মো. রফিকুল ইসলাম, কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) : নির্বাচনের আগ মুহূর্তে সাতক্ষীরা-৩ আসন (আশাশুনি ও কালীগঞ্জ) হঠাৎ রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যারা নিজের ঘুঁটি সাজাচ্ছিলেন, তাদের পরিকল্পনা এখন মুহূর্তেই ওলটপালট। প্রশ্ন একটাই- কে সবচেয়ে দ্রুত নতুন মানচিত্র বুঝে মাঠ দখল করতে পারবে? সম্প্রতি সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। যেখানে দেবহাটা উপজেলাকে বাদ দিয়ে আশাশুনির সঙ্গে কালীগঞ্জ উপজেলার চারটিসহ বাকি আটটি ইউনিয়নকে যুক্ত করে গঠন করা হয়েছে সাতক্ষীরা-৩ আসন। আর দেবহাটাকে যুক্ত করা হয়েছে সাতক্ষীরা-২ আসনের সঙ্গে। ফলে বহু বছরের সংগঠন, প্রচারণা ও জনসম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে হচ্ছে প্রার্থীদের। এতেই পাল্টে গেছে ভোটের হিসাবনিকাশ। পুরনো ঘাঁটি কারও থাকবে না, আবার কেউ হঠাৎ নতুন মুখ হয়ে উঠবেন। পুরনো ম্যাপ আর কাজে আসছে না। এবার রাজনীতি হবে নতুন মানচিত্র অনুযায়ী। ফলে পুরো আসনই পরিণত হয়েছে একটি খোলা যুদ্ধক্ষেত্রে।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর আসনটির সীমানা দ্বিতীয়বারের মতো পুনর্বিন্যাস হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছে সাধারণ মানুষ। সেই সঙ্গে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা। সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর মুহাদ্দিস রবিউল বাশার এ আসনে একক প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
আর বিএনপি’র দু’জন হেভিওয়েট প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। মনোনয়নপত্র কিনতে পারেন দলটির কয়েকজন তরুণ নেতাও। মাঠে নেই সদ্যগঠিত এনসিপি’র কোনো নেতাকর্মী। স্থবির হয়ে আছে জাতীয় পার্টি। এ ছাড়া আত্মগোপনে রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ। বারবার ভাঙাগড়া এ আসনে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেনÑ দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, ড্যাবের সাবেক সহ-সভাপতি, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস ডা. শহীদুল আলম এবং বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও তৎকালীন কালীগঞ্জ-দেবহাটা আসনের সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দীন। মনোনয়ন কিনতে পারেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক মির্জা ইয়াছিন আলী এবং জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের খুলনা বিভাগের কো-অর্ডিনেটর ইঞ্জিনিয়ার মো. আইয়ুব হোসেন মুকুল।
এ বিষয়ে কথা হয় ভোটারদের সঙ্গে। নলতা চৌমুনী সেলিমের চায়ের দোকানে চা খেতে আসা নাইম ইসলাম, আয়ুব হোসেন, এরশাদ আলী, ময়নদ্দীন কারিকার সহ বেশ কয়েকজন ভোটার বলেন, নতুন সীমানায় ভোট দিতে অথবা প্রার্থীর জন্য অসুবিধা হবে না । এর আগেও আশাশুনির সঙ্গে মিশে একটু জটিল হয়ে গেছে। তারা আরো বলেন, সবচেয়ে ভাল ছিল পুরনো সীমানায় নির্বাচন হওয়া। রতুনপুর হাটে হাট করতে আসা কয়েকজন ক্রেতা তারা সবাই কালিগঞ্জ উপজেলার রতুনপুর ও ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের ভোটার তারা বলেন, বলেন, আমরা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, যে আমাদের দ্রব্যমূল্যের দাম কমাতে পারবে তাকে আমরা ভোট দিব। তারা আরো বলেন আমরা সৎ এবং যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিব। যার দ্বারায় আমরা পাবো ন্যায় বিচার। জনগণ দেখতে চায় প্রতিশ্রুতি কোন প্রার্থী এলাকার উন্নয়ন করেন। তাদের দাবি, রাস্তা সংস্কার, খাল খনন, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসন, এবতেদায়ী ম্দ্রাসা গুলো সরকারী করণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, নদীভাঙন রক্ষা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান।
মুহাদ্দিস রবিউল বাশার বলেন, আমি মূলত দেবহাটার মানুষ। দেবহাটা চলে গেছে ঠিক, তবে মানুষের আস্থা ও আদর্শ দিয়ে রাজনীতি হয়। কালীগঞ্জের গ্রাম-গ্রামান্তরে আমাদের আমাদের অনেক নেতা-কর্মী ও সমর্থক আছে। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে এ আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়লাভ করবে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল ক্ষমতায় গেলে আল্লাহর আইন আর সৎলোকের শাসন বাস্তবায়ন করবে কোন মানুষ তার নায্য সম অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। শুধু কালিগঞ্জ নয় আশাশুনিতেও ইনশাল্লাহ আমরা শতভাগ এগিয়ে আছি।
দলের মনোনয়ন ও নির্বাচন প্রস্তুতি প্রসঙ্গে ডা. শহিদুল আলম বলেন, দেবহাটা বাদ পড়ায় সাংগঠনিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে রাজনীতি মানুষের বিশ্বাসে হয়। কালীগঞ্জ আমার আদি বাসস্থান। এ কারণে আমি পুরোপুরিভাবে এগিয়ে আছি। ইউনিয়নগুলোতে সভা ও ঘরে ঘরে সংযোগ তৈরি করছি। মানুষই আমাকে গ্রহণ করবে। এটাই শক্তি।
কাজী আলাউদ্দিন বলেন, আমি এক সময় কালীগঞ্জ-দেবহাটা আসনের এমপি ছিলাম। এখন নির্বাচন কমিশন ঘোষিত সংসদীয় আসনের চূড়ান্ত সীমানা অনুযায়ী দেবহাটা পড়েছে সাতক্ষীরা-২ আসনের (সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটা) মধ্যে। আর কালীগঞ্জ পড়েছে সাতক্ষীরা-৩ আসনের মধ্যে। আমি বিগত ১৫ বছর কাজ করেছি শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে। এখনো শ্যামনগর ও কালীগঞ্জেই কাজ করছি। প্রতিদিন দুই উপজেলাতেই একাধিক প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছি। দুই আসনের নেতাকর্মীরাই আমাকে চাচ্ছে। তারা বলছে, আমাদের ছেড়ে যাবেন না। এমন পরিস্থিতিতে আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দলীয় হাইকমান্ডের সিগন্যালের অপেক্ষায় আছি।
মির্জা ইয়াছিন আলী বলেন, তরুণ নেতৃত্বের উত্থান সারাবিশ্বে স্পষ্ট। সাতক্ষীরার যুবকরা নতুন ধারার রাজনীতি চাইছে। আমি মাঠে নেমেছি তরুণদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছি। দল যদি আস্থা রাখে, নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারবো।
ইঞ্জিনিয়ার মো. আইয়ুব হোসেন মুকুল বলেন, নতুন ইউনিয়নগুলোতে ইতিমধ্যে সংগঠন শক্তিশালী করেছি। যারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে কাজ করেছে, তাদেরই এবার মূল্যায়ন হওয়া উচিত। তবে এনসিপি বলছে, নতুন সীমানা বিশ্লেষণ করে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে। সম্ভবত শেষ মুহূর্তে তারা চমক দিতে পারে।