দাউদকান্দি (কুমিল্লা) সংবাদদাতা : কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরে অবস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এখন এক জীবন্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ চিকিৎসা নিতে আসছেন এই হাসপাতালে; কিন্তু চিকিৎসা নয়, বরং জীবন বাঁচানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য। পরিত্যক্ত ঘোষিত ভবনেই চলছে চিকিৎসাসেবা। ডাক্তার ও নার্সরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। ১৯৭২ সালের ৯ জুন তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী আবদুল মালেক উকিল উদ্বোধন করেছিলেন দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের। প্রথমে এটি ছিল ২০ শয্যা বিশিষ্ট, পরে বাড়িয়ে ৩১, আর বর্তমানে এটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল কুমিল্লা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে, কিন্তু আট মাস পার হলেও সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। সরেজমিন দেখা গেছে—ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, বিম ফেটে রড বেরিয়ে এসেছে, ফ্যান দুলছে। ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ মাথায় কিছু পড়ে যাওয়ার ভয়ে চোখ মেলতেও সাহস পাচ্ছেন না। গজারিয়া থেকে চিকিৎসা নিতে আসা স্বপ্না বেগম বলেন,“চিকিৎসা নিতে এসে জীবনের ভয় পাবো, এটা ভাবিনি। হঠাৎ ছাদ থেকে বিম ভেঙে পড়ে আহত হয়েছি। সারাক্ষণ মনে হয়, আবার কিছু পড়ে না তো!”রোগীর স্বজন আব্দুল মতিন ভূঁইয়া জানান,“প্রতি কিছুক্ষণ পর পর ছাদ থেকে সিমেন্ট খসে পড়ে। চোখে-মুখে বালি ঢোকে। কখন যে পুরো ছাদ ভেঙে পড়বে, বলা যায় না।”ওয়ার্ড ইনচার্জ আকলিমা আক্তার বলেন,“কয়েকদিন আগে এক রোগীর ওপর ফ্যানসহ ছাদের অংশ ভেঙে পড়ে। প্রতিদিন আতঙ্কে কাজ করি—মনে হয় আজ না কাল ভবনটা ধসে পড়বে। “নার্সিং সুপারভাইজার মোছা. নাসিমা বেগম বলেন,“আমার মাথার ওপর ছাদের ঢালাই ভেঙে পড়েছিল। প্রতিদিনই মনে হয়, কারও মাথায় কিছু পড়ে না তো! এখন সেবা দিতে এসেও আমরা রোগীর চেয়েও বেশি ভয় পাই।”উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান জানান,“প্রতিদিন আউটডোরে ৭০০-৮০০ জন, ইমার্জেন্সিতে ১৩০-১৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ইনডোরে ভর্তি থাকেন ৫০-৬০ জন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেও সেবা বন্ধ রাখিনি; আমাদের স্টাফরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন।”তিনি আরও বলেন,“সংস্কারকাজ এখনো শুরু হয়নি। পাশে নতুন ভবনের তলা বাড়িয়ে অস্থায়ীভাবে রোগীদের স্থানান্তর করা গেলে ঝুঁকি কমবে। এছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি।”স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন,“ভবনটি সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সংস্কার হবে, তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। কুমিল্লা জেলায় প্রথমেই দাউদকান্দি হাসপাতালের সংস্কার শুরু হবে।” নবনিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাছরীন আক্তার বলেন,“বিষয়টি জানার পরই আমি দ্রুত সিভিল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিচ্ছি।”দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন এক জীবন্ত ট্র্যাজেডির প্রতীক—যেখানে প্রতিটি রোগী জানেন না, তিনি সুস্থ হয়ে ফিরবেন নাকি ধসে পড়া ছাদের নিচে চাপা পড়বেন।চিকিৎসা সেবার এই করুণ বাস্তবতা যেন আরেকটি দুর্ঘটনার কারণ না হয়—এটাই এখন সকলের প্রত্যাশা।
গ্রাম-গঞ্জ-শহর
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে চিকিৎসা: আতঙ্কে দাউদকান্দি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও রোগীরা
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরে অবস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এখন এক জীবন্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
Printed Edition