মোংলা সংবাদদাতা: সুন্দরবন ও মংলা উপকূলের জেলেরা এক নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে না হতেই আরেক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হচ্ছেন। মা ইলিশের প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ছিল ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। সেই নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে মাত্র কয়েক দিন আগে। কিন্তু জেলেরা ঠিকমতো সাগরে নামার সুযোগ পাওয়ার আগেই পহেলা নবেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে জাটকা (২৫ সেন্টিমিটারের কম আকারের ইলিশ) ধরার ওপর নতুন করে আট মাসের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা, যা চলবে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত।

একটানা নিষেধাজ্ঞায় জীবিকা হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন উপকূলের হাজারো জেলে। তারা বলছেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বিকল্প কর্মসংস্থান ও পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা তাদের একমাত্র আশা।

একজন জেলে বলেন, “আমাদের আয়ের উৎস শুধু মাছ। কিন্তু এখন একটার পর একটা নিষেধাজ্ঞা আসছে। আমরা পরিবার-বাচ্চা নিয়ে কীভাবে চলব? আমাদের তো আর কোনো আয়ের পথ নেই। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমাদের পরিস্থিতির দিকেও যেন একটু খেয়াল করা হয়।”

আরেক জেলে অভিযোগ করেন, “আগের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় আমাদের যে চাল দেওয়ার কথা ছিল (ভিজিএফ), তা এখনো পাইনি। সুযোগ-সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। বলা হয়েছে পরে দেয়া হবে, কিন্তু কবে পাবো, জানি না।”

শুধু জেলেরা নন, ট্রলার মালিকেরাও পড়েছেন আর্থিক সংকটে। এক ট্রলার মালিক জানান, “একটা ট্রলার বানাতে ৮০-৯০ হাজার টাকা খরচ হয়, জাল কিনতে লাগে আরও ৫০-৬০ হাজার টাকা। এখন ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১০৫ টাকা। এই খরচ সামলে যদি বারবার নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে আমরা পরিবার নিয়ে কেমন করে চলব?”

অন্যদিকে, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নামা জেলেরা জানিয়েছেন, বড় ইলিশ নয়, এখন নদীতে কেবল ছোট ছোট জাটকা ধরা পড়ছে। ফলে আয় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। একজন জেলে বলেন, “ধার-দেনা করে নদীতে নামছি, কিন্তু ছোট মাছ ছাড়া কিছুই পাই না। এখন ঋণ আরও বাড়ছে, সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে গেছে।”

তবে মৎস্য বিভাগ বলছে, দেশের ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রজনন চক্র রক্ষার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মংলা উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “জাটকাকে সংরক্ষণ করে যাতে বড় ইলিশে রূপান্তরিত হতে পারে, সেই উদ্দেশ্যেই এই সময়টি দেওয়া হয়। এ বছরও সরকার আট মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। এই সময়ে দেশের সব নদী ও সাগরে জাটকা আহরণ, বিক্রয়, মজুদ ও পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।”

তিনি আরও জানান, “নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জাটকা আহরণ থেকে বিরত থাকা নিবন্ধিত জেলেদের জন্য সরকার ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণের ব্যবস্থা করে থাকে।”

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই আট মাসের জাটকা নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে মংলা ও সুন্দরবন উপকূলের প্রায় ২০ হাজার নিবন্ধিত জেলে খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ চাল) পাবেন। তবে জেলেদের দাবি, শুধু চাল দিয়েই এই দীর্ঘ সময় পার করা সম্ভব নয়। তাদের অনুরোধ- নিষেধাজ্ঞা চলাকালে খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হোক।