ইন্দুরকানী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা : পিরোজপুরের ইন্দুরকানী কচাঁ নদীর বুকে জেগে উঠা চর সাঈদখালী মাঝের চর। এই চরে প্রায় ৫শত একর সম্পত্তি রয়েছে। জেগে ওঠা এই জমি নিয়ে ভূমিহীন ও যোদ্ধাদের মধ্যে ছিলো বিরোধ। তাদের মধ্যে দফায় দফায় হামলা মামলার স্বীকার হওয়ার পরে সবেক স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্য মরহুম আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও প্রশাসনের উদ্দ্যোগে একটি তাদের বিরোধের মিমাংসার দ্বার খুলে। তাদের মধ্যে ভূমিহীন ও যোদ্ধাদের নামে জেগে ওঠা চরের জমি তাদের নামে বরাদ্দ দিয়ে শান্তির দ্বার উন্মুক্ত হয়। ঐ চরে শুরু হয় তাদের বশতি। ২০০৬ সালে মাননীয় সংসদ সদস্য আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ২১শে এপ্রিল ভূমিহীনদের জন্য ১৮০টি আবাসন ঘর বাংলাদেশ নৌবাহিনী দ্বারা নির্মান করে দেন। যোদ্ধাদের বশতির জন্য দেয়া হয় আলাদা জমি।

চরটির চারওদিকে এখনো নদী বেষ্টিত থাকায় অন্ন ও বস্ত্রের ক্ষীণ চাহিদা কোনোভাবে পূরণ হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিশুদ্ধ পানির মতো সেবাগুলো থেকে এখনো তারা বঞ্চিত। একদিকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, অন্যদিকে ভূমিদস্যু, আর ঠগ-বাটপারের কবলে পড়ে প্রতিনিয়তই এরা সর্বশান্ত হচ্ছে। সাঈদখালীর চরবাসী আজও রাষ্ট্রের মূল স্রোতধারার বাইরে পড়ে আছে। আধুনিক বাংলাদেশের আলো চরাঞ্চলের ঘরে ঘরে পৌঁছেনি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মানবসৃষ্ট বিপদ : প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মানবসৃষ্ট দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এই চরবাসীরা। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, জোয়ার সব সময়ের আতঙ্ক। এই চরে নেই কোন বেড়িবাঁধ ব্যবস্থা। জলোচ্ছাস হচ্ছে চরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী। ২০০৭ সালের ভয়াবহ সিডরে এই চর থেকে ১৫ জন লোক মারা যায়। সব কিছু হাড়িয়ে নিস্ব হয়ে যায় প্রায় শতাধীক পরিবার। সিডরে এক পরিবারের চার জন লোক মারা গেছে। সরে জমিনে গেলে পরিবার প্রধান আলতাফ হোসেন দৈনিক সংগ্রামকে জানায়, তার স্ত্রী মমতাজ গর্ভবতী অবস্থায় মেয়ে সুমনা (৭), লাভলী (৫) এবং তার নাতনী হাবিবা সিডরের ঝড়ের রাতে মারা যায়। তেমন কোন সরকারী সহযোগিতা না পেয়েও সে হারানো ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছে।

শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা : চরবাসীর সবচেয়ে করুণ চিত্র ফুটে ওঠে শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থায়। এই চর এলাকায় শিক্ষার জন্য চর সাঈদখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যা স্থানীয় বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় নগন্য। এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি চরের একপ্রান্তে হওয়ায় অন্য প্রান্ত থেকে শিশূরা আসে না। তারা স্কুলের সময় খেলাধুনা ও মাছ ধরায় মেতে উঠে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা : নদীর কুল থেকে চরে যোগাযোগের জন্য রয়েছে একটি মাত্র কাঠের তৈরি দ্বার-বৈঠার নৌকা। যা প্রায়ই থাকে বন্ধ। যার কারণে এপার-ওপার করতে চরম ভোগান্তির স্বীকার হতে হয় বাসিন্দাদের। বৃহত্তর এই চরের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে রয়েছে পুরাতন একটি ইট সলিং রাস্তা। যা সংস্কারের অভাবে খানা-খন্দ হয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘদিনেও মেরামতে নেওয়া হয় নাই কোন উদ্দেগ। চরে যোগাযোগের রাস্তা না থাকার কারণে চর বাসিরা চরম ভোগান্তিতে রয়েছে। অসুস্থ রোগী বা প্রয়োজনীয় কোন মালামাল স্থানান্তর করতে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।

