শহীদুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ :
‘যেখানে পৌঁছায় না গরুর গাড়ি,
সেখানে পৌঁছে যায় মাড়োয়ারি।’
প্রবাদের এই কথাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অনন্য জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সাহস, ও ব্যবসায়িক অন্তর্দৃষ্টি, মাড়োয়ারি সম্প্রদায়। আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বছর আগে অবিভক্ত ভারতবর্ষের রাজস্থানের ‘মারওয়ার’ অঞ্চল থেকে এক মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী জহর মল সারদা পাড়ি জমান সিরাজগঞ্জের দিকে, শুধুমাত্র ব্যবসার সন্ধানে। তার আগমন ছিল নিঃশব্দ কিন্তু প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
মাড়োয়ারি কমিউনিটি ব্যবসাকেই জীবনের মূল লক্ষ্য বলে মনে করে। এদের ভাবনায় শুধু একটি সূত্র ‘গধশব সড়হবু, ংধাব সড়হবু, ধহফ রহাবংঃ সড়হবু.’ এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা সাধারণত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা উচ্চ পদস্থ রাজ কর্মচারী হতে আগ্রহী নন। তারা ব্যবসার মধ্যেই খুঁজে নেন জীবনের স্বার্থকতা। এর প্রমাণ বর্তমান ভারতের ৪৫% ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে এবং ভারতের ১০০ জন বিলিয়নিয়ারের মধ্যে ২৬ জনই মাড়োয়ারি।
সিরাজগঞ্জে এসে জহর মল সারদা প্রথমে পাটের ব্যবসা শুরু করেন এবং অচিরেই সফলতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে সোনা-রুপার ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে তার ব্যবসা বিস্তৃত হয়। তার পুত্র রাম নারায়ণ সারদা এই ব্যবসাকে আরও সমৃদ্ধ করেন এবং ১৯৩০ সালের দিকে ভিক্টোরিয়া স্কুল রোডে এক প্রাসাদোপম দৃষ্টিনন্দন বাড়ি নির্মাণ করেন। আজও পথচারীরা থমকে দাঁড়ান সেই স্থাপত্যশৈলীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে।
এরপরের প্রজন্ম মানিক চাঁদ সারদা ১৯৪৭ সালে নির্মাণ করেন ‘লক্ষ্মী সিনেমা হল’। তখনকার সময়ে সিনেমা হলের মালিক সমাজে এমপি বা মন্ত্রীর চেয়েও অধিক মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
পাশাপাশি সারদা পরিবার ছিল শহরের একাধিক পাট কুটিরের মালিক।
কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্তি বেদনা বয়ে আনে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আর গণ-অভিবাসনের ঢেউয়ে সিরাজগঞ্জের অধিকাংশ মাড়োয়ারি পরিবার দেশত্যাগ করে ভারতে পাড়ি জমান। থেকে যায় শুধু সারদা পরিবার।
তবে থেকে গেলেও আগের সেই ব্যবসায়িক স্পৃহা আর দেখা যায়নি। নতুন বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তারা।
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক বাড়িতে বাস করেন মানিক চাঁদ সারদার দুই পুত্র শিব নারায়ণ সারদা (৭২) এবং সত্য নারায়ণ সারদা। শিব নারায়ণের এক ছেলে ও এক মেয়ে থাকলেও তারা স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস করেন, দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে থাকারও কোনো পরিকল্পনা নেই। অপর ভাই সত্য নারায়ণ সারদা অবিবাহিত। অর্থাৎ, এই দুই ভাইয়ের অবর্তমানে সিরাজগঞ্জ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে এই একমাত্র মাড়োয়ারি পরিবার এবং তাদের রেখে যাওয়া ইতিহাস।
ইতোমধ্যেই তারা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অনেক মূল্যবান সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছেন। একদিন শিব নারায়ণের সঙ্গে আলাপচারিতায় বিনয়ের সঙ্গে জানতে চেয়েছিলাম-এই দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক বাড়িটিও যদি একদিন বিক্রি করে দেন, তাহলে হয়তো তা ভেঙ্গে সেখানে গড়ে উঠবে কোনো আধুনিক বহুতল ভবন। এর চেয়ে যদি জেলা প্রশাসনকে দান করে যান, তবে এটিকে একটি মাড়োয়ারি ঐতিহ্যের মিউজিয়ামে রূপান্তর করা যায়। যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানাবে এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের গল্প।
শিব নারায়ণ সারদা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। চোখ তুললেন আকাশের দিকে। যেন সময়ের অতল থেকে কিছু খুঁজে ফিরছেন। তারপর ধীরে বললেন-
“ দেখা যাক, কি করা যায়”
একটি ইতিহাস, একটি ঐতিহ্য, একটি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। তবে যদি কেউ এগিয়ে আসে, তাহলে হয়তো ইতিহাস আবারও কথা বলবে,
‘যেখানে পৌঁছায় না গরুর গাড়ি,
সেখানে পৌঁছে যায় মাড়োয়ারি।’