এম এ আর মশিউর যশোর সংবাদদাতা: যশোর শহরের ব্যস্ত রাস্তা কারবালা রোড পেরিয়ে পানিউন্নয়ন র্বোড এর পাশ দিয়ে একটু ভেতরের দিকে গেলেই চোখে পড়ে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এক মানুষ। মাথায় সাদা চুল, মুখে দীর্ঘদিনের ক্লান্তির রেখা। বয়স ৮২ বছর। নাম দেলোয়ার হোসেন। বর্তমানে যশোরের রাজারহাটে তার বসবাস আজ তিনি জীবনযুদ্ধে একা। পরিবার থাকলেও নেই সন্তানদের ডাক। আপনজন থাকলেও নেই তাদের সঙ্গ। শুধু অভিমান, অপমান আর অবহেলার বোঝা মাথায় নিয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

ঝিনাইদহ জেলার বারোবাজারের গ্রামের এই মানুষটি ৩০ বছর আগে জীবন ও জীবিকার তাগিদে চলে আসেন যশোর শহরে। তরুণ বয়সে সংসারের হাল ধরতে, স্ত্রী-সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে দিন-রাত খেটেছেন। কখনো দিনমজুরি, কখনো শ্রমিকের কাজ করেছেন। নিজের পরিশ্রমে সন্তানদের মানুষ করেছেন। তাদের লেখাপড়া করিয়েছেন, সংসার সাজিয়ে দিয়েছেন।

দেলোয়ার হোসেনের সংসারে চার ছেলে, দুই মেয়ে। সবার বিয়ে হয়েছে। সন্তানরা নিজেদের মতো করে সংসার পেতেছে, জীবন গুছিয়েছে। কেউ ব্যবসা কেউ বা দিনমজুর ।

কিন্তু বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই মানুষটির কাছে এখন কেউ ফিরে তাকায় না। বুকভরা ভালোবাসা, দয়ার আশায় প্রতিদিন অপেক্ষা করেন কোনো এক দুপুরে, কিংবা সন্ধ্যাবেলায় দরজায় কড়া নাড়বে কেউ। খোঁজ নিবে, বাবা তুমি কেমন আছো? কিন্তু সে

ডাক আর আসে না।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, চার ছেলে-ই সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কেহই আমার খবর নেয় না। আমি অসুস্থ। ওষুধের জন্যও কাউকে পাশে পাই না। দিনমজুরি না করলে চলে না। এই বয়সেও প্রতিদিন কাজ করতে হয়। কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। চেহারায় ভাঙনের ছাপ স্পষ্ট।

বয়সের ভার আর অসুস্থ শরীর নিয়েও দেলোয়ার হোসেন থেমে যাননি। ৩০ বছর ধরে ইটের খোয়াভাঙ্গার কাজ করে আসছেন। প্রতিদিন যেখানে বহু মানুষের ঘুম শেষ হয় সেখানে তিনিই খোয়াভাঙ্গার কাজ করেন।

দিনশেষে ৫০০ টাকা আয় করেন। এই আয় দিয়েই চলে তাঁর ওষুধ, ঘরভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়, জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় স্ত্রী ছাড়া আর কেউ তাঁর পাশে নেই। বয়সের ভার, শরীরের অসুস্থতা তাকে থামাতে পারেনি। দিন গেলে টাকা আসে। সেই টাকা দিয়ে ভাড়া দিই। কিছু বাজার নেই। ওষুধ কিনি। বাকি থাকলে না খেয়েই ঘুমাই। বললেন দেলোয়ার হোসেন।

বৃদ্ধ পিতার মুখে একটানা কথার মাঝে অভিমান ফুটে ওঠে। তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। চোখের কোণে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ে।একটা সময় ছিল, যখন এই ছেলেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। ভেবেছিলাম, ওরা বড় হবে, আমায় খুশি রাখবে। এখন নিজের ছায়াও নিজের না। ওরা কেউ আসে না,খবর নেয় না। মনে হবে, এ সমাজের কোথাও যেন বড় একটা ব্যর্থতা রয়ে গেছে। যে সন্তানরা আজ স্বাবলম্বী, তাদের এই অবস্থান পিতা-মাতারই দেওয়া। অথচ সেই পিতা-মাতা বয়সের ভারে ক্লান্ত হয়ে একাকী পড়ে থাকলে কেউ ফিরেও তাকায় না।

দেলোয়ার হোসেন শুধু একজন নয়। এ যশোর শহরের প্রতিটি অলিগলিতে এমন অসংখ্য বাবা-মা রয়েছেন, যারা সন্তানের অবহেলায় একাকী দিন পার করছেন। বয়সের ভার, অসুস্থতা, জীবনের কঠিন বাস্তবতা নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। অথচ সন্তানেরা ব্যস্ত নিজের আয়-রোজগার আর সংসারের হিসাব-নিকাশে।

এই ঘটনাগুলো সমাজের সামনে এক গভীর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। আমরা কি সত্যিই মানবিক সমাজে বাস করি? পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ববোধ কি শুধুই কথার কথা?

দেলোয়ার হোসেনের মতো প্রতিটি অবহেলিত, নিঃস্ব পিতা-মাতার মুখে যেন হাসি ফোটে। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। সমাজের সচেতন মানুষদের এগিয়ে আসা উচিত। সন্তানদের বোঝানো উচিত, মা-বাবার ভালোবাসার ঋণ কখনো শোধ হয় না। আজও দেলোয়ার হোসেন অপেক্ষায় থাকেন, কেউ একদিন কাঁধে হাত রেখে বলবে বাবা, চলেন আপনাকে নিয়ে যাই।