আনা যায়, তবে তোয়াহা খানার কুফ আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে স্থান পেতে পারে।

তোয়াহা খানার কুফ কেবল একটি স্থাপনা নয়—এটি শিবগঞ্জের মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি বাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ যেন সময়ের ক্যানভাসে আঁকা এক আধ্যাত্মিক চিত্র—যা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অতীতের সৌন্দর্য কখনো ম্লান হয় না, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নবতর প্রাণ পায়।