স্বাস্থ্য সেবা : চর এলাকায় নিত্যদিনের সঙ্গীই হচ্ছে পানিবাহিত রোগ। এখানকার অধিবাসীদের ঘর থেকে বের হলেই দুষিত পানি ও নোংরা পরিবেশ দেখতে হয়। যার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। চর এলাকায় পুষ্টিকর খাবারের অভাবে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে অধিকাংশ শিশু-কিশোর। যানেনা তারা পুষ্টিকর খাবার কী? চর এলাকায় সরকারীভাবে তেমন কাজ করতে দেখা যাচ্ছে না কোন স্বাস্থ্য কর্মীকে। প্রতি বাসে একবার স্বাস্থ্যকর্মীরা গেলেও তাতে কোন সুফল বয়ে আনছে না বাসীন্দাদের। স্বাস্থ্য সচেতনতা না থাকার কারণে মহিলারা জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সচেতন না। দিন দিন বৃদ্ধিপাচ্ছে জন্মহার এবং নবজাতক এই সব শিশূরা ভুগছেন অপরিপক্ত ও পুষ্টিহীনতায়।

বিশুদ্ধ পানি : অধিকাংশ পরিবারে রয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। তাদের একমাত্র ভরসা নদীর পানি। এলাকায় ডিপ টিউবয়েল সেট হয়। মুজিব বর্ষে তৎকালীন সরকার কয়েকটি ঘর নির্মান করে সেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ট্যাংকি দেয়। যা পরিমানে খুবই কম। যাদের কাছে ট্যাংকি রয়েছে তারা নিজেরা তা সংরক্ষণ করে খায় অন্যদের দিচ্ছে না।

চিত্যবিনোদন : শিশু-কিশোরদের চিত্যবিনোদনের জন্য এই চরে নেই কোন ব্যবস্থা। তবে বিভিন্ন এলাকা থেকে শীতকালীন মৌষুমে পিকনিক করতে এখানে আসেন। পিকনিক স্পট হিসেবে আলাদা কোন সুযোগ সুবিধা না থাকায় এখন পিকনিকেও দুর-দুরান্ত থেকে লোকজন এসে ফিরে যায়। চরেরবাসিন্দা মাহবুব জানান, সিডর, আইলা সহ বিভিন্ন প্রকৃতিক দুর্যোগে আমরা সর্বহারা হয়ে যাই। আমাদের চরের চার পাশে টেকসই বেড়িবাঁধ করা হলে আমরা নিরাপদে জীবন যাপন করতে পারব।

ইন্দুরকানী উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী জানান, আমার পিতা মরহুম আল্লামা সাঈদী সংসদ সদস্য থাকাকালীন এই চরের বাসিন্দাদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা করেছেন। ২০০৬ সালে তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে ১৮০টি পরিবারকে ঘর তৈরি করে দেন। তিনি তাদের সুপেয় পানির জন্য সেখানে পুকুর খনন করেছেন এবং তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থান জন্য রাস্ত ও বেড়িবাঁধ তৈরি করেছিল। কিন্ত অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় তার রেখে যাওয়া এ সকল কর্মকান্ডের পরে বিগত সরকার আর কোন উন্নয়নমূলক কাজ এই চরে করে নাই। যার ফলে চরে বসবাসকারীদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কষ্ট কর। গত ৫ আগষ্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর থেকে আমি চেষ্টা করতেছি যাতে করে তাদের জন্য কিছু করা যায়।

ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসান বিন মুহাম্মদ আলী জানান, চর অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য ইতিমধ্যে আমরা কাজ করতেছি। পর্যায়ক্রমে তাদের জন্য খেলার মাঠ, মসজিদ, রাস্তাঘাট, সুপেয় পানির ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষনের মাধ্যমে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।