নিকলী( কিশোরগঞ্জ) থেকে আহসানুল হক জুয়েল: আওয়ামী লীগের ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ জেলা। ৫ ই আগস্ট ২৪ এর পর থেকে আওয়ামীলীগের সকল নেতা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছে। বতমানে পুরো জেলায় রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ।

কিশোরগঞ্জকে বলা হতো আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গন অভ্যুত্থানের পর সাড়া জেলায় এখন দলের কোনো কার্যালয়ই নেই। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।কিশোরগঞ্জ জেলা কার্যালয়। নেতারা সবাই আত্মগোপনে। আওয়ামী লীগের মিত্রদল হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। এদিকে একেবারে বিপরীত চিত্র বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর। এই দুই দলের কার্যালয় সরগরম, বেড়েছে নেতা–কর্মীদের নিয়মিত আনাগোনা। ৫ই আগস্টের পর ১৫ বছর বন্ধ থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা কার্যালয় সহ জেলার ১৩ উপজেলার সকল কার্যালয় খোলা হয়েছে। রাজনীতির ময়দানে নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি জেলা ও উপজেলাতে এখানো হয়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি, দলের সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে ছিলেন কিশোরগঞ্জের নেতারা। জেলা আওয়ামী লীগের সব নেতারা এখন আত্মগোপনে। জেলা শহরের দলীয় কার্যালয় বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে থাকা কার্যালয়গুলোর বেহাল অবস্থা। কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাবেক দুই সংসদ সদস্য নিকলী বাজিতপুর আসনের জুতা ব্যবসায়ী আফজল হোসেন ও কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া আসনের সোহরাব হোসেন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বাকি তিনজন সংসদ সদস্য আত্মগোপনে। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-৩ (তাড়াইল-করিমগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক (চুন্নু) কোণঠাসা অবস্থায় আছেন। জেলার বাসিন্দা সাবেক রাষ্ট্রপতি এডভোকেট মো. আবদুল হামিদের দেশত্যাগ করা নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা চললেও অবশেষে তিনি গত কয়েকদিন আগে দেশে ফিরেছেন।

গত বছরের এই সময়ে কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির কার্যালয়ে ছিল নীরবতা। নেতা–কর্মীরা ভয়ে সেখানে বসতে পারতেন না। একই অবস্থা ছিল জেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ের। এখন এই দল দুটির কার্যালয় সব সময়ই জমজমাট। নেতা-কর্মীদের পদচারণে মুখর থাকে দলীয় কার্যালয় গুলো। নেতা-কর্মীরাও ফুরফরে মেজাজে আছেন। বিএনপির যেসব নেতা-কর্মী নানা ঝামেলা এড়াতে দলের কর্মসূচি থেকে দূরে থাকতেন, তাঁরা এখন কোনো কর্মসূচি হলে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। বিএনপি আগের কার্যালয় ছেড়ে নতুন করে বড়সড় কার্যালয় নিয়েছে। এদিকে একুশ বছর পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জেলা শাখার আয়োজনে গত ৩১ মে কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামে এক বিশাল কর্মী সম্মেলন করে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা সরব। দলের নিবন্ধন ফিরে পাওয়ায় আর জামায়াত নেতা এ টি এম আজহার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।

এদিকে কিশোরগঞ্জে এনসিপির কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনো হয়নি। যাঁরা জাতীয় নাগরিক কমিটিতে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে এনসিপির ব্যানারে নতুন সদস্য সংগ্রহ ও গণসংযোগ এবং নানা সামাজিক কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া গণ অধিকার পরিষদ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কমিটি করার পাশাপাশি গণসংযোগ, সাংগঠনিক কার্যক্রমসহ চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্যান্য ইলামিক দলগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। বাম দলের কর্মসূচি অনেকটাই কার্যালয় কেন্দ্রিক হয়ে গেছে।

কিশোরগঞ্জ জেলার রাজনীতির দৃশ্যপট পুরোটাই পাল্টে গেছে। এখন জেলার রাজনীতির মাঠে বিএনপি আর জামায়াত বেশ সক্রিয়। দল দুটি সংগঠনকে গোছানোর পাশাপাশি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের মাঠ গোছাচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী আসনে এখন বেশ সক্রিয়। সুযোগ পেলেই জনসংযোগের পাশাপাশি যোগ দিচ্ছেন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কিশোরগঞ্জ জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীর নামের তালিকা ঘোষণা করেছে। বিএনপি সহ অন্যান্য দল গুলি এখন পর্যন্ত তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামের তালিকা প্রকাশ করতে পারিনি।

কিশোরগঞ্জের ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপি এখনো সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করলে দলের নেতাকর্মীরা গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

জামায়াতে ইসলামী ছয়টি আসনে ছয়জন সম্ভাব্য প্রার্থী তাঁরা সবাই নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ সহ নানা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জ জেলায় ছয়টি সংসদীয় হলো কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর), কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া), কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল), কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম), কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) ও কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর)।

উল্লেখ্য ২০০৮ সালের আগে কিশোরগঞ্জ জেলায় সংসদীয় আসন ছিল ৭টি। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন জেলার ১টি আসন কমিয়ে ঢাকায় একটি আসন বৃদ্ধি করেন ।

কিশোরগঞ্জ-১ আসনটি ১৯৯১ সালে বিএনপির দখলে ছিল। এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে এখানে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি মারা গেলে এখানে সংসদ সদস্য হন তাঁর ছোট বোন চিকিৎসক জাকিয়া নূর (লিপি)।

এ আসনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে আছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি রেজাউল করিম খান (চুন্নু), জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হিলালী, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী উল্লাহ রাব্বানী, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, সহসভাপতি রুহুল হোসাইন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা খোকন ও জেলা বিএনপির সদস্য মো. আতিকুর রহমান। এই আসনে জামায়াতের একক প্রার্থী হিসেবে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোসাদ্দেক ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে জেলা বিএনপির তিন সহসভাপতি জালাল উদ্দীন, আশফাক আহমেদ ও রুহুল আমিন আকিল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহীদুজ্জামান কাকনের। এ ছাড়া এখানে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জনসংযোগ করছেন শিবিরের সাবেক ছাত্রনেতা মাওলানা শফিকুল ইসলাম মোড়ল।

কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বেকায়দায় আছেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এম ওসমান ফারুক, জেলা বিএনপির সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা ও জালাল মোহাম্মদ গাউস, যুববিষয়ক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ও জেলা বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক এরশাদ আহসানের। এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে চিকিৎসক কর্নেল (অব.) অধ্যাপক জেহাদ খানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা আলমগীর হোসাইন তালুকদার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রবাসী এ কে এম আলমগীর এলাকায় পোস্টার লাগিয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ-৪ আসন থেকে টানা বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ২০১৩ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে পরপর চারবার সংসদ সদস্য হন তাঁর বড় ছেলে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক। ৫ আগস্টের পর থেকে রেজওয়ান আত্মগোপনে আছেন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চাইবেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট সুরঞ্জন ঘোষ, ড্যাব নেতা অধ্যাপক ফেরদৌস আহমেদ লাকী, অবসরপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আবদুর রহিম মোল্লা, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামের নাম শোনা যাচ্ছে। জামায়াতের প্রার্থী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা আইনজীবী শেখ মো. রোকন রেজার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এবং তিনি নিয়মিত গণসংযোগ করে যাচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সহসভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বদরুল মোমেন মিঠু বাজিতপুরের সাবেক পৌর মেয়র এহসান কুফিয়া, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক হাজি মাশুক মিয়া ও বিএনপি নেতা মীর জলিলের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। আসনটি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও ১২–দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা। বিএনপির নেতা-কর্মীরা যেন তাঁকে সহযোগিতা করেন, সে জন্য কেন্দ্রীয় বিএনপি থেকে রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত একটি চিঠিও ইস্যু করা হয়েছে।

এ ছাড়া রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুমের বাড়ি এখানে। তিনি সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় মজলিসে সুরা সদস্য ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলীর নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে দলটি। তিনি নিয়মিত নির্বাচনী এলাকায় গণ সংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জ-৬ আসন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। তিনি কয়েকবার এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁর ছেলে বিসিবির সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন সংসদ সদস্য হন। তিনি বতমানে আত্মগোপনে আছেন। এ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি মো. শরীফুল আলমের। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ভৈরব উপজেলা আমির মাওলানা কবির হোসাইন।

এদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দলদুটি সারা জেলায় তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে অব্যাহত রেখেছে। অপরদিকে জাতীয় পার্টির সারা জেলায় কোন রাজনৈতিক তৎপরতা নেই।

কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে নির্বিঘ্ন ও বাধাহীন পরিবেশে দলীয় কর্মসূচি, সভা-সমাবেশসহ নানা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড করা যাচ্ছে। প্রতিটা আসনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা এখন সক্রিয়। তিনি আশা করছেন, আগামী নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ জেলার ছয়টি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয় লাভ করবে।

কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলী বলেন, ইতিমধ্যে ছয়টি আসনে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁরা এলাকায় গণসংযোগ করছেন, প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি আশা করেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জেলার ছয়টি আসনেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা ভালো করবেন